যেই বাংলাদেশটি বিদেশি পর্যটকরা দেখতে আসে
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে স্থানীয় পর্যটক হিসেবে আমরা কী কামনা করি, তার বাইরে গিয়ে বিদেশি পর্যটকরা কীসে আগ্রহী বলে আমাদেরকে জানাচ্ছে সেদিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।
আপনি কি চান বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তরিত হোক? আপনি কি জানেন, অন্যান্য গন্তব্যের ভিড়ে ঠাসা বাজারে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে তার নিজস্বতা আবিষ্কার করে তা একটি নির্দিষ্ট পর্যটকগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরতে হবে?
একের পর এক সরকারের অধীনে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, এবং সামাজিক মাধ্যমে সম্ভাব্য ও বর্তমান বিদেশি পর্যটকদের উদ্দেশ্য করে কিছু স্বনিযুক্ত "পরামর্শদাতা"-দের দেওয়া উপদেশ বিচার করলে বোঝা যায় যে বাংলাদেশিদের এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো ধারণাই নেই।
আর তার কারণ হলো, অভিযান প্রিয় বিদেশিরা অতীতে যাতে আগ্রহ দেখিয়েছে, এবং সচ্ছল স্থানীয়রা যাতে আগ্রহ দেখায় -- যা তারা বিদেশি অতিথিদের ওপর প্রক্ষেপণ করে -- এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে বিশাল ফারাক।
ঢাকা শহর দিয়েই শুরু করা যাক। বিদেশি পর্যটকরা কি প্রথমেই বসুন্ধরা বা যমুনা ফিউচার শপিং কমপ্লেক্স দেখতে আসে? তারা কি নিছক গুলশান-বনানী-বারিধারার নিরাপত্তাবেষ্টিত সুরম্য এলাকাগুলো হেঁটে দেখতে আসে?
তারা কি কোনো উঁচুমানের ইতালীয় বা লাতিন আমেরিকান রেস্তোরাঁয় খেতে আসে? তারা কি কোনো জমকালো আন্তর্জাতিক হোটেলের সুইমিং পুলের ধারে বিশ্রাম নিতে আসে? তারা কি কেবল অভিজাত ক্যাফেতে বসে লাতে চুমুক দিতে আসে?
এবার আসা যাক বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত বলে বহুল প্রচারিত কক্সবাজারের প্রসঙ্গে। বিদেশি পর্যটকরা কি সত্যিই দলে দলে সেই প্রস্তাবিত শ্বেত হস্তীর মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (ধন্যবাদ হাসিনাকে) ব্যবহার করে একটি মুসলমান-প্রধান দেশে সম্পূর্ণ বেমানান নানারকম উচ্ছৃঙ্খল ভোগবিলাসে লিপ্ত হয়ে, প্রায় দিগম্বর হয়ে সূর্যপুজো করতে আসবে?
এই প্রস্তাবনাকে আরও হাস্যকর করে তুলতে একের পর এক সরকার অতিথিদের জন্য ক্যাসিনো, বার, নাইটক্লাব, ব্যক্তিগত এলাকা ইত্যাদিসমূহ সংবলিত নিরাপত্তাবেষ্টিত রিসোর্টের কথাও ভেবেছে।
আমরা জনগণ হিসেবে আমাদের সৈকতে এই বিদেশি-একচেটিয়া স্থাপনাগুলো দেখতে চাই কি না, সেই প্রশ্ন আলাদা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কখনও প্রশ্নই তোলেনি যে, বিশ্বজুড়ে যখন এমন সুবিধা এমনিতেই ছড়িয়ে আছে এবং সুপরিচিত, তখন বাংলাদেশের মতো একটি দেশে সেই একই সুবিধা উপভোগ করতে বিদেশ থেকে দলে দলে পর্যটক আসবেই বা কেন।
উত্তরটি হলো, তারা আসবে না। তারা জানে যে তারা যেভাবে ও যেই আচরণে অভ্যস্ত, সেভাবে সৈকত, বার, ক্লাব, ক্যাসিনো উপভোগ করার চেষ্টা একটি মুসলমান-প্রধান দেশে স্রেফ অনুপযুক্ত। তারা আসবে না।
তাহলে আমরা কেনই বা এমন সব স্থাপনার মাধ্যমে দেশকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইব? আমাদের দেশ কি সেসবের জন্য পরিচিত? শত হলেও, এগুলো তো সেসব জিনিস যা আমাদের সচ্ছল স্থানীয়রা কামনা করে, আর সহজলভ্য হলে তারাই এসবের প্রধান দর্শক হবে।
বিদেশি পর্যটকরা আলোচনা ফোরাম, ব্লগ ও ভ্লগের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে আমাদের দেশের আসল বৈশিষ্টগুলো কী এবং তা তারা আমাদের অনেকের চেয়েও ভালোভাবে জানে। তারা বলেছে, বাংলাদেশ এমন সব অনন্য অভিযানের সুযোগ করে দেয় যা পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গায় ঠিক এভাবে মেলে না। আমাদের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কি এদিকেই ফেরানো উচিত নয়?
আমি লক্ষ করেছি, একজন বিদেশি পর্যটক চলন্ত ট্রেনের ছাদে চড়ে বসলে বাংলাদেশি ইউটিউব অনুসারীরা শিউরে ওঠে। কেন যেন সেই দুঃসাহসিকতা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় -- কারণ একটি "সভ্য" ও "উন্নত" দেশ কখনোই এমনটা হতে দেবে না!
কিন্তু বিষয়টা তো সেটাই, তাই না? তারা কি নিজেদের দেশে যেসকল অভিজ্ঞতা পায় না, ঠিক সেই অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করতেই এখানে আসেনি? আর সেটাই কি সেই কারণ নয়, যেই কারণে আমাদের মধ্যেকার সচ্ছলরাও অন্য দেশে বেড়াতে যায়?
আমাদের মধ্যে অনেক শহরবাসীই আছে যারা শহরের কিছু কিছু এলাকায় যেতে চায় না -- ধুলো, ময়লা, নোংরা কিংবা সামগ্রিক দুর্বল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অবস্থার (প্রকৃত হোক বা অনুভূত) কারণে। ঠিক আছে, আমাদের তো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কফি শপ আছেই।
কিন্তু বিদেশি পর্যটকরা সেরকম পরিবেশে বাস করা ও পরিশ্রম করা মানুষদের মাঝে আন্তরিক মেলামেশা ও বন্ধুত্ব খুঁজে পেলে আমাদের কি তাতে লজ্জায় নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে হবে? শত হলেও, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তো তার মানুষের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা -- এই মতে সব পর্যটকই একমত।
আমি জানি আমরা বুড়িগঙ্গা নদীকে দুর্গন্ধযুক্ত ও নোংরা মনে করি। তবুও আগ্রহী বিদেশি পর্যটকরা তা উপেক্ষা করে একটি ভাড়া করা নৌকায় চড়ে এক সুপ্রাচীন বাণিজ্যিক সভ্যতার ঝলক দেখতে পায়। হয়তো আমাদের আরেকটু বাইরে বেরোনো দরকার।
একের পর এক বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করুন, তার মতে দেশে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ কী। উত্তর হয়তো সেই সৈকতের দিকেই ঘুরপাক খাবে। অথচ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা -- এই তিন প্রবল নদীর কথা প্রায় কেউই বলবে না, যেগুলো দেশের প্রাণ, তার বাণিজ্যিক ইতিহাস, তার সংস্কৃতি, তার ঐতিহ্যের ভিত্তি।
অথচ, এই নদীগুলোর সর্বব্যাপী উপস্থিতি (বিশেষত বছরের মাঝামাঝি সময়ে) এবং চাঁদপুরে তাদের মোহনা এমন এক অভিজ্ঞতা দেয়, যার পৃথিবীর আর কোথাও ঠিক এভাবে পুনরাবৃত্তি হয় না। এই নদীগুলো ও তাদের তীরকে (যখন দৃশ্যমান) কেন্দ্র করে কি আকর্ষণ গড়ে তোলা ও প্রচার করা উচিত নয়? সম্ভাবনা বিশাল।
বাংলাদেশে এমন কিছু অতি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে যা হাজার বছরেরও বেশি আগে এই ভূমিকে সাজিয়ে তোলা বৌদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে।
ইউনেস্কো এগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করলেও, তীর্থযাত্রী বা গবেষক হিসেবে এসব স্থান দেখতে আগ্রহী প্রতিবেশী দেশগুলোর বৌদ্ধ, এবং বিত্তবান এবং/অথবা উচ্চশিক্ষিত পশ্চিমাদের কাছে আমাদের প্রচারণা কোথায়?
