নীরবতার স্থাপত্য ভেঙে ফেলা
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র কখনো তার অবকাঠামোগত বৃহত্ত-প্রকল্প, জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী গতিপথ, বা উঁচু ভবনের ছায়া দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আমাদের সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড সম্পূর্ণভাবে নিহিত আমাদের সবচেয়ে অসহায় শিশুর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার সামর্থ্যে।
একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন কেবল তার ভঙ্গুর দেহই ক্ষতবিক্ষত হয় না -- নিঃশেষ হয়ে যায় তার সহজাত মানবিকতা ও বিশ্বাস। মনস্তত্ত্বের সাহিত্যে একে বলা হয় স্যাংচুয়ারি ট্রমা -- যেই বিধ্বংসী প্রবণতায় প্রতিশ্রুত আশ্রয়স্থল রূপান্তরিত হয় আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
আধুনিক সমাজ পরিণত হয়েছে এই বিশেষ ট্রমা উৎপাদনের একটি শিল্প-মাত্রার কারখানায়।
আমরা লালন করছি এক ভয়াবহ পঙ্গু সাংস্কৃতিক মানসিকতা, যেখানে শিশুর সহজাত অসহায়ত্বকে রক্ষা করা হয় না, বরং নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করা হয় বশীকরণের হাতিয়ার হিসেবে।
এই প্রবণতা নিছক প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলাজনিত ব্যর্থতার সীমা ছাড়িয়ে যায়; এটি নির্দেশ করে আমাদের সভ্যতার সম্পূর্ণ পতন -- এমন এক দুঃস্বপ্নের বাস্তবতা, যেখানে নির্ধারিত রক্ষকরাই নির্বিঘ্নে রূপান্তরিত হয়েছে শিকারি শ্রেষ্ঠ শ্রেণিতে, আর রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে যায় করুণভাবে পঙ্গু।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলির নিষ্ঠুরতা নিরাপত্তার যে কোনো মায়া সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দেয়। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ভয়াবহতা নয়; এটি এক মহামারির প্রকাশ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ২৫৪ জন শিশু নিহত হয়েছে।
একই সময়ে পুলিশের নথিতে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে ১৪,৬০২টি -- যা দৈনিক প্রায় ৬০টি নৃশংসতার সমান।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়, নিখোঁজ হওয়া ৩৬ জন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে -- যা উন্মোচন করেছে সহিংসতার এক ভূগর্ভস্থ চক্র, যা প্রতিরোধে আমরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ।
এই সংখ্যাগুলো ঘিরে থাকা দমবন্ধ নীরবতা আমাদের প্রত্যেককে দোষী সাব্যস্ত করে।
অপসারিত ক্রোধের রোগবিজ্ঞান
সমাজবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, এ ধরনের সহিংসতা কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো অস্বাভাবিকতা নয়; বরং এটি সংক্রামক রোগের মতোই তীব্র দক্ষতায় ছড়িয়ে পড়ে।
আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত "কিওর ভায়োলেন্স মডেল"-এ ড: গ্যারি স্লুটকিন যুক্তি দেন যে সহিংসতা একটি মহামারিতাত্ত্বিক প্রাদুর্ভাবের মতোই আচরণ করে, জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের গভীরভাবে স্তরীভূত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাপক প্রশাসনিক দুর্নীতির নিরন্তর চাপ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম দিয়েছে গভীর, দমবন্ধ হতাশার।
ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে এই ক্রমবর্ধমান হতাশাকে ঊর্ধ্বমুখে চালিত করতে অক্ষম হয়ে প্রাপ্তবয়স্করা সহজাতভাবে তা নিম্নমুখে স্থানান্তরিত করে। ফলে এই দমিত, আগ্নেয়গিরির মতো ক্ষোভ তার বহিঃপ্রকাশ খুঁজে পায় সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীর ওপর -- আমাদের শিশুদের ওপর।
প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই সামষ্টিক মানসিক আঘাত একটি অত্যন্ত বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে শিশুর ওপর আধিপত্য জাহির করা ও যন্ত্রণা দেওয়া অবচেতনভাবে পরিণত হয়েছে তাদের নিজস্ব গভীর অক্ষমতা আড়াল করার একমাত্র উপায়ে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ভয়ংকর সংক্রমণ নির্বিঘ্নে রূপান্তরিত হয়ে সংক্রমিত করেছে উদীয়মান প্রজন্মকেও, যা ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সমবয়সীদের মধ্যকার সহিংসতা ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে।
কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের অন্তর্ধান ও পরবর্তী হত্যাকাণ্ড, যা ঘটিয়েছে তার নিজেরই সমবয়সীরা, আমাদের সমাজে মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার এক মর্মান্তিক ময়নাতদন্ত হিসেবে কাজ করে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ভার্চুয়াল জগতের অন্ধকার গলিতে অবাধ বিচরণ, এবং শারীরিক আধিপত্য প্রদর্শনের এক বিকৃত প্রতিযোগিতা -- এই বিষাক্ত মিশ্রণ কিশোর মনস্তত্ত্ব থেকে সহানুভূতির শেষ চিহ্নটুকুও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
সমাজ হিসেবে আমরা তাদের সামনে কোনো দৃঢ় বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংস্কৃতিক আদর্শ উপস্থাপনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি।
ফলে এই নৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে ছুটে এসেছে এক আগ্রাসী, সহিংস ভোগবাদ -- এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে সমবয়সীর জীবন নিভিয়ে দেওয়া আর অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না।
আইনি স্বস্তির মরীচিকা
জাতি হিসেবে আমাদের এক বিপজ্জনক অভ্যাস আছে -- আইনের বইয়ের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা আইনি স্বস্তিতে ডুবে থাকা -- প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার বিশাল, বিপদসংকুল ব্যবধানকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা।
শিশু আইন ২০১৩-র ৭০ ধারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে সম্পূর্ণ স্পষ্ট।
তবে এর বাস্তব প্রয়োগ থেকে যায় সম্পূর্ণ অলীক। আমাদের আইনি কাঠামোর সবচেয়ে বড় ফাঁক হলো বাধ্যতামূলক অবহিতকরণ আইনের অনুপস্থিতি -- উন্নত বিশ্বে একটি প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা, যা শিক্ষক ও
চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবীদের শিশু নির্যাতনের প্রথম সন্দেহেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে আইনত বাধ্য করে।
বর্তমানে পারিবারিক সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার দমবন্ধ ভয়, সেই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার ক্লান্তিকর জটিলতা নিশ্চিত করে যে অসংখ্য নৃশংসতা নীরবেই চাপা পড়ে যায়।
আমাদের উচ্চ আদালত মাঝে মাঝে যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে এই আইনি শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেছে। তবুও এই মহৎ হস্তক্ষেপগুলো বারবার আছড়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার দুর্ভেদ্য দেয়ালে।
২০১১ সালে উচ্চ আদালত (রিট পিটিশন নং ৫৬৮৪/২০১০-এর অধীনে) এক ঐতিহাসিক রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।
সম্প্রতি উচ্চ আদালত উত্ত্যক্তকরণ মোকাবিলায় ১৭ দফা নির্দেশনা জারি করে, যাতে পেশাদার মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলর নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়। যখন বিচারিক হাতুড়ি দ্রুত নেমে আসে, তখনই উন্মোচিত হয় আমাদের আইনি ব্যবস্থার বিপুল সম্ভাবনা।
৭ জুন ঢাকা মেট্রোপলিটন শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকিন পল্লবী মামলায় এক যুগান্তকারী রায় দেন। আট বছর বয়সী রমিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে সোহেল রানা ও
স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রমিসার মস্তকবিহীন দেহ একটি বালতিতে লুকানো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। মামলাটির রায়ও দ্রুত ঘোষণা করা হয়।
