একটা কোট কখন শুধু কোট থাকে না?

এই সংস্কৃতি শুধু আওয়ামী লীগের নয়; এই সংস্কৃতি বিএনপির এবং জামায়াতেরও -- ভিন্ন পদ্ধতির, কিন্তু একই কাঠামোর। তারাও ক্ষমতার কাছে গিয়ে গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ব্যবহার করেছে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে। পার্থক্য হচ্ছে যে হাসিনা আমলে এর পরিমাণ আর সময়কাল আরও বেশি ছিল।

May 12, 2026 - 11:31
একটা কোট কখন শুধু কোট থাকে না?
একেবারে সোজা কথাটা আগে বলে নেওয়া দরকার -- বাংলাদেশ কোনোদিনই শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি দল দ্বারা শাসিত হয়নি; বরং দেশকে শাসন করেছে একটা বিশেষ শ্রেণি। এই শ্রেণিটি ক্ষমতার কাছাকাছি নিজেদেরকে স্থাপন করে রেখে সেই ক্ষমতার উষ্ণতা, সুরক্ষা আর দায়মুক্তি নিজেদের কাছে টেনে নিয়ে সেই সুবিধাকেই আমাদের কাছে বিক্রি করে এসেছে “বুদ্ধিবৃত্তি”, “সংস্কৃতি”, “সাংবাদিকতা” আর “জাতীয় বিবেক”-এর নামে।
 
এই শ্রেণিটাই আসলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রকে স্বাভাবিক, এমনকি অনিবার্য বলে প্রতিষ্ঠা করেছে -- কোনো একক নেতা বা নীতির চেয়েও বেশি। এটা কোনো রূপক নয় -- এটা বাংলাদেশের একটি বাস্তব সামাজিক কাঠামো। ক্ষমতা যাদের দরকার, যাদের প্ল্যাটফর্ম, পরিচিতি ও মাইক্রোফোন দরকার, তারা এই শ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ করে তাদেরকে কাছে টেনে নিয়েছে। বিনিময়ে তাদেরকে দিয়েছে নিরাপত্তা, দৃশ্যমানতা, আর রাষ্ট্রের অন্য মুখ থেকে রক্ষা।
 
এই লেনদেনটা কখনো প্রকাশ্যে করা হয় না -- করা হয় আমন্ত্রণ, ফোন ধরা, বিজ্ঞাপন কোথায় যাবে আর কোথায় যাবে না -- এসবের মাধ্যমে। হাসিনা আমলে এই ব্যবস্থাটা সবচেয়ে পরিপূর্ণ রূপ পেয়েছিল যদিও সেটা হাসিনার আবিষ্কার ছিল না। ২০০৯–২০১৪-এর মধ্যে ২৭টা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠদের অধীন। অনেক আবেদনেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা ছিল -- সরকারকে “সমর্থন” করতে হবে। এভাবেই গণমাধ্যম “স্বাধীন” থেকে ক্ষমতার মুখপত্রে পরিণত হয়।
 
এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে আগামীতে দল বদলাবে, কিন্তু কাঠামো একই রয়ে যাবে। বাংলাদেশে সব সময়ে দুইটা বাস্তবতা ছিল -- একটা আনুষ্ঠানিক: সংসদ, সংবিধান, আদালত; আরেকটা অঘোষিত: একটি ফোন আলাপেই মামলা গায়েব হওয়া, দলীয় পরিচয়ে পুলিশ নরম হওয়া, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে সব দরজা খুলে যাওয়া।
 
৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে “মুজিব কোট” শুধু একটি পোশাকই ছিল না -- এটা ছিল এক ধরনের পাসপোর্ট। এর মানে ছিল: “এই লোক আমাদের -- তাকে সাবধানে সামাল দিও। এই পাসপোর্ট থাকলে রাষ্ট্র তোমার জন্যও নরম হতো; না থাকলে একই রাষ্ট্র হয়ে যেত ধীরগতির, সন্দেহপ্রবণ, আর শাস্তিমূলক"। ১৫ বছর ধরে মানুষ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। রাষ্ট্র শুধু গুলি চালায়ইনি -- বরং প্রতিদিন এই বার্তাটা দিয়েছে: তুমি আনুগত্য না দেখালে তুমি পুরোপুরি নাগরিক নও।
 
সংবাদ কক্ষে কী হতো? ৩০ জন নিহতকে ৩ বানিয়ে দেওয়া হতো। সংখ্যা বাড়ানো-কমানো হতো সরকারের সুবিধা মতো। অমান্য করলে চাকরি থাকলেও কণ্ঠস্বর থাকত না। এটা কোনো মন্ত্রীর নির্দেশ হিসেবে হয়নি -- বরং এক ধরনের সংস্কৃতি হিসেবে কাজ করেছে: কী লেখা যাবে না -- সেটা শেখানো হয়েছে উপরের মহল থেকেই। সাংস্কৃতিক অঙ্গন, শিক্ষাবিদ পরিমণ্ডল এবং গণমাধ্যম শুধু এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়ইনি, বরং সক্রিয়ভাবে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে।
 
