পার্টিতে ৮৫ জনকে গ্রেপ্তারের মতো আপাতদৃষ্টে সামান্য একটি ঘটনার সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের সম্পর্ক কী?
মাদকবিরোধী লড়াইয়ের নামে বন্দুক হাতে টিকটকে হাজির হওয়া ইশরাকের বিরুদ্ধে এবং একটি ক্লিনিক দখল করে নেওয়া বিএনপির নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে এই ধাঁচের আচরণ তিনি সহ্য করবেন না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার বিরুদ্ধে একটানা সমালোচনা চলেছে; তার কিছু ছিল ন্যায্য, কিছু ছিল অন্যায্য। পাশাপাশি পত্রিকা দুটি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠেছে, এমনকি তাদের দপ্তরে হামলাও হয়েছে।
তখন আমরা অনেকেই বলেছিলাম, পত্রিকার দপ্তরে হামলা করার বদলে এই প্রকাশনাগুলোর ব্যাপারে যাদের আপত্তি রয়েছে, তাদের উচিৎ নিজেদের একটি বিকল্প পত্রিকা দাঁড় করানো।
অনেকে জবাবে বলেছিল, আমার দেশ ফিরে এসেছে। মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে আমার দেশই হবে নতুন প্রথম আলো।
আমার জবাব ছিল, আমার দেশ হয়তো এক নতুন ধাঁচের আমার দেশ হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু কখনোই নতুন প্রথম আলো হতে পারবে না।
কেন, তার একটি উদাহরণ দিই।
একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় একটি পার্টি চলাকালে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ৮৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আমার দেশ ভিডিও ফুটেজ থেকে তরুণ-তরুণীদের ছবি বের করে তাদের নাম, পরিচয় ও ছবি ছাপিয়েছে এবং ঘটনাটিকে প্রধান খবর করেছে।
এমনকি তাদের বাবাদের নাম ও পরিচয়ও বেশ বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তালিকা না পেলে আমার দেশের সাংবাদিকদের পক্ষে এত তথ্য সংগ্রহ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
এই পুরো ঘটনা নিয়ে আমার কিছু বলার রয়েছে।
হাসিনার কুশাসন বাংলাদেশকে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। এর থেকে বেরোনোর পথ একটিই।
অনেক মানুষ জানে না যে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একটি বোমা ফাটিয়েছে।
আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে অত্যন্ত কম, মুদ্রাস্ফীতি বেশি, আর ২০৩১ সালের মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার মান নেমে যাবে ১৬০ টাকায়।
আমি অবাক হই, আইএমএফ কেন এই পূর্বাভাস দিতে এত দেরি করল।
২০২৩ সালে প্রকাশিত আমার বই "উন্নয়ন বিভ্রম"-এ আমি অত্যন্ত স্পষ্ট করেই বলেছিলাম যে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।
শেখ হাসিনার পতনের ঠিক পরপরই বাংলা একাডেমিতে যখন ফাহাম ভাই, ফায়েজ ভাই ও আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল, তখন আমার প্রথম বাক্যটিই ছিল:
"অর্থনৈতিক সংকটের ফলে শেখ হাসিনার পতন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেই সংকট আসার আগেই আমরা তাকে নামিয়েছি। ফলে পরবর্তী সরকারকে অবধারিতভাবে অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।"
সংকটের চেহারা কেমন হবে, কীভাবে তা ঘটবে আর কেন ঘটছে, সেই আলোচনায় আমি যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম, তা আইএমএফের বর্তমান বিশ্লেষণ থেকে খুব দূরে নয়।
সেই সংকট এখন এসে গেছে।
সমাধানটিও আমি চিহ্নিত করেছিলাম; বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই।
জিয়াউর রহমান যেই তিনটি প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি রেখে গেছেন, অর্থাৎ তৈরি পোশাক, কৃষি ও প্রবাসী আয়, সেগুলোকে উৎপাদন সক্ষমতার সীমা পর্যন্ত নিংড়ে নেওয়া হয়েছে।
সেগুলো আর যথেষ্ট বাড়ছে না এবং বৃহত্তর সংকট কাটিয়ে ওঠার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাতে পারছে না।
এখন সামনে এগোনোর একমাত্র পথ হলো এফডিআই, অর্থাৎ বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ।
বৈশ্বিক পুঁজি ছাড়া এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার দিক থেকে একটি দরিদ্র জাতি।
আমাদের রাজনীতিক, আমলা, এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ঘাটতিতে রয়েছে।
আমার অভিজ্ঞতায়, আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের একজনও কোনো তৃতীয় সারির ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর সাথে আলোচনায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাবে।
তাই আমাদেরকে বৈশ্বিক পুঁজিকে দেশে ঢুকতে দিতে হবে; সেই পুঁজি বেশি উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও যৌক্তিকতা সাথে করে নিয়ে আসবে।
আমার যুক্তি হলো, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যেমন করেছে, তেমনই নাইকি, অ্যাপল বা এএমডির মতো প্রতিষ্ঠানের কারখানা বাংলাদেশে বসাতে চাইলে আমাদেরকে একটি উদারপন্থী সমাজের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কেন উদারপন্থী সমাজ গড়তে হবে?
ঠিক এই যুক্তির কারণেই আমার নানা আপত্তি সত্ত্বেও আমি জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায় আসার বিরোধিতা করেছি এবং বিএনপিকে সমর্থন করেছি।
আমি জানতাম যে জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশকে এমন এক দিকে নিয়ে যাবে, যেখানে "সংস্কৃতি যুদ্ধ" এবং পোশাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে লড়াই জাতীয় আলোচ্যসূচিতে প্রাধান্য পাবে।
এবং ফলাফল হতো এই যে, কোনো এফডিআই দেশে আসত না।
বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ আর ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যকার সম্পর্কটি আমাদের বুঝতে হবে।
বৈশ্বিক পুঁজি আকর্ষণ করতে হলে একটি দেশকে উদারপন্থী মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সমাজ গড়তে হয়। সেই মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন।
আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে উদারপন্থী মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক পুঁজির সম্পর্ক শুধু বিত্তবান মানুষদেরকে আনন্দ করতে দেওয়ার একটি বিষয়।
যারা অঢেল অর্থ উপার্জন করে, তারা তো জীবনকে নানাভাবে উপভোগ করতে চায়; তাই হয়তো তাদেরকে মদ পান করতে, পার্টিতে যেতে এবং এই ধাঁচের আরও কাজ করতে দিতে হবে।
কিন্তু বিষয়টি তা নয়।
আসল বিষয় হলো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন।
যখনই কোনো সমাজ রাষ্ট্রকে, এবং রাষ্ট্রের পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা শাখাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়, যখনই সেই সমাজ কর্তৃপক্ষকে মদ্যপানের অভিযোগে একটি পার্টি থেকে একশ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে গ্রেপ্তার করার সুযোগ দেয়, তখনই সেটি আরেকটি সংকেত পাঠায়।
সংকেতটি হলো: রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রায় সীমাহীন, এবং যারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তারা চাইলে একজন ব্যক্তির পুঁজি বাজেয়াপ্ত করতে বা তার বিনিয়োগ কেড়ে নিতে পারে।
সমাজতন্ত্রেও একই সমস্যা রয়েছে।
কিউবায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিল উল্লেখযোগ্য, কিন্তু দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। অন্তর্নিহিত সমস্যাটি ছিল একই, অর্থাৎ ক্ষমতার বণ্টন।
যেই রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন ব্যক্তি মদ পান করবে কি না বা পার্টিতে যাবে কি না, সেই রাষ্ট্রে দেশি বা বিদেশি, কোনো বিনিয়োগকারীই নিজের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা রাখতে পারে না।
কারণ সেই একই পুলিশ কর্মকর্তা, ডিবির কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও র্যাবের সদস্যরা আপনার কারখানা দখল করে বলতে পারে: "আমরা এখানে মদ পেয়েছি। এখন বের হও।"
এই কারণেই বিনিয়োগ করার আগে বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের নাগরিকেরা কতটা ব্যক্তিস্বাধীনতা ভোগ করে, তা বিবেচনা করে।
এটি সংকেতের প্রশ্ন। এবং আমার দেশ যেই সংকেতটি পাঠাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কী প্রকাশ করবে আর কী করবে না, তা একটি পত্রিকা নিজে থেকেই নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার রাখে।
কিন্তু বৈশ্বিক পুঁজি লক্ষ্য রাখছে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র তাদের ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করছে।
'ফোকল্ট' থেকে আমরা জানি, ক্ষমতা কেবল আইন, পুলিশ ও র্যাবের মধ্যে, কিংবা দমন করার সামর্থ্য রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উচ্ছৃঙ্খল জনতারও (মব) ক্ষমতা রয়েছে। বুদ্ধিজীবীদেরও ক্ষমতা রয়েছে। পত্রিকারও ক্ষমতা রয়েছে।
ফলে বিনিয়োগকারীরা কেবল প্রথম আলো বা বিএনপির দিকে তাকায় না।
তারা আমার দেশ ও জামায়াতের দিকেও তাকায়, যারা ক্ষমতার সিঁড়িতে নিজ নিজ অবস্থানে রয়েছে।
যদি আমার দেশ, যা ডানপন্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি পত্রিকা, তার আদর্শিক মিত্ররা প্রকৃত ক্ষমতা পাওয়ার আগেই পার্টি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া নারী-পুরুষদেরকে নিয়ে প্রধান খবর করাকে সংগত মনে করে, তাহলে সেই পত্রিকার মূল্যবোধ ধারণ করা মানুষগণ সত্যিই ক্ষমতায় এলে কী করতে পারে, সে সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা করতে পারি।
বিনিয়োগকারীরা এই ধাঁচের সংকেত থেকেও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
তারেক রহমান মধ্যপন্থী সমাজের প্রতি নিজের অঙ্গীকারের সংকেত দিচ্ছেন।
গত সাত মাসে তারেক রহমান যত ত্রুটিই করে থাকুন না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট: মধ্যপন্থী মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র গড়ার পক্ষে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক বৈধ প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু তিনি একটি অকাট্য সংকেত দিয়েছেন: তিনি সংস্কৃতি যুদ্ধে জড়াবেন না।
নির্বাচনের আগেও তিনি ভোট টানার জন্য প্রকাশ্যে মেয়েকে হিজাব পরাননি।
এদিকে আমার অনেক বছরের চেনা কয়েকজন নারী, দৃঢ় উদারপন্থী, যারা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে, তারা ভোট পেতে মাথায় এত পরত কাপড় জড়িয়েছে যে নিজের চোখে না দেখলে কখনোই তা বিশ্বাস করতাম না।
তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, তিনি মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ও উন্মুক্ততার ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়তে চান।
সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি নির্বাচনে জিতেছেন, এবং সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করছেন। দমনমূলক ধর্মীয় রাজনীতিকে তিনি প্রায় কোনো উৎসাহই দেননি।
স্ত্রী ও মেয়েকে সাথে নিয়ে তিনি সিনেমা হলে গেছেন। বেইলি রোডে গেছেন। জাইমা রহমান মাথা না ঢেকেই প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন।
তারা কী প্রদর্শন করছেন? তারা মধ্যপন্থী, মধ্যবিত্ত মূল্যবোধই প্রদর্শন করছেন। এই সংকেতটির খুব প্রয়োজন ছিল।
শেখ হাসিনার পতনের পর চরমপন্থী ও অতি রক্ষণশীল শক্তির উত্থান এবং বাংলাদেশ যেই দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, তাতে আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে এফডিআই শুকিয়ে যাবে।
সে কারণেই এই পরিবর্তন এত গুরুত্বপূর্ণ।
এফডিআই আকর্ষণের আরেকটি শর্ত হলো কম সংঘাতের সমাজ গড়া।
আরেকটি বিষয় রয়েছে।
ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণে যখন কোনো সমাজ অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তা সংঘাত তৈরি করে।
কিছু মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। তাদেরকে জোর করে সংযত করতে চাইলে উদারপন্থী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে একটি সংঘাত তৈরি হয়।
অনেক দেশে এমন লড়াই সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছে।
আজ বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে প্রবেশ করেছে। গোটা বৈশ্বিক পরিসরই বদলে যাচ্ছে।
এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকান; ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। সেখানে বিনিয়োগ হচ্ছে শত শত কোটি ডলার। কেন? কারণ তারা এই সংস্কৃতি যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি করে ফেলেছে।
মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রতিষ্ঠা করেছে যে ধর্মীয় বিধিনিষেধ কেবল তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা তা পালন করতে চায়। যারা পালন করতে চায় না, তাদেরকে বাধ্য করা হবে না।
অথচ আমরা সংস্কৃতি যুদ্ধের জগতেই আটকে আছি; শিক্ষার্থীদেরকে পার্টি থেকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ পাঠাচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা দিচ্ছি, তাদের ছবি পত্রিকায় ছাপছি, আর তারপর পুরো ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট লিখছি।
কেন এমন হবে? আমাদের তো মনোযোগ দেওয়ার কথা অন্য, আরও অনেক গুরুতর বিষয়ে। একসময় আমাদেরকে এই পর্যায় পেরিয়ে যেতেই হবে।
দেশের বুকের ওপর অনড় পাথরের মতো চেপে বসে থাকা হাসিনার আমলে কোনো আশা ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো লক্ষ্যই ছিল না, তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা ছাড়া।
কিন্তু এখন আমাদেরকে গড়তে হবে আশার বাংলাদেশ।
এই অর্থনৈতিক সংকট আমাদেরকে কাটিয়ে উঠতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার পথ ধরতে হবে। এবং সেজন্য আমাদেরকে বৈশ্বিক পুঁজিকে দেশে ঢুকতে দিতে হবে। বামদেরকে অবশ্যই পুঁজি নিয়ে তাদের আতঙ্কের সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে।
বন্দর, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে বৈশ্বিক পুঁজি ঢুকতে দিলে জাতীয় নিরাপত্তা কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হবে, এমন আতঙ্ক উত্তর কোরিয়া হওয়ারই পথ। আমাদেরকে শিখতে হবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে, উত্তর কোরিয়া থেকে নয়।
বাস্তবতা হলো, ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো বৈশ্বিক পুঁজির কেন্দ্র না হলে বাংলাদেশ বর্তমান সংকট থেকে বেরোতে পারবে না।
আমাদের এখানে আইফোনের কারখানা দরকার। আমাদের এখানে এনভিডিয়ার মাইক্রোচিপ এবং সনির ক্যামেরা সেন্সর তৈরি করতে হবে।
এই পথে না হাঁটলে শুধু দেশীয় বিনিয়োগ দিয়ে তরুণদের বেকারত্ব দূর করা কিংবা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা আমাদের নেই।
এর অর্থ এই নয় যে আমরা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল বা সামাজিকভাবে দায়িত্বহীন একটি সমাজের প্রচার করব। মালয়েশিয়া থেকে শিখুন।
এও নয় যে আমরা পূর্ণ বিশৃঙ্খলা বা উচ্ছৃঙ্খলতার একটি সমাজকে উৎসাহ দেব। না।
আমরা অবশ্যই সামাজিকভাবে আমাদের মূল্যবোধ ধরে রাখব এবং তরুণদেরকে সেগুলো গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করব। কিন্তু এটি করতে হবে সমাজের মাধ্যমে, রাষ্ট্রের মাধ্যমে নয়।
কারণ সমাজে সব সময়ই কিছু মানুষ থাকবে, যারা মদ পান করে কিংবা ধর্মীয় রীতির বাইরে জীবনযাপন করে। যতক্ষণ না তারা অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে, ততক্ষণ সেটা তাদের অধিকার।
আমি বারবার মালয়েশিয়ার উদাহরণ দিই। মালয়েশিয়ায় ঘুরে আমি দেখেছি, সেখানকার মুসলমানেরা বাংলাদেশের মুসলমানদের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মপরায়ণ। আমি যত মুসলিম নারীকে দেখেছি, তাদের অন্তত ৯০ শতাংশ হিজাব পরেছিল।
একই সাথে সেখানে বার ও নাইটক্লাব রয়েছে, এবং মানুষ নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপনের স্বাধীনতা ভোগ করে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিৎ এটাই।
আপনি নিজের পরিবার ইসলামি মূল্যবোধ অনুযায়ী গড়ে তুলতে পারেন, নিজের সম্প্রদায়কেও সেভাবে পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু কেউ ভিন্ন জীবনধারা বেছে নিয়েছে বলেই আপনি তাকে কারাগারে ঢোকাতে পারেন না।
আমরা যদি এসব করতেই থাকি, পুঁজি আসবে না এবং বাংলাদেশ আরেকটি আফগানিস্তানে পরিণত হবে। ঠিক এই আশঙ্কাই পুঁজিকে দূরে সরিয়ে রাখবে।
আইএমএফের পূর্বাভাস ভয়ংকর।
গত ৩০ বছরে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জন্য কখনো এমন ভীতিকর পূর্বাভাস দেয়নি; ২০৩১ সাল পর্যন্ত কম প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব অব্যাহত থাকবে।
তারা এখন যে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে, সেগুলো মূলত কৃচ্ছ্রসাধনেরই নামান্তর।
আইএমএফ চাইছে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হার বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক জ্বালানি মূল্য এবং বাজার নির্ধারিত বিনিময় হার।
এসব ব্যবস্থার পরিণতি হবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি ব্যয় করার সক্ষমতা হ্রাস এবং সংকুচিত সরকারি খাত।
অথচ গত ছয়-সাত বছর ধরে অর্থনীতিকে মূলত সরকারি ব্যয়ই টিকিয়ে রেখেছে।
আমার যুক্তি হলো, আইএমএফের ব্যবস্থাপত্র সমাধান নয়।
আমাদের একমাত্র সমাধান এফডিআই আকর্ষণ করা।
সেটি করতে হলে মদ্যপান, পার্টি, পোশাক এবং এই ধাঁচের বিষয় নিয়ে আমাদের আচ্ছন্নতা বন্ধ করতে হবে এবং একটি সহনশীল সমাজ গড়তে হবে।
এটি বেশ কয়েকটি প্রয়োজনীয় ধাপের একটি।
আমি বলছি না যে কেবল সংস্কৃতি যুদ্ধ থামালেই কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদেশি বিনিয়োগ চলে আসবে।
বিএনপিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, পৃষ্ঠপোষক ও অনুগতদের রাজনীতি ভেঙে ফেলতে হবে, দলীয় চাঁদাবাজ এবং প্রতিষ্ঠান দখলকারীদের হাত থেকে ব্যবসা ও অর্থনীতিকে মুক্ত করতে হবে, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং আরও অনেক কিছু করতে হবে।
কিন্তু আমার বক্তব্য হলো, বিএনপি যদি এই প্রতিটি শর্ত পূরণ করেও এবং বাংলাদেশ আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করলেও আমরা যদি একটি অনুদার সমাজ হয়ে থাকি, পোশাক ও পর্দা নিয়ে কলহে আচ্ছন্ন থাকি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তেজনায় চিহ্নিত হয়ে থাকি, তাহলে এফডিআই আসবে না।
যারা মনে করে, কেবল সস্তা শ্রমই পুঁজি টানার জন্য যথেষ্ট, তারা ভ্রান্ত।
এবং মানুষকে স্বাধীনতা দিলে কেউ কেউ মদ পান করবে, পার্টিতে যাবে। সেটি ব্যক্তিস্বাধীনতার অনিচ্ছাকৃত ফলাফল, তার লক্ষ্য নয়।
এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সামাজিকভাবে কিছু নৈতিক পাহারাদারি হতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নৈতিক পাহারাদারি আফগানিস্তান হওয়ার প্রথম ধাপ।
জিয়াউর রহমান বার খোলার অনুমতি দিয়েছিলেন। তার শাসনামলে নারী জিমন্যাস্টরা উপযোগী ক্রীড়া পোশাক পরতে শুরু করে। নারী সাঁতারুদের মধ্যেও একই পরিবর্তন ঘটেছিল।
পাকিস্তানের জিয়া ও বাংলাদেশের জিয়ার পথ ১৯৭৮ সালে কীভাবে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, তা নিয়ে জ্যোতি রহমান একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন।
অতএব তারেক রহমানকে এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ নেবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; তিনি জিয়াউর রহমানের ছেলে বলে নয়, যেটি এখানে প্রাসঙ্গিক বিবেচনা নয়, বরং তিনি একটি অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশের প্রধানমন্ত্রী বলে।
মাদকবিরোধী লড়াইয়ের নামে বন্দুক হাতে টিকটকে হাজির হওয়া ইশরাকের বিরুদ্ধে এবং একটি ক্লিনিক দখল করে নেওয়া বিএনপির নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে এই ধাঁচের আচরণ তিনি সহ্য করবেন না।
তাহলে পার্টিতে অংশ নেওয়ার জন্য মানুষকে গ্রেপ্তার করা ডিবি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনি এখন কী পদক্ষেপ নেবেন? সেটিও একটি সংকেত দেবে।
এটি বোঝাবে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে রাষ্ট্র কি নাগরিকদের ওপর নিপীড়ক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেই থাকবে, নাকি নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের দমনযন্ত্রের অনুপ্রবেশ থেকে তারা সুরক্ষিত থাকবে।
এবং সে কারণেই এই আপাতদৃষ্টে ছোট ঘটনাটির সাথে বাংলাদেশে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ আসবে কি না, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
জিয়া হাসান সিটিজেনস কোয়ালিশনের সদস্য।