এই যুগান্তকারী রায়ে ট্রাইব্যুনাল স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করে যে শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। তবুও এমন দ্রুত বিচারিক জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নয়, রয়ে গেছে স্পষ্ট ব্যতিক্রম হিসেবে।
ছায়াহীন আশ্রয়স্থল
সহিংসতার এই সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে ফেলতে আমাদের খণ্ডিত, প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল ত্যাগ করে বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত মডেলগুলো নিখুঁতভাবে আমাদের দেশীয় আইনি কাঠামোতে সংযুক্ত করতে হবে। নীতি গবেষকদের মধ্যে একটি সুসংহত শিশু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের বর্তমান গতিবেগ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ, তবে একে আরও শক্তিশালী করতে হবে। যুক্তরাজ্যের মাল্টি-এজেন্সি সেফগার্ডিং হাব (মাশ)
এবং নর্ডিক দেশগুলোর অগ্রণী বার্নাহুস (শিশুদের ঘর) মডেল অনবদ্য পদ্ধতিগত রূপরেখা প্রদান করে।
আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় আঘাতপ্রাপ্ত শিশুকে থানা, হাসপাতাল ও ভীতিকর আদালতকক্ষের এক গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, প্রতিটি ধাপে তীব্র দ্বিতীয় দফা মানসিক আঘাতের শিকার হতে হয় তাকে।
বার্নাহুস মডেল এই চক্র দৃঢভাবে ভেঙে দেয় -- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও শিশু মনোবিদদের এক ছাদের নিচে এনে -- যাতে ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য একটি গভীর সংবেদনশীল পরিবেশে মাত্র একবারই লিপিবদ্ধ হয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এমন সমন্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা আর কোনো প্রগতিশীল বিলাসিতা নয়; এটি এক পরম বাঁচার আবশ্যকতা।
তৃণমূল পর্যায়ে এক অভেদ্য সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে জাপানের অত্যন্ত সফল কোদোমো ১১০ বান নো ইয়ে (শিশু ১১০ নিরাপদ বাড়ি) মডেলের তাৎক্ষণিক অভিযোজন।
এই চমৎকার, স্বল্প-ব্যয়ের সামাজিক উদ্যোগ নির্দিষ্ট স্থানীয় বাসাবাড়ি, মুদি দোকান ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে, স্বতন্ত্র হলুদ স্টিকার দিয়ে সেগুলোকে তাৎক্ষণিক আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করে।
আতঙ্কিত বা তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে থাকা যে কোনো শিশু এসব জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে, যা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক, সমন্বিত সাড়া সক্রিয় করে।
বর্তমানে ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ জুড়ে ২,১৭০টি শিশু সুরক্ষা সামাজিক হাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিদ্যমান হাবগুলোকে জাপানি নিরাপদ-বাড়ি ধারণার সঙ্গে কৌশলগতভাবে সংযুক্ত করে আমরা দ্রুত এক দুর্ভেদ্য সামাজিক দুর্গ চালু করতে পারি।
এমন বিকেন্দ্রীভূত, মহল্লা-চালিত প্রতিরোধ, হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা নিষ্ক্রিয় করতে পুরানো, প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশি কাঠামোর চেয়ে সহজাতভাবে বেশি সক্ষম।
রূপান্তরের প্রকৌশল
একইসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইনস্পায়ার কাঠামো এই সংকট নিয়ে আমাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য ভিত্তি প্রদান করে।
এই কাঠামো জোর দিয়ে বলে যে শিশুর প্রতি সহিংসতাকে শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিচার করলে চলবে না -- একে অবশ্যই একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে আগ্রাসীভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
এই কৌশল একচেটিয়া দণ্ডমূলক প্রতিশোধ থেকে সরে গিয়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সুদৃঢ়করণ এবং গভীরভাবে প্রোথিত সামাজিক মূল্যবোধের এক আমূল সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করে।
রাষ্ট্রকে জরুরিভাবে একটি নিরবচ্ছিন্ন, দেশব্যাপী 'ইতিবাচক অভিভাবকত্ব' প্রচারাভিযান শুরু করতে হবে।
