ইসলামিক ন্যাটোর হৈ চৈ-এর বাইরে
বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা কি রাতারাতি উন্নত হবে? ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কি সহজ হবে? মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে? রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? উত্তর যদি না হয়, তাহলে একটি কঠিন প্রশ্ন করতেই হবে -- কোন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমরা কোন নতুন সমস্যা আমদানি করছি?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত মক্কা চুক্তি গোটা মুসলমান বিশ্বে একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে -- অবশেষে কি একটি ইসলামি ন্যাটো গড়ে উঠল? এই নিয়ে ফেসবুক ও টুইটারে উত্তেজনা কম নয়।
কেউ কেউ বলছেন, এটি মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারো মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরব অবশেষে একটি শক্তিশালী সামরিক ছাউনি খুঁজে পেয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের আশা জেগেছে -- এত বড় একটি নিরাপত্তা কাঠামো যদি গড়ে উঠতে থাকে, তাহলে আমরা কেন সেটার বাইরে থাকব?
প্রশ্নগুলো ভিত্তিহীন নয়। তবে একটি রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আবেগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস থাকে -- প্রশ্নের ভেতরের প্রশ্নটি খুঁজে বের করা।
মক্কা চুক্তি আসলে কী? কেন এটি হয়েছিল? এর সামরিক দায়বদ্ধতা কতটা দৃঢ়? অন্য মুসলমান দেশগুলো কি এতে যোগ দেবে? আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন -- বাংলাদেশ এখন যোগ দিলে তার লাভ কী, আর ঝুঁকিই বা কতটা?
আমার উত্তর সরল। না, এখনো কোনো ইসলামি ন্যাটো গড়ে ওঠেনি। তবে এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছুতে পরিণত হতে পারে।
এটিই প্রথম পার্থক্য বোঝার বিষয়। জোটের নাম কী, তা গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই জোট আসলে কী করতে পারে।
মক্কা চুক্তি বলছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য হবে।
তারা যৌথ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াবে। ৭ আগস্টের যৌথ বিবৃতিতে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে। শুনতে অনেকটা ন্যাটোর মতোই লাগে। কিন্তু একটি চুক্তিতে "একের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা" লিখে দিলেই কি তা ন্যাটো হয়ে যায়?
না।
ন্যাটো গড়ে উঠেছে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে। এর রয়েছে সমন্বিত সেনানিয়ন্ত্রণ, যৌথ পরিকল্পনা, দীর্ঘদিনের যৌথ মহড়া, সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সদস্যদের মধ্যে গভীর প্রতিরক্ষা সমন্বয়।
মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে এর অধিকাংশই এখনো নেই।
কোন দেশ কোন পরিস্থিতিতে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, তার বিস্তারিত কাঠামোও এখনো অস্পষ্ট।
ফলে "মুসলিম ন্যাটো" হয়তো শিরোনাম হিসেবে চলতে পারে। সামরিক বাস্তবতায় একে এখনই ন্যাটো বলা যায় না। বরং একে একটি সম্ভাব্য যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা বলাই ভালো।
এই সূচনা কেন হলো?
এখানে আরেকটি সরলীকরণে পড়ে যাওয়া সহজ। অনেকে বলেন, চুক্তিটি কেবল ইরানকে ঠেকানোর জন্য। ইরান নিশ্চিতভাবেই এই হিসাবের একটি বড় অংশ। তবে কেবল ইরানই পুরো গল্পটা বলে না।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিজেই বলেছেন, এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধেরও আগে।
যুদ্ধটি হয়তো চুক্তিকে ত্বরান্বিত করেছে অথবা এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে, কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ ছিল না। ফিদান আরও বলেছেন, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
তাহলে আসল কারণ কী?
আমার মনে হয়, এটি নিরাপত্তার বহুমুখীকরণ।
সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি কঠিন শিক্ষা পেয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনাই একটি দেশকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করে তোলে না।
২০১৯ সালে আবকাইক ও খুরাইসে হামলার কথা মনে আছে? বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছিল।
সেই ঘটনা কেবল সৌদি আরব নয়, গোটা উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল -- অস্ত্র আমাদের আছে, কিন্তু সেই অস্ত্র কি প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখতে পারে?
প্রতিরোধের আসল প্রশ্নটি এখানেই।
এরপর এলো হুতি হামলা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার বিস্তার, লোহিত সাগরে অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ব্যাপ্তি। এসব থেকে রিয়াদ আরেকটি শিক্ষা পেয়েছে -- কেবল একজন নিরাপত্তা-রক্ষকের ওপর নির্ভর করা ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তাই রিয়াদের কৌশল এখন অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে -- আমেরিকা থাকবে, চীন থাকবে, ইউরোপও থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একাধিক অংশীদার থাকবে না কেন?
এটি কেবল ইরানকে ঠেকানোর হিসাব নয়। এটি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোরও হিসাব।
তুরস্কের হিসাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত এক দশকে আঙ্কারা কেবল একটি ন্যাটো সদস্য হিসেবেই নয়, বরং একটি আঞ্চলিক শক্তি ও দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিরক্ষা-শিল্প রাষ্ট্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-প্রযুক্তিতে অগ্রগতি তুরস্ককে কেবল ক্রেতা নয়, রপ্তানিকারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তাই সৌদি আরবের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজার তুরস্কের কাছে কেবল ব্যবসা নয়, ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোরও একটি সুযোগ।
আর পাকিস্তান? পাকিস্তান এই ত্রিভুজে নিয়ে আসে সামরিক জনবল, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েক দশকের নিরাপত্তা সম্পর্ক, এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে বাড়তি ওজন।
অন্যভাবে বললে, এই তিন দেশের মধ্যে একটি অস্বাভাবিক কিন্তু আকর্ষণীয় সমন্বয় গড়ে উঠেছে -- সৌদি অর্থ ও ভূগোল, তুর্কি প্রযুক্তি, পাকিস্তানি সামরিক সক্ষমতা।
কাগজে-কলমে এটি একটি শক্তিশালী সমীকরণ। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র কাগজ নয়। যেকোনো সামরিক জোটের আসল পরীক্ষা একটি খুবই সাধারণ প্রশ্নে নিহিত -- আগামীকাল রিয়াদে হামলা হলে আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ ঠিক কী করবে?
সেনা পাঠাবে? আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে? গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করবে? অস্ত্র সরবরাহ করবে? নাকি কেবল কূটনৈতিক সমর্থন দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ সম্পর্কে আমাদের ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। বিষয়টি এত সরল নয় যে একজন সদস্যের ওপর হামলা হলে বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। সহায়তা দেওয়া হয় বটে, কিন্তু সেই সহায়তার ধরন পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক হয়।
মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন কেবল এটি নয় -- স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধ হবে কি না। বড় প্রশ্নটি হলো -- এমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কি না, যা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে প্রকৃত সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত করতে পারে? সেই উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই।
এটিই এই চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা।
দ্বিতীয় পরীক্ষাটি সম্প্রসারণের। ৫৭টি মুসলমান দেশই কি এখন যোগ দেবে? আমার মনে হয় না। ওআইসির সদস্য হওয়া আর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হওয়া এক জিনিস নয়।
এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় ওআইসি সামরিক চুক্তি নয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশ মূল নীতি ও মানদণ্ড ঠিক করবে। অন্য দেশগুলো পরে সম্মতিক্রমে যোগ দিতে পারে। তিনি মিশরের সম্ভাব্য যোগদানের কথাও বলেছেন।
কিন্তু মুসলিম বিশ্ব ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকে বহু জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হলেও, নিরাপত্তার প্রশ্নে অভিন্ন নয়।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা সমীকরণে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের জন্য ভারত ও পশ্চিম সীমান্ত বড় বাস্তবতা। তুরস্কের হিসাব ঘোরে সিরিয়া, ইরাক, রাশিয়া, ইউরোপ ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে। মিশরের রয়েছে নিজস্ব অগ্রাধিকার।
তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান কী?
আমাদের নিরাপত্তার মানচিত্রটি খুলে দেখুন। মক্কা থেকে ঢাকার দূরত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়, কৌশলগতও বটে।
মক্কা চুক্তির মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য ও আরব সাগর। আমাদের কেন্দ্র বঙ্গোপসাগর। আমাদের বন্দর, সমুদ্রপথের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক সম্পদ ও আঞ্চলিক সংযোগ -- সবকিছুই ঘোরে এই সাগরকে কেন্দ্র করে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার।
আমাদের নিরাপত্তা পরিবেশ সরাসরি যুক্ত উত্তর-পূর্ব ভারত, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গেও।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় -- বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে তার তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর মধ্যে কোনটি সমাধান হবে?
আমার উত্তর -- খুব বেশি কিছু নয়।
রাজনৈতিক মর্যাদা হয়তো বাড়বে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন দরজা খুলতে পারে। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
কিন্তু বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা কি রাতারাতি উন্নত হবে? ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কি সহজ হবে? মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে? রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে? জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে?
উত্তর যদি না হয়, তাহলে একটি কঠিন প্রশ্ন করতেই হবে -- কোন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমরা কোন নতুন সমস্যা আমদানি করছি?
একটি জোটের সবচেয়ে বড় সুবিধা যৌথ নিরাপত্তা। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও সেখানেই -- অন্য কারো নিরাপত্তা সংকট আপনার নিজেরও হয়ে উঠতে পারে।
ধরা যাক, সৌদি আরব ও ইরান আবার সরাসরি সংঘাতে জড়াল। সেটা কি বাংলাদেশের যুদ্ধ? না। ধরা যাক, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বড় সামরিক সংকট দেখা দিল। সেটা কি বাংলাদেশের যুদ্ধ? না।
কিন্তু বাংলাদেশ যদি এমন একটি কাঠামোর অংশ হয়, যেখানে সদস্যদের নিরাপত্তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত, তাহলে এ ধরনের সংঘাতের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অভিঘাত থেকে সম্পূর্ণ বাইরে থাকা কঠিন হবে।
এই জায়গায় এখন যোগ না দেওয়া দুর্বলতার সিদ্ধান্ত নয়। এটি হতে পারে কৌশলগত ধৈর্যের সিদ্ধান্ত।
ইউক্রেনের উদাহরণ প্রায়ই টানা হয়। অনেকে বলেন, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে চেয়েছিল বলেই রাশিয়া হামলা করেছে। কিন্তু ইতিহাসকে এতটা সরলীকরণ করলে ভুল শিক্ষা নেওয়া হয়।
২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে এবং দনবাসে সংঘাত শুরু করে, তখন ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য ছিল না। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সময়ও এটি সদস্য ছিল না।
ন্যাটো নিজেই বলছে, ২০০৮ সালে ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ সদস্যপদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা সদস্য হয়ে ওঠেনি।
২০১৪ সালের পর ইউক্রেনের ন্যাটো-মুখী নীতি বরং আরও দৃঢ় হয়েছে। তাই "ন্যাটোতে যোগ দিতে চাওয়াই যুদ্ধের কারণ" -- এটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নয়।
তবে ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একটি জোটের প্রতিশ্রুতি নিজের সামরিক সক্ষমতার বিকল্প নয়।
২০১৪ সালের পর ন্যাটো ইউক্রেনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, সংস্কারে সহায়তা করেছে, সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে এবং সাইবার প্রতিরক্ষা ও রসদ সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তা সত্ত্বেও ২০২২ সালের হামলা ঠেকানো যায়নি। ন্যাটোর সদস্য না হওয়ায় ইউক্রেন অনুচ্ছেদ ৫-এর নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও পায়নি।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট -- জোটে ঢোকার আগে নিজের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বাস্তবসম্মত বিকল্প কী?
আমার মতে, ঢাকার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত নীতি হলো -- এখনই সদস্য না হওয়া, কিন্তু গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকা।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে হবে। তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আর প্রতিরক্ষা জোটকে এক করে দেখা যাবে না।
তুরস্ক থেকে ড্রোন কেনা ভালো। তার চেয়েও ভালো সেই প্রযুক্তি শেখা, দেশে উৎপাদন করা ও গবেষণা করা। সৌদি আরব থেকে বিনিয়োগ চাওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্স পাওয়ার পুরোনো সম্পর্কের বাইরে গিয়ে, শিল্প, জ্বালানি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সৌদি পুঁজি আনার চেষ্টা করতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক শিক্ষা, স্টাফ প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সেটিকে ভারতবিরোধী সামরিক সমীকরণে পরিণত করা যাবে না।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী। তাকে আমাদের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রক বানানো যেমন ভুল, তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ভাবাও তেমনি অবাস্তব।
বাংলাদেশের প্রয়োজন ভারসাম্য। শত্রু তৈরি নয়।
আর এখানেই, আমার মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদটি এখনো পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়নি -- বঙ্গোপসাগর।
মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগ যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, বাংলাদেশের ভূগোলও তত মূল্যবান হয়ে উঠবে।
বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নজরদারি, উদ্ধার তৎপরতা, জলদস্যুতা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নৌ-প্রশিক্ষণ ও সামুদ্রিক পরিস্থিতি সচেতনতায় সক্ষমতা বাড়াতে পারলে, অন্য কারও নিরাপত্তা ছাউনির নিচে দাঁড়ানোর প্রয়োজন কমে আসবে।
উল্টো অন্যরাই আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। এটিই একটি দেশের প্রকৃত কৌশলগত স্বাধীনতা।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সুযোগও বটে। কিন্তু সেই সুযোগের অর্থ এই নয় যে দৌড়ে গিয়ে সদস্য হতে হবে। কিছুটা সময় নেওয়া দরকার।
দেখা দরকার, জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কেমন রূপ নেয়, যৌথ প্রতিরক্ষা কতটা কার্যকর হয়, অন্য দেশগুলো কীভাবে যুক্ত হয়, সদস্যদের ওপর প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের দায়বদ্ধতা বর্তায়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ -- সংকটের প্রথম পরীক্ষায় তিন প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র কীভাবে সাড়া দেয়।
একটি জোটের প্রকৃত শক্তি তার উদ্বোধনে দেখা যায় না। দেখা যায় তার প্রথম সংকটে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মক্কা চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, ঢাকার আগ্রহ রয়েছে এবং নেতৃত্বকে আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।
রয়টার্সও জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এই অবস্থানকেই আমার সঠিক মনে হয়। দরজা বন্ধ নয়। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আর ভেতরে ঢুকে পড়া এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশ এখন পর্যবেক্ষণ করবে, আলোচনা করবে, নিজের সক্ষমতা বাড়াবে, শর্তগুলো বুঝবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। এটি কোনো ভীত রাষ্ট্রের নীতি নয়। এটি একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি।
যে রাষ্ট্র জানে না সে কী চায়, সে অন্যের জোটে জায়গা খোঁজে। যে রাষ্ট্র জানে তার স্বার্থ কোথায়, সে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে।
মক্কা চুক্তি আগামী দশ বছরে একটি বড় মুসলমান নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হতে পারে। এর পরিসর প্রসারিত হতে পারে, মিশরের মতো দেশ যোগ দিতে পারে, আরও অনেক রাষ্ট্র আসতে পারে।
আবার এমনও হতে পারে যে, তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের কারণে এর সামরিক সংহতি সীমিতই থেকে যাবে। আজ কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না, কোনটি ঘটবে।
সে কারণেই মক্কা চুক্তির পরের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এই -- এটি কি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির একটি কাঠামো হয়েই থেকে যাবে, নাকি প্রকৃত সামরিক শক্তিতে রূপ নেবে?
বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অনেকাংশে সেই উত্তরের ওপরই নির্ভর করা উচিত।
আমার কাছে আজকের সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট -- বাংলাদেশের এখনই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু একে উপেক্ষাও করা উচিত নয়।
এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকুক, সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াক, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাক, পাকিস্তানের সঙ্গে নির্বাচিত সামরিক সহযোগিতা বাড়াক -- আর একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে নিজের কৌশলগত বিকল্পগুলো মজবুত করুক।
সম্পর্কে বৈচিত্র্য, সক্ষমতায় স্বনির্ভরতা, সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মিত্রের সংখ্যা নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, প্রয়োজনের সময় সে কতগুলো বিকল্প থেকে বেছে নিতে পারে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য কোনো নতুন "ইসলামি ন্যাটো"-র কনিষ্ঠ অংশীদার হয়ে ওঠা হওয়া উচিত নয়।
লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেই দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে কাজ করতে পারে, তুরস্ক থেকে প্রযুক্তি নিতে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক শিক্ষা ভাগাভাগি করতে পারে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে, জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো গড়তে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা করতে পারে, আর ভারতের সঙ্গে বজায় রাখতে পারে প্রতিবেশীসুলভ অথচ স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক।
সবার সঙ্গেই কাজ করা যায়। আবার কারও ওপর নির্ভরশীল না হয়েও কাজ করা যায়।
মক্কা চুক্তি আমাদের জন্য কেবল একটি নতুন সামরিক চুক্তির সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে -- আমরা কি একটি শক্তির নিরাপত্তা ছাউনির নিচে দাঁড়াতে চাই, নাকি এমন সক্ষমতা গড়তে চাই, যা প্রয়োজনের সময় আমাদের জন্য একাধিক ছাতা খোলা রাখে?
আমার উত্তর দ্বিতীয়টি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক জোটের হাতে নেই। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা আমাদের ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে কতটা আধুনিক করতে পারি, আর বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা ধরে রাখতে পারি -- তার ওপর।
মক্কা থেকে ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো জোটে যোগ দেওয়া নয়। বরং নিজেদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া -- দুটোই বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হয়েই থাকে।
সেটাই প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
দেল এইচ খান (মেজর মোঃ দেলোয়ার হোসেন) একজন অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা, কৌশলগত বিশ্লেষক, লেখক ও প্রকাশ্য ভাষ্যকার।