বাংলাদেশ ব্যাংক ড. আহসান এইচ মনসুরের মেয়াদ থেকে কী শিখতে পারে
আহসান মনসুরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় অনেক দূর। এগুলো এমন এক পথনকশা তুলে ধরে, যা এমন এক সময়ে জনপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্নির্মাণের দিশা দেয়, যখন বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক পছন্দের মুখোমুখি।
ড. আহসান এইচ মনসুর, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩তম গভর্নর, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন -- বাংলাদেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম টালমাটাল এক সময়ে।
দেশ তখন মুখোমুখি হয়েছিল গুরুতর ব্যাংকিং সংকটের, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার, এবং সুশাসন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের।
আইএমএফ, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এবং ব্র্যাক ব্যাংকে কাটানো কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে ড. মনসুর দক্ষতার সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করেন এমন এক সময়ে, যখন মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা তলানিতে ঠেকেছিল।
আজ, বাংলাদেশ যখন কঠিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন মনসুরের অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
তার কেন্দ্রীয় বার্তা স্পষ্ট: টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, এবং বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
জুলাই ২০২৪: একটি মোড়-পরিবর্তনকারী মুহূর্ত
মনসুর জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে নিছক একটি রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে আরও বেশি কিছু হিসেবে দেখেন। তার মূল্যায়নে, এটি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারের এক বিরল সুযোগ তৈরি করেছিল।
তিনি যুক্তি দেন যে বাংলাদেশ ব্যাংক তখনই কার্যকরভাবে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারে, যখন তা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ছাড়া সুষ্ঠু মুদ্রানীতি প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যায়।
তিনি আরও মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক মেরুকরণ জনপরিসরের বিতর্ককে দুর্বল করেছে এবং অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনাকে ব্যাহত করেছে।
তার বিশ্বাস, ২০২৪-এর শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রতি একটি বৃহত্তর দাবিকে প্রতিফলিত করেছিল।
প্রবৃদ্ধির আগে সুশাসন
সাবেক গভর্নর মনসুরের মতে, অর্থনৈতিক অস্থিরতার মূলে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতাই নিহিত। ব্যাংকিং সংকট, খেলাপি ঋণের পাহাড়, এবং ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম রাতারাতি তৈরি হয়নি। এগুলো বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বল তদারকির ফল।
তিনি রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিদের ব্যাংক খাতের দুরবস্থার একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাই সংস্কারের সূচনা হতে হবে শক্তিশালী সুশাসন, আইনি জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্পষ্ট বিচ্ছেদ দিয়ে।
ব্যাংক খাত পরিচ্ছন্ন করা
মনসুরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন। ইসলামী ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানো প্রমাণ করে, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে জনআস্থা দ্রুতই ফিরে আসতে পারে।
তার বৃহত্তর কৌশলে ছিল সুশাসন সংস্কার, সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা, আর্থিক অপরাধ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়।
যৌথ তদন্ত, বিদেশি সরকারগুলোর সাথে সহযোগিতা, এবং আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থার সম্পৃক্ততা দেশে ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে সহায়ক হয়েছে। লক্ষ্য ছিল কেবল অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াই সংকট ব্যবস্থাপনা
মনসুর সংকটকালে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্তকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। তার যুক্তি, এই পদক্ষেপগুলো অতিরিক্ত মুদ্রা সৃষ্টি এড়িয়েও একটি ব্যবস্থাগত পতন ঠেকিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, জরুরি সহায়তার সাথে যুক্ত ছিল কঠোর তদারকি, ব্যবস্থাপনা সংস্কার এবং নৈতিক ঝুঁকি কমাতে বর্ধিত পর্যবেক্ষণ।
তার অবস্থান স্পষ্ট: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, সরকারি ব্যয়ে অর্থায়ন করা নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার মেয়াদে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে কোনো টাকা ছাপানো হয়নি।
আস্থা গড়ে তোলা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ
মনসুর জোর দেন যে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
অর্থ পরিশোধে বিলম্ব ও অর্থনীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেনে সহায়তা দিতে অনিচ্ছুক হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের বাণিজ্য ও আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন ছিল বকেয়া পরিশোধ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পৃক্ততা, এবং স্বচ্ছতা ও সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকার প্রদর্শন। তার মতে, বিনিয়োগকারীরা খোঁজেন পূর্বানুমানযোগ্য নীতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান -- স্বল্পমেয়াদি সমাধান নয়।
অর্থনীতির বাইরে: ভবিষ্যতের জন্য এক সংস্কার-অভিসন্ধি
সামনের দিকে তাকিয়ে মনসুর একাধিক কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করেন।
এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা জোরদার করা, কর প্রশাসনকে কর নীতি থেকে পৃথক করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মীদের মান ও পারিশ্রমিক উন্নত করা, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার করা, এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ত্বরান্বিত করা।
তিনি দুর্নীতি কমাতে ও আর্থিক ব্যবস্থাজুড়ে সম্মতি (কমপ্লায়েন্স) উন্নত করতে স্বয়ংক্রিয়করণ ও প্রযুক্তির গভীরতর ব্যবহারেরও পক্ষে।
অর্থনীতির বাইরেও, মনসুর জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেন।
ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিল্প স্থাপনা, রেল করিডোর, নদীতীর ও জলাশয়ের মাধ্যমে সৌরশক্তিতে সম্প্রসারিত বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি, যাতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহনশীলতা শক্তিশালী হয়।
আহসান মনসুরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় অনেক দূর। এগুলো এমন এক পথনকশা তুলে ধরে, যা এমন এক সময়ে জনপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্নির্মাণের দিশা দেয়, যখন বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক পছন্দের মুখোমুখি।
তার বার্তা হলো -- নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপে অর্থবহ সংস্কার অর্জিত হয় না। এর জন্য চাই রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কঠোর জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশ তার অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সফল হবে কি না, তা মূলত নির্ভর করবে এই নীতিগুলো আঁকড়ে ধরার সদিচ্ছার ওপর। ২০২৪ সালে তৈরি হওয়া সুযোগ এখনও জীবিত -- তবে কেবল দৃঢ়চেতা ও স্বচ্ছ নেতৃত্বই সেই সুযোগকে স্থায়ী অগ্রগতিতে রূপান্তরিত করতে পারে।
ড. মুনীর কুদ্দুস প্রেইরি ভিউ এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির একজন এনডাউড অধ্যাপক। পূর্ববর্তী খসড়ায় সহায়ক মন্তব্যের জন্য তিনি ড. আহসান মনসুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। লেখকের সাথে যোগাযোগ করা যাবে [email protected]এ।