অভিভাবকের শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতনকে যে বিষাক্ত সামাজিক ঐকমত্য পরোক্ষভাবে বৈধতা দেয়, তা পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে নির্মূল করে তার পরিবর্তে সহমর্মিতাপূর্ণ সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
পরিবারগুলোর মধ্যে এই মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ছাড়া কোনো পরিমাণ সংবিধিবদ্ধ আইনই আমাদের শিশুদেরকে কখনো টেকসই সুরক্ষা দিতে পারবে না।
এই বৈশ্বিক মডেলগুলোকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় রূপান্তরিত করতে নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে প্রয়োজন দ্রুত, আপসহীন ও উচ্চ দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ।
প্রথমত, সংসদকে জরুরিভাবে একটি সুসংহত জাতীয় বাধ্যতামূলক অবহিতকরণ আইন প্রণয়ন করতে হবে, যা স্কুল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশু নির্যাতনের যে কোনো শারীরিক লক্ষণ তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে আইনগতভাবে বাধ্য করবে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে প্রতিটি জেলায় একটি নিবেদিত শিশু সুরক্ষা ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা আইনত তিন থেকে ছয় মাসের কঠোর সময়সীমার মধ্যে চরম সহিংসতার মামলা নিষ্পত্তি করতে বাধ্য থাকবে -- সাম্প্রতিক পল্লবী ট্রাইব্যুনাল রায়ে দেখা দক্ষতার প্রতিফলন ঘটিয়ে।
বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন নাবালকের মানসিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে ইন-ক্যামেরা (বন্ধ-দরজা) বিচার একটি নিরঙ্কুশ সংবিধিবদ্ধ প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হতে হবে। এটি অপরাধীদের কাছে এক দ্ব্যর্থহীন বার্তা পাঠাবে যে রাষ্ট্র আর বিচারিক বিলম্বের অস্ত্রীকরণ সহ্য করবে না।
এছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বাধীন জাতীয় পর্যবেক্ষণ সেল চালু করতে হবে, যা একচেটিয়াভাবে উচ্চ আদালতের ১৭ দফা উত্ত্যক্তকরণ-বিরোধী নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত থাকবে।
একইসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরকে মানব পাচার-বিরোধী ইউনিটের অধীনে একটি বিশেষায়িত নিখোঁজ শিশু টাস্কফোর্স সক্রিয় করতে হবে।
সেকেলে তদন্ত পদ্ধতি বাদ দিয়ে এই আধুনিকীকৃত ইউনিটকে উন্নত সাইবার-ট্র্যাকিং ও পাড়া-মহল্লার সম্মিলিত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে কাজ করতে হবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও ভুক্তভোগীকে দোষারোপের ঘৃণ্য সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে -- তাদের বয়ান নিশ্চিত করতে হবে যেন জবাবদিহি করা হয় ব্যবস্থাকে, আঘাতপ্রাপ্ত পরিবারগুলোকে নয়।
বিবেকের ভুবন
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র কখনো তার অবকাঠামোগত বৃহত্ত-প্রকল্প, জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী গতিপথ, বা উঁচু ভবনের ছায়া দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আমাদের সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড সম্পূর্ণভাবে নিহিত আমাদের সবচেয়ে অসহায় শিশুর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার সামর্থ্যে।
আমরা শৈশবের প্রাণবন্ত, বিশৃঙ্খল নিষ্পাপতাকে ভয়ংকরভাবে রূপান্তরিত করেছি এক নিরবচ্ছিন্ন, যন্ত্রণাদায়ক ময়নাতদন্তের টেবিলে, আর এই ঝরে যাওয়া রক্তের ঋণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী শোক প্রকাশের মাধ্যমে কখনো মেটানো যাবে না।
রাষ্ট্রযন্ত্র, বৃহত্তর সামাজিক সমষ্টি এবং অন্তরঙ্গ পারিবারিক পরিসর -- সবাইকে দাঁড়াতে হবে নিষ্ঠুর আত্মজিজ্ঞাসার আয়নার সামনে।
আমরা নৈতিকভাবে বাধ্য মানবিক মানচিত্র নতুন করে আঁকতে -- এমন এক বিবেকের জগত, যেখানে কোনো শিশুর হাসি আর কখনো স্তব্ধ হবে না, এবং সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য আতঙ্কের কবলে কোনো নিষ্পাপ মুখ আর নীল হয়ে যাবে না।
ফয়জুদ্দিন আহমদ একজন আইনজীবী ও উন্নয়নকর্মী।