কীভাবে অল্প সময়ে মানুষের আস্থা হারাতে হয়
যদি বিএনপির উদ্দেশ্য হয়ে থাকে মানুষকে বোঝানো যে তাদের প্রতিপক্ষ যা বলে তার সবই সত্য -- যেমন তারা বদলায়নি, এখনও তারা স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যকেই অগ্রাধিকার দেয় -- তাহলে এর চেয়ে আরও কার্যকর বার্তা তারা আর দিতে পারত না।
ফেব্রুয়ারি ১২–এর নির্বাচনের পর পুরো দেশ তাকিয়ে ছিল একটাই প্রশ্নের দিকে -- বিএনপি কি সত্যিই বদলেছে? তারা কি সত্যিই নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে যাচ্ছে, যেমনটা তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল?
ক্ষমতায় ফেরার পর তারা কি গত দুই দশকের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে? ২০২৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর পতনের যে বাস্তবতা দেশ দেখেছে, তা কি তাদের সতর্ক করেছে? তারা কি হবে আরও সংযত, আরও বিচক্ষণ, আরও জনমত সংবেদনশীল?
নাকি আমরা আবারও সেই পুরনো বিএনপিকেই দেখব -- যারা সিদ্ধান্ত নেয় হঠাৎ করে, ব্যাখ্যা ছাড়াই, আর জনগণের চোখে বিষয়টি কেমন দেখাবে, সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না?
দুই সপ্তাহেই আমরা উত্তর পেয়ে গিয়েছি। ড. আহসান এইচ. মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, এবং তার জায়গায় এমন একজন তৈরি পোশাক কারখানার মালিককে বসানো, যার ব্যাংকিং সংক্রান্ত কোনো দৃশ্যমান যোগ্যতাই নেই -- এটি ছিল সম্পূর্ণ এড়ানো যেত এমন একটি রাজনৈতিক ভুল।
প্রথমত, ড. মনসুর দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন অর্থনীতি ছিল টালমাটাল। তিনি কঠিন কিন্তু কিছু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে আস্থা তৈরি করেছিলেন। তার মেয়াদের মাঝপথে এভাবে তাকে অপসারণ শুধু ব্যক্তি অপমানই নয়, এটি দেশের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত।
দ্বিতীয়ত, সরকার যদি তাদের নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তাকে সরাতেই চাইত, সেটি পেশাদার ও শালীন উপায়ে করা যেত। কিন্তু যেভাবে হঠাৎ করে তাকে সরানো হলো, তাতে কৃতজ্ঞতা তো দূরের কথা, ন্যূনতম সম্মানবোধও দেখা গেল না।
গত দেড় বছরে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে যে ভূমিকা তিনি রেখেছেন, সেটির প্রতি এই আচরণ ছিল অকৃতজ্ঞ ও অমার্জিত।
আরও উদ্বেগজনক হলো -- জানা গিয়েছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাংশের চাপেই এই সিদ্ধান্ত। তাহলে কি ভবিষ্যতে সরকার এভাবেই চলবে? নীতিনির্ধারণ হবে পেশাদার বিশ্লেষণে নয়, বরং চাপ ও তদবিরে? এবার আসি নতুন গভর্নরের প্রসঙ্গে। যদি সরকারের লক্ষ্য হয় সুদহার কমানো ও সহজ অর্থনীতির পথে হাঁটা -- তাহলে কি সত্যিই ব্যাংকিঙের অভিজ্ঞতাহীন একজন ব্যক্তিই ছিল একমাত্র পছন্দ? যার বড় পরিচয় রাজনৈতিক কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা, আর যার নিজের ঋণ পুনঃতফসিলের ইতিহাস আছে -- তাকে বসিয়ে সরকার আসলে কী বার্তা দিল?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয় -- এটি অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ঠিক এই স্বাধীনতার অভাবই অতীতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছিল, যার মূল্য দেশ এখনও দিচ্ছে। সমাধান একটাই -- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পরিচালনা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে বিএনপি বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে তাদের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন থাকবে না, বরং সরকারের অধীনস্থ হয়ে চলবে। এটি শুধু ভুল অর্থনৈতিক নীতি নয় -- এটি জনআস্থা ধ্বংসের অব্যর্থ উপায়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি এখানেই। যদি তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে মানুষকে বোঝানো যে তাদের প্রতিপক্ষ যা বলে তার সবই সত্য -- যেমন তারা বদলায়নি, এখনও তারা স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক আনুগত্যকেই অগ্রাধিকার দেয় -- তাহলে এর চেয়ে আরও কার্যকর বার্তা তারা আর দিতে পারত না।
সম্পাদক, কাউন্টারপয়েন্ট
What's Your Reaction?