আরেকটি শিশু শিরোনাম হয়ে ওঠার আগে
কেবল থানা, আদালত ও কারাকক্ষ দিয়ে একটি জাতি সুরক্ষিত হয় না। তার গভীরতম নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে একটি শিশু ও তার চারপাশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যকার আস্থায়। সেই আস্থা ভেঙে পড়লে মর্মান্তিক ঘটনার পর যত গ্রেপ্তারই হোক, তা আর ফেরানো যায় না।
কিছু মৃত্যু এমন, যা একটি সমাজকে বিনা পীড়ায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে দেয় না। শিশুহত্যা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক খুন হলে প্রশ্ন ওঠে, কী ঘটেছিল, কে ঘটিয়েছে এবং কেন। কিন্তু নির্মমভাবে কোনো শিশু নিহত হলে তখন আরেকটি প্রশ্নই আমাদের তাড়িয়ে বেড়ানো উচিত: কেমন সমাজ একটি শিশুকে এতটা অরক্ষিত থাকতে দিল?
কুমিল্লা ও ঢাকায় সাম্প্রতিক শিশুহত্যা, এবং মাদ্রাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের বারবার আসা খবরকে তাই কেবল একের পর এক ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
প্রতিটি ঘটনা আলাদা, তবুও একসঙ্গে তারা এমন কিছু প্রকাশ করে, যা অস্বস্তিকর রকমের পরিচিত। ঘটনার পরে এসে আমরা বারবার আবিষ্কার করি -- শিশুটি ঝুঁকিতে ছিল, সতর্কসংকেত ছিল, প্রাপ্তবয়স্করা তা লক্ষ্য করেনি, আর প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রায়ই নিজেদের রক্ষায় যতটা প্রস্তুত ছিল, তাদের ওপর ন্যস্ত শিশুদের রক্ষায় ততটা নয়।
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা নিয়ে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য: শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সব সময় অন্ধকার গলি কিংবা অচেনা কোনো আগন্তুকের কাছ থেকে আসে না। কখনো তা আসে সেই ব্যক্তির কাছ থেকে, যে শিশুটিকে চেনে, ঘরে আসে, প্রতিষ্ঠানে পড়ায়, পাশের বাড়িতে থাকে, কিংবা পরিবারের বিশ্বাসভাজন।
২০২৫ সালের সংবাদভিত্তিক শিশুঅধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নথিভুক্ত শিশু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার প্রায় প্রতি দশটির মধ্যে নয়টিতেই জড়িত ছিল প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক ও ধর্মীয় শিক্ষকের মতো পরিচিত মুখ।
একই প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, নথিভুক্ত ১২৪টি শিশুহত্যার ঘটনার ৬৬.১২ শতাংশ এবং ৩০৮টি যৌন নির্যাতনের ঘটনার ৫৯.০৯ শতাংশ ঘটেছে ঘরের ভেতরে কিংবা পারিবারিক পরিসরে। এই পরিসংখ্যান বিপদ নিয়ে আমাদের ধারণাকেই বদলে দেওয়া উচিত। যেই শিশু সুরক্ষা নীতি শিশুদের কেবল অপরিচিতদেরকে ভয় পেতে শেখায়, সেই নীতিটি সমস্যার একটি অংশ থেকেই তাদেরকে রক্ষা করে।
সংখ্যাগুলো আরও বড় কথা বলে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে কিংবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে; ২,০৩৮ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি।
পুলিশ অবশ্য সতর্ক করেছে যে এই পরিসংখ্যানকে প্রেক্ষাপটসহ বুঝতে হবে -- বিশেষ করে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরির সুযোগ থাকায় অভিযোগ জানানো সহজ হয়েছে, আর অনেক শিশুকে পরে খুঁজেও পাওয়া গেছে। সেই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান আতঙ্কের হাতিয়ার হয়ে উঠুক, তা কাম্য নয়; আবার পরিসংখ্যানের জটিলতাও উদাসীনতার অজুহাত হতে পারে না।
২,০৩৮ শিশুর কোনো খোঁজ না মেলা পুলিশের নথিতে কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি অমীমাংসিত ঘটনার পেছনে এমন একটি পরিবার রয়েছে, যেই পরিবার অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটায়।
সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যানটি এমন, যা নাটকীয় শিরোনাম তৈরি করে না বলে অনেক কম মনোযোগ পায়। ইউনিসেফের বাংলাদেশ এমআইসিএস ২০২৫ জরিপে দেখা গেছে, জরিপের আগের এক মাসে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু সহিংস শাসনের মুখোমুখি হয়েছে।
এর অর্থ, সমস্যাটি শুরু হয় কোনো শিশু অপরাধের প্রতিবেদনে ঠাঁই পাওয়ার অনেক আগে থেকেই। সহিংসতা শৈশবে ঢুকে পড়ে লালন-পালনের নিত্যদিনের আচারের ভেতর দিয়েই: চিৎকার, অপমান, মারধর, আর এই বদ্ধমূল ধারণা যে শিশুদের যেমন খুশি শাসন করার অলঙ্ঘনীয় অধিকার প্রাপ্তবয়স্কদের রয়েছে।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া এখানেই আরও সূক্ষ্ম হওয়া দরকার। খুন, ধর্ষণ ও অপহরণ হলো দৃশ্যমান খাড়া পাহাড়ের চূড়া; তার নিচে ছড়িয়ে আছে নিত্যদিনের ভয়, অবহেলা, অপমান ও নীরবতার এক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড।
দার্শনিক "জন লক"-এর সুপরিচিত ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক সমাজ এক সামাজিক চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে, যার কাজ জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
কিন্তু শিশুরা সেই চুক্তিতে সমান অংশীদার হিসেবে প্রবেশ করে না। তাদের হয়ে সেই চুক্তি রক্ষার ভার প্রায় পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্কদের ওপরই বর্তায়।
একটি শিশু অভিযোগ দায়ের করতে পারে না, আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারে না, যে ঘরে নির্যাতন চলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না, কিংবা অনিরাপদ কোনো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে না।
এই নির্ভরতা একটি বিশেষ নৈতিক দায় তৈরি করে। প্রাপ্তবয়স্করা শিশুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও।
দায়িত্ব নিয়ে "হানা আরেন্টে"-এর ভাবনাও এখানে প্রাসঙ্গিক। দায়িত্ব এতটা বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে কেউই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী বোধ করে না -- তখন সমাজ প্রায়ই অন্যায়ে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
পরিবার ভাবে, বিদ্যালয় ঠিকই লক্ষ করবে। বিদ্যালয় ধরে নেয়, অভিভাবকেরা জানবে। মাদ্রাসা মনে করে, এলাকার মানুষ নজর রাখবে। সমাজ ভরসা রাখে, পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে। পুলিশ পৌঁছায় অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর। আর রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত একটি তদন্তের ঘোষণা দেয়।
এদিকে শিশুটি এই শৃঙ্খলের মাঝখানে কোথাও পড়ে থাকে।
এ কারণেই শাস্তি অপরিহার্য হলেও শিশু সুরক্ষার সমগ্র দর্শন হতে পারে না। কোনো ভয়াবহ অপরাধ ঘটলেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সেই দাবি বোধগম্য। ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অপরিসীম, আর দায়মুক্তি বিপজ্জনক।
কিন্তু যে সমাজ শিশু সুরক্ষার সাফল্য মাপে কোনো শিশু খুন হওয়ার পর কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হলো তা দিয়ে, সে আসলে নিজের প্রতিক্রিয়ার দক্ষতা মাপছে, সুরক্ষার সাফল্য নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অপরাধটি কি ঠেকানো যেত? কোনো শিক্ষক কি শিশুর আচরণে পরিবর্তন চিনতে পারত? কোনো স্বাস্থ্যকর্মী কি বারবার আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করতে পারত? কোনো প্রতিবেশী কি জানত, সন্দেহের কথা কোথায় জানানো যায়?
কোনো বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় কি স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা থাকতে পারত? চরম চাপে থাকা কোনো পরিবারে কি কোনো সমাজকর্মী হস্তক্ষেপ করতে পারত?
আর কোনো শিশু কি শাস্তি, অবিশ্বাস বা লজ্জার ভয় ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলতে পারত? এই প্রশ্নগুলো আমাদের আইনশৃঙ্খলার পরিচিত শব্দভান্ডার ছাড়িয়ে নিয়ে যায় সমাজের কাঠামোর দিকে।
প্রযুক্তি এই কাঠামো গড়তে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বিবেকের বিকল্প হতে পারে না। যথাযথভাবে পরিচালিত একটি জাতীয় শিশু সুরক্ষা তথ্যব্যবস্থা বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকর্মী, পুলিশ ও আদালত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানা বিন্যাস শনাক্ত করতে অনুমোদিত পেশাজীবীদের সাহায্য করতে পারে।
তবে এমন ব্যবস্থার নকশা হতে হবে গোপনীয়তা, সম্মতি, নিরাপত্তা ও মানুষের তত্ত্বাবধানকে ঘিরে। কোনো যন্ত্র কখনোই স্থির করবে না যে একটি শিশু বিপজ্জনক কিংবা ফেলনা। যা অন্যথায় অদৃশ্য থেকে যেত, তা নজরে আনতে একজন প্রশিক্ষিত মানুষকে সাহায্য করাই হবে তার কাজ।
আরও জরুরি হলো, বাংলাদেশে শিশুদের কথা বলা সহজ করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের পক্ষে তাদের মুখ বন্ধ করা কঠিন করে তোলা।
প্রতিটি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় থাকা উচিত একটি বিশ্বাসযোগ্য সুরক্ষা নীতিমালা, সহজে ব্যবহারযোগ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ পেলে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট পদ্ধতি।
প্রকাশ পেলে সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে, এই অজুহাতে নির্যাতনকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাজনিত বিষয় হিসেবে সামলানোর সুযোগ প্রতিষ্ঠানসমূহকে দেওয়া চলবে না।
মানসম্মান রক্ষার জন্য পরিবারকে নীরব থাকতে চাপ দেওয়া উচিত নয়। আর যেই প্রাপ্তবয়স্করা শিশুদের রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মর্যাদা রক্ষার দায় শিশুদের ওপর কখনোই চাপানো চলবে না।
গণমাধ্যমের জন্যও জরুরি, শিশুর কষ্টকে তামাশায় পরিণত করার প্রলোভন প্রতিহত করা। নিহত একটি শিশু আরেকটি ছবি, আরেকটি চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, জনরোষের আরও একটি দিন হয়ে থাকলে চলবে না।
সাংবাদিকতার প্রশ্ন হওয়া উচিত: অপরাধের আগে কী ঘটেছিল, কোন সতর্কসংকেত উপেক্ষিত হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে, আগের অভিযোগগুলোর কী পরিণতি হয়েছিল, এবং অন্য শিশুদের জন্য কি একই পরিস্থিতি বহাল রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ এমন এক দেশের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে চিত্ত ভয়শূন্য। একটি শিশুর জন্য সেই ধারণার সূচনা আরও অনেক কাছ থেকে।
তা শুরু হয় এমন এক শৈশব থেকে, যেখানে ভয় ছাড়া ঘুমানো যায়, ভয় ছাড়া বিদ্যালয়ে যাওয়া যায়, অস্বস্তিকর স্পর্শের কথা নির্ভয়ে বলা যায়, ভুল করলে মার খেতে হয় না, আর কোথাও একটি কিছু ঠিক নেই -- এ কথা কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে বলার সময় সে বিশ্বাস করবে কি না, সেই দ্বিধায় ভুগতে হয় না।
সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য এটাই হওয়া উচিত আমাদের মানদণ্ড: শিশুরা শৈশবে বেঁচে থাকে কি না, তা নয়; বরং শৈশবটা যাপনের সময় তারা সত্যিই নিরাপদ বোধ করতে পারে কি না।
কেবল থানা, আদালত ও কারাকক্ষ দিয়ে একটি জাতি সুরক্ষিত হয় না। তার গভীরতম নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে একটি শিশু ও তার চারপাশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যকার আস্থায়। সেই আস্থা ভেঙে পড়লে মর্মান্তিক ঘটনার পর যত গ্রেপ্তারই হোক, তা আর ফেরানো যায় না।
তাই বাংলাদেশের সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা এই নয় যে, আমরা কত উচ্চকণ্ঠে একটি মৃত্যুকে কতটা শোক দিয়ে পালন করি।
এইচ. এম. নাজমুল আলম ঢাকাভিত্তিক শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বর্তমানে তিনি আইইউবিএটিতে শিক্ষকতা করছেন। যোগাযোগ: [email protected]