এক সময়ে শিল্পী বা বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতেন। এখন তারা হয়ে গেছেন দরবারের অংশ -- কাছে থাকার শিল্প, আনুগত্যের প্রদর্শন। একুশে পদক, সরকারি অনুদান -- সবই হয়ে গেছে এক ধরনের পুরস্কার -- যারা “সঠিক” আনুগত্য দেখায় তাদের জন্য। আর বুদ্ধিজীবীরা সেই আনুগত্যকেই যুক্তি বানিয়ে দিয়েছে। তারপর আসে সেই ভাষা -- “দেশকে বাঁচাতে একজনই যথেষ্ট”; “তার বিকল্প নেই”।
 
এটা শুধু চাটুকারিতা নয় -- এটা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক বার্তা। এতে বলা হয় -- অধিকার আর নাগরিকত্ব নির্ভর করে কার প্রতি তুমি অনুগত, তার উপর। যারা অনুগত নয় -- তারা কম বৈধ, কম নিরাপদ। এই মানসিকতা ২০২৪-এর জুলাইয়ের দমন-পীড়নের পথ তৈরি করেছে।
 
আবু সাঈদ, ২৩ বছরের একজন ছাত্র, হাত তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ গুলি করে যার ভিডিও আছে। তবু মামলায় লেখা হয়: "দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে মৃত্যু।” এটা কোনো ব্যতিক্রম ছিল না -- এটাই ছিল নিয়মের বহি:প্রকাশ। গণমাধ্যম যখন প্রতিবাদকারীদেরকে “বিদেশি ষড়যন্ত্র” বলে, নিহতের সংখ্যা লুকায়, আন্দোলনকে খাটো করে -- তখন তারা শুধু বিশ্লেষণই করে না, বরং দমন-পীড়নকে সহজ করে দেয়। এখানে দায় শুধু ট্রিগার টানা ব্যক্তিরই নয়!
 
আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য -- এই সংস্কৃতি শুধু আওয়ামী লীগের নয়; এই সংস্কৃতি বিএনপির এবং জামায়াতেরও -- ভিন্ন পদ্ধতির, কিন্তু একই কাঠামোর। তারাও ক্ষমতার কাছে গিয়ে গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ব্যবহার করেছে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে। পার্থক্য হচ্ছে যে হাসিনা আমলে এর পরিমাণ আর সময়কাল আরও বেশি ছিল।
 
তাই শিক্ষা স্পষ্ট: সমাজ যদি এই সহযোগীদের নিয়ে আত্মসমালোচনা না করে, তাহলে পরিবর্তন হয় না -- শুধু সাজসজ্জা বদলায়। আজ যারা অভিযুক্ত, তাদের বিচার হতে হবে এবং তা ন্যায়সঙ্গতভাবে। কিন্তু “সাংবাদিক” বা “বুদ্ধিজীবী” পরিচয় দায়মুক্তির কোনো ছাড়পত্র হতে পারে না।
 
মূল প্রশ্নটা রয়ে যায়: তারা কি এমন এক ব্যবস্থার অংশ ছিল, যা সহিংসতাকে সম্ভব করেছে? যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয় -- তাহলে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশের এখন দরকার নাটক নয় -- দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন: গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনতে হবে; ছাড়পত্র ও নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য বন্ধ করতে হবে; মালিকদের স্বার্থ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে; সক্রিয় রাজনীতিবিদদেরকে গণমাধ্যম পর্ষদে নিষিদ্ধ করতে হবে।
 
এসব বিলাসিতা নয় -- এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল এক প্রজন্মের স্পষ্ট ঘোষণা: অধিকার আনুগত্যের বিনিময়ে পাওয়া যাবে না। আবু সাঈদের খোলা হাত -- অনুমতি চায়নি, হিসাব করেনি -- ওটা ছিল একধরনের অস্বীকৃতি। এখন প্রশ্ন -- এই সমাজ কি নিজের ভূমিকাও খতিয়ে দেখবে? নাকি শুধু পুরোনো কোট খুলে নতুন কোট পরবে?
 
শেষ কথা একটাই: মুজিব কোট ফিরে আসবে অন্য কাপড়ে, অন্য নামে -- আমরা যদি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাকেই সবচেয়ে বড় মুদ্রা বানিয়ে রাখি।
 
অপূর্ব জাহাঙ্গীর একজন লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক উপ-প্রেস সচিব।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow