অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে অস্ত্রটি আমরা কাজে লাগাচ্ছি না
দারিদ্র্য কাউকে অনৈতিক করে না, বেকারত্বও কাউকে অপরাধী বানায় না। তবে দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও হতাশা মানুষের সামনে বেছে নেওয়ার পরিসরকে সংকুচিত করে দিতে পারে।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে -- "অভাবে স্বভাব নষ্ট"। এটিকে আমি আক্ষরিক অর্থে নিই না। দারিদ্র্য মানুষকে অপরাধী বানায় না; দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেও লাখো বাংলাদেশি প্রতিদিন প্রমাণ করছে যে মর্যাদা, সততা ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তির সঙ্গে আয়ের কোনো সম্পর্কই নেই।
তবুও প্রবাদটি বাস্তবতার একটি দিক ধরতে পারে। দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থেকে বৈধ পথে জীবন বদলানোর সুযোগ খুব কম দেখলে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায় এমন পরিস্থিতি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশে অপরাধ নিয়ে বিতর্ককে কেবল পুলিশি ব্যবস্থা ও শাস্তির গণ্ডিতে আটকে রাখা উচিত নয়।
অপরাধের কারণ বহুবিধ -- প্রতিশোধ, ক্রোধ, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ভাঙন, সঙ্গীদের প্রভাব, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ও আইনপ্রয়োগের দুর্বলতা। অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বেকারত্বও এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সম্পত্তি ও রাস্তাঘাটের অপরাধে।
উদাহরণস্বরূপ, জামালপুর জেলা কারাগারের বন্দীদের নিয়ে একটি গবেষণায় দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্যকে সেখানকার অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। তবে যুক্তিটিকে সীমিত গণ্ডির মধ্যেই রাখতে হবে।
বেশির ভাগ দরিদ্র মানুষ অপরাধ করে না। আবার সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতি কিংবা অত্যাধুনিক অপরাধচক্রকে দারিদ্র্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এসবের মূলে রয়েছে ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও আইনপ্রয়োগের ব্যর্থতা, যার জবাব ভিন্ন ধরনের।
তাই এখানে দাবিটি আরও পরিমিত: বৈধ অর্থনৈতিক সুযোগের প্রসার অপরাধ প্রতিরোধের একাধিক স্তরের মধ্যে একটি স্তর হতে পারে।
কর্মসংস্থানের সংকট এক সামাজিক সংকট
বাংলাদেশ গুরুতর কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫'-এ দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের অর্ধেক কম আয়ের কাজে নিয়োজিত, যা দক্ষতার বড় অসামঞ্জস্যের দিকে ইঙ্গিত করে। উৎপাদনখাতে নতুন কর্মসংস্থান থমকে আছে, আর নারী ও তরুণেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমস্যা কেবল কাজের স্বল্পতা নয় -- সৃষ্টি হওয়া কাজগুলো প্রায়ই মানুষের দক্ষতার সঙ্গে মেলে না, মেলে না শিক্ষা যে প্রত্যাশা জাগিয়েছিল তার সঙ্গেও।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারিক দক্ষতার চেয়ে শিক্ষাগত সনদকেই বহুগুণ বেশি মূল্য দিয়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদকে সামাজিক সম্মানের পূর্বশর্ত ধরা হয়, আর কারিগরি প্রশিক্ষণকে গণ্য করা হয় শেষ আশ্রয় হিসেবে। এটি একটি ভুল।
স্থিতিশীল কাজ ও ভবিষ্যৎ আছে এমন একজন তরুণ ইলেকট্রিশিয়ান বা ওয়েল্ডার কোনোভাবেই সেই স্নাতকের চেয়ে কম সফল নয়, যার হাতে সনদ আছে অথচ বাজারে দেওয়ার মতো কোনো দক্ষতা নেই -- বরং প্রায়ই উল্টোটাই সত্য।
কিন্তু কেবল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারেই সমস্যার সমাধান হবে না। গভীরতর সমস্যা হলো শিক্ষা, শিল্প ও শ্রমবাজারের মধ্যকার দুর্বল সংযোগ। বিশ্বব্যাংক এই অসামঞ্জস্যের কথা তুলে ধরে বলেছে, প্রশিক্ষণকে আরও বাজারমুখী ও কর্মসংস্থান সহায়ক হতে হবে, আর শিল্প ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সহযোগিতা ও শিক্ষানবিশির সুযোগ বাড়াতে হবে।
কতজন প্রশিক্ষণ শেষ করল, তা দিয়ে সাফল্য মাপা বন্ধ করা উচিত। মাপা উচিত, ছয় মাস বা এক বছর পরেও কতজন কর্মরত আছে। এই পথে যে ফল মেলে, তার প্রমাণ ইতোমধ্যে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সমর্থিত 'রেইজ' কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ সালের শুরু নাগাদ ১৭ হাজার ২০০-র বেশি তরুণ শিক্ষানবিশি সম্পন্ন করেছে, এবং তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ হয় কর্মরত, নয়তো নিজস্ব ক্ষুদ্র উদ্যোগ চালাচ্ছে। কর্মসূচিটি প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকেও সহায়তা দিয়েছে। কর্মসংস্থান নীতি বলতে এমনটিই বিস্তৃত করার যোগ্য।
ঢাকার বাইরেও সুযোগ ছড়িয়ে দিতে হবে
সমাধানের একটি অংশ ভৌগোলিক। সুযোগ এখনো অতিমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক। তরুণরা গ্রাম ছাড়ে যতটা না ঘিঞ্জি রাজধানীতে থাকার সাধে, তার চেয়ে বেশি বিকল্প চোখে না পড়ার কারণে।
উৎপাদনশীল গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে অনেক বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে -- আরও মানুষকে স্বল্প-উৎপাদনশীল কৃষিতে ঠেলে দিয়ে নয়, বরং ভূমিহীন ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে সমবায়, চুক্তিভিত্তিক চাষ, আধুনিক চাষাবাদ ও প্রকৃত বাজারপ্রবেশের স্বচ্ছ ব্যবস্থার আওতায় এনে।
আমাদের অবহেলিত খাল ও জলাশয় আরেকটি অব্যবহৃত সম্পদ। এগুলো পুনরুদ্ধার করা হলে পানিনিষ্কাশন ও পরিবেশের উন্নতি যেমন হবে, তেমনি মৎস্যচাষ ও জলজ চাষে নতুন সুযোগও তৈরি হবে -- তবে শর্ত হলো, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থবহ ভূমিকা থাকতে হবে এবং প্রভাবশালীদের কব্জা ঠেকাতে স্বচ্ছ নিয়ম থাকতে হবে।
কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণেও প্রকৃত সম্ভাবনা রয়েছে। কাঁচা কৃষিপণ্য সর্বনিম্ন মুনাফায় বেচে না দিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রক্রিয়াজাতকরণ, মোড়কজাতকরণ, মজুত ও বিতরণে অংশ নিতে পারে।
নীতিটি সরল: জীবিকার খোঁজে মানুষকে ঢাকায় আসতে বাধ্য হতে হবে না।
সবচেয়ে দরিদ্রদের জন্য প্রবেশদ্বার
সবচেয়ে দরিদ্র নাগরিকদের জন্য প্রথম ধাপটি প্রচলিত দপ্তরের চাকরির মতো না-ও দেখাতে পারে। নগরের প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ও পানিনিষ্কাশন-দলের। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসমূহ এই সেবাগুলো সম্প্রসারণ করে সীমিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মানুষদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু এসব কর্মসূচি উৎপাদনশীলতার ছদ্মবেশ পরা কল্যাণ-প্রকল্পে পরিণত হলে চলবে না। দরকার প্রশিক্ষণ, সুস্পষ্ট দায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল।
চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসার আরেকটি পথ ক্ষুদ্র ব্যবসা -- মেরামতের দোকান, খাবারের ব্যবসা, পরিবহন সেবা কিংবা ছোট কৃষি উদ্যোগ, যা গড়ে ওঠে কিছু প্রশিক্ষণ, সামান্য মূলধন ও বাজারের নাগাল পাওয়ার ওপর ভর করে।
তবে ক্ষুদ্রঋণকে সব সমস্যার জাদুকরী সমাধান ভাবার বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। দক্ষতা, পরামর্শ ও বাজারের নাগাল ছাড়া শুধু মূলধন কেবল ঋণের বোঝাই তৈরি করতে পারে। 'রেইজ'-এর মতো যেসব কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও ব্যবসায়িক সহায়তা একসঙ্গে মেলানো হয়, সেগুলো শুধু ঋণের চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়।
ভালো ধারণাও সুশাসন ছাড়া ব্যর্থ হয়
এই আলোচনায় একটি অস্বস্তিকর দিক আছে, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দরিদ্র পরিবারকে দেওয়া জমি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাহন হয়ে উঠতে পারে। সরকারি নিয়োগ হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক নিয়োগ। খাল পুনরুদ্ধার পরিণত হতে পারে ক্রয়-দুর্নীতির চক্রে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কাজের বদলে উৎপাদন করতে পারে শুধু সনদ।
বাংলাদেশে এসব ঝুঁকি বাস্তব। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জুড়ে দিতে হবে: সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, প্রকাশ্যে নিরীক্ষাযোগ্য চুক্তি, প্রকৃত কর্মসংস্থানের ফলাফলে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন, এবং সরকারি অর্থে চলা প্রকল্প তদারকির অর্থবহ সক্ষমতা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী।
এসব রক্ষাকবচ ছাড়া সদিচ্ছায় শুরু হওয়া কর্মসংস্থান কর্মসূচিও হয়ে উঠতে পারে জনগণের অর্থ এদিক-ওদিক করার আরেকটি উপায় মাত্র, যা টেকসই কিছুই গড়ে তোলে না।
অপরাধের কথাই বা কী
বিভিন্ন ধরনের অপরাধকে আলাদা করে দেখা জরুরি। দ্রুত নগদ অর্থের জন্য চুরি বা ছিনতাই করা বেকার তরুণ আর একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র এক ঘটনা নয়। প্রথমটিকে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব যতটা ব্যাখ্যা করতে পারে, দ্বিতীয়টিকে ততটা পারে না।
অপরাধী সিন্ডিকেট ভাঙতে চাই আরও শক্তিশালী পুলিশি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তৎপরতা, আর্থিক তদন্ত, কার্যকর আদালত এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা। কোনো কর্মসংস্থান কর্মসূচিই সেই কাজ করতে পারবে না।
কোনো কর্মসংস্থান কর্মসূচিই সেই কাজ করতে পারবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান নীতির কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। এর অর্থ হলো, অপরাধ প্রতিরোধে একই সময়ে বিভিন্ন স্তরে একাধিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে, শুধু একটি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত জোর দিলে হবে না।
আমাদের দুটি হাতই লাগবে
বাংলাদেশের দরকার কার্যকর পুলিশ, সচল আদালত এবং আইনের অনুমেয় প্রয়োগ। অপরাধের পরিণতি থাকতেই হবে।
কিন্তু আরও তরুণ যেন ছিঁচকে ও রাস্তাঘাটের অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে -- এটাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে আমাদের এ প্রশ্নও করতে হবে যে তাদের সামনে বৈধ বিকল্প আসলে কী আছে।
বাজারে চাহিদা আছে এমন দক্ষতা, কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ, ব্যবসা শুরু করার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা এবং কঠোর পরিশ্রম করলে জীবন বদলানো সম্ভব, এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ -- এসবই যদি একজন তরুণের থাকে, তাহলে আইন ভাঙলে তার হারানোর ঝুঁকিও বেশি। এসবের কোনোটিই যার নেই, আইন ভাঙার ক্ষেত্রে তার হারানোর মতোও তুলনামূলকভাবে কম।
এই সুযোগই আমাদের গড়ে তোলার যোগ্য। দারিদ্র্য কাউকে অনৈতিক করে না, বেকারত্বও কাউকে অপরাধী বানায় না। তবে দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও হতাশা মানুষের সামনে বেছে নেওয়ার পরিসরকে সংকুচিত করে দিতে পারে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাই কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়। কার্যকর আইনপ্রয়োগের পাশাপাশি করা হলে এটি মর্যাদা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত অপরাধ প্রতিরোধেরও নীতি।
একটি হাতকে আইন প্রয়োগ করতেই হবে। অন্যটিকে গড়ে তুলতে হবে এমন কিছু, যা হারানোর ঝুঁকি কেউ নিতে চাইবে না।