প্রাচীন হিন্দু মন্দির, মসজিদ ও গির্জাগুলো তুলে ধরার প্রচারই বা কোথায়? বাংলাদেশে ইতিহাসের অভাব নেই, আর এসবের সাক্ষ্য দেওয়ার মতো বহু আকর্ষণীয় স্থানও আছে। ইউনেস্কো-স্বীকৃত নয় এমন স্থানগুলোও সংরক্ষণ ও প্রচারে দেশ কেন অন্তত সামান্য অর্থও ব্যয় করছে না?
বিশ্বের হরেক রকম রন্ধনশৈলীর মধ্যে, আমাদেরটা -- বস্তুত গোটা উপমহাদেশেরটাই -- বহু দেশের মানুষের কাছে সমাদৃত।
কল্পনা করুন তো, বাংলাদেশ জুড়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে যদি প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হতো, যাতে তারা বিদেশি পর্যটকদেরকে নিরিবিলি, নিরাপদ ও আরামদায়ক গ্রামীণ অবকাশ দিতে পারে -- খাবারও সেই প্যাকেজের একটি অংশ হিসেবে -- তাহলে কেমন হতো!
শুধু ভাবুন, এতে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে পারত, পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার নিজস্ব রন্ধনশৈলীও কীভাবে পরিচিতি পেত।
এর সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে আগ্রহী আন্তর্জাতিক মুসলমান ভ্রমণকারীদের জন্য হালাল-খাদ্য আতিথেয়তার বিপণনও। বাংলাদেশে শাকাহারের বাজার (vegetarian market) এখনও প্রায় অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে, অথচ সামান্য কল্পনাশক্তি দিলেই এর সম্ভাবনা অসীম।
এই প্রসঙ্গে চলে আসে এমন একটি ক্ষেত্র, যা বাংলাদেশে ইতিমধ্যে পূর্ববর্তী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে খানিকটা অন্বেষিত হয়েছে -- বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের এলাকাগুলোতে ইকোট্যুরিজম -- যেখানকার প্রাণবন্ত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে থাকা ও খাওয়া হয়। সবার স্বার্থে এটিকে আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে স্থানীয় পর্যটক হিসেবে আমরা কী কামনা করি, তার বাইরে গিয়ে বিদেশি পর্যটকরা কীসে আগ্রহী বলে আমাদেরকে জানাচ্ছে সেদিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।
তাদের চোখ দিয়ে নিজেদের দেশ দেখলে, যেখানে আমরা কোনো সৌন্দর্যই নেই ভেবেছিলাম, সেখানেও সৌন্দর্য উন্মোচিত হতে পারে। যেখানে আমরা লজ্জা ও সংকোচ অনুভব করেছি সেখানেই ফুটে উঠতে পারে আনন্দ ও রোমাঞ্চ। আর তাতে হয়তো নিজেদের ও নিজেদের দেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাও বদলে যেতে পারে।
রিয়াজ ওসমানী একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক।