বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে শেখার আসল পাঠ
শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সক্ষম নাগরিক, দক্ষ পেশাজীবী, উদ্ভাবনী চিন্তাবিদ এবং সমাজের উৎপাদনশীল সদস্য গড়ে তোলা। যতদিন না বাংলাদেশ এই নীতি গ্রহণ করে, ততদিন আমরা স্নাতকের ক্রমবর্ধমান হারকে উদযাপন করতেই থাকব, অথচ উপেক্ষা করে যাব সেই বাড়তে থাকা স্নাতকদের, যারা অর্থবহ কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছে না।
সিঙ্গাপুর বাংলাদেশিদের কল্পনায় বহুদিন ধরেই এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শুনেছি, আমাদের দেশের প্রথম সরকারপ্রধান বাংলাদেশকে "দক্ষিণ এশিয়ার সিঙ্গাপুর" রূপে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ইতিহাস তাঁকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট সময় দেয়নি, আর তিনি সফল হতেন কি না, তা জানার উপায় নেই। তবে সেই আকাঙ্ক্ষা আজও টিকে আছে।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, দক্ষতা ও সুশাসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে বারবার সিঙ্গাপুরের কথা তুলে ধরেছেন। একবার এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সিঙ্গাপুর সফরকালে আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, "সিঙ্গাপুরের মতো একটা দেশে যদি অবসরজীবন কাটাতে পারতাম।" এ কেবল একটি পরিচ্ছন্ন শহর বা দক্ষ পরিবহনব্যবস্থার প্রতি মুগ্ধতা ছিল না; এ ছিল এমন এক জাতির প্রতি শ্রদ্ধা, যে এক প্রজন্মের মধ্যেই নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছে।
আমিও সেই শ্রদ্ধা লালন করি, তবে আমার শ্রদ্ধার শিকড় কোনো ছোট্ট সফর বা শোনা কথার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কূটনৈতিক জীবনের সুবাদে আমি সিঙ্গাপুরে চার বছরেরও বেশি সময় কাটানোর সৌভাগ্য পেয়েছি। সেই বছরগুলো আমাকে দেশটিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছিল -- শুধু তার ভৌত অবকাঠামো নয়, বরং তার প্রতিষ্ঠান, নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিকেও।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে নিশ্চিত করেছে যে সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় অর্জন তার আকাশচুম্বী দালানে নয়, তার সম্পদেও নয় -- তা নিহিত আছে সে কীভাবে তার মানুষকে গড়ে তোলে, তার মধ্যে।
তাই বাংলাদেশে যখনই শিক্ষা সংস্কার নিয়ে বিতর্ক ওঠে, আমার মন বারবার সিঙ্গাপুরের দিকে ফিরে যায়। বাংলাদেশে শিক্ষার মতো এত আলোচনার বিষয় খুব কমই আছে। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা একের পর এক কমিশন গঠন করেছি, একের পর এক নীতিমালা প্রণয়ন করেছি, একের পর এক সংস্কারের পরীক্ষা চালিয়েছি।
সরকার বদলেছে পাঠ্যবই, বদলেছে পাঠ্যক্রম, বদলেছে পরীক্ষাপদ্ধতি, পুনর্গঠন করেছে প্রতিষ্ঠান। তবু এত হস্তক্ষেপের পরও একটি অস্বস্তিকর সত্য থেকেই যায় -- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের জন্য প্রস্তুত করতে পারছে না।
এর পরিণতি ক্রমশ গুরুতর হয়ে উঠছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, যা একসময় কেবল সচ্ছল পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে -- কারণ অনেক অভিভাবক সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। আজ মধ্যবিত্ত পরিবারও বিপুল আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানদের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠাচ্ছে, এই বিশ্বাসে যে তা মূলধারার ব্যবস্থার চেয়ে ভালো ভবিষ্যৎ দেবে।
উচ্চশিক্ষার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তেই থাকছে।
অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলছে অপ্রতুল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত গবেষণাগার এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি নিয়ে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যেন এক অলিখিত ধারণা কাজ করছে যে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেই জাতীয় উন্নয়নের গতি এমনিতেই বেড়ে যাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে অভিজ্ঞতা তা বলে না। ডিগ্রি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না -- অর্থনীতি করে।
শিক্ষার কাজ মানুষকে সেই অর্থনীতিতে অবদান রাখার যোগ্য করে তোলা। যখন এই দুইয়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তখন স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ প্রতিবছর হাজার হাজার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর তৈরি করছে, যাদের নেই বাস্তব জ্ঞান, নেই কারিগরি দক্ষতা, নেই নিয়োগদাতাদের চাহিদামতো বাজারযোগ্য যোগ্যতা। আমরা কার্যত গড়ে তুলছি শিক্ষিত অথচ হতাশ তরুণদের এক ক্রমবর্ধমান বাহিনী।
আমি শিক্ষাবিশেষজ্ঞ নই। আমার পর্যবেক্ষণ একজন নাগরিকের, যে বিভিন্ন সমাজে বসবাস ও কাজ করেছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে এবং বছরের পর বছর সফল দেশগুলো কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করে, তা নিয়ে চিন্তা করেছে। আমি যত ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তার মধ্যে সিঙ্গাপুরেরটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রশংসনীয় -- নিখুঁত বলে নয়, বাস্তবসম্মত বলে।
বিশ্বের দৃষ্টি প্রায়ই সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে যায়, যেগুলো ধারাবাহিকভাবে বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান পায়। কিন্তু সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থার আসল শক্তি অন্য জায়গায়। তা নিহিত এই সত্যে যে দেশটি মনে করে না যে প্রত্যেক তরুণকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হতে হবে।
সিঙ্গাপুর শুরু করে এই নিশ্চয়তা দিয়ে যে প্রতিটি শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় সাক্ষরতা, গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও নাগরিক মূল্যবোধের এক দৃঢ় ভিত্তি পাবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে নয়, তাদের আগ্রহ, সহজাত দক্ষতা ও শেখার সম্ভাবনা বিবেচনা করেও। লক্ষ্যটি বিজয়ী ও পরাজিতদের আলাদা করা নয়; লক্ষ্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সেই পথে পরিচালিত করা, যেখানে তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
সেখান থেকে সাধারণত তিনটি পথ খোলা থাকে। যাদের পাঠ্যসংক্রান্ত আগ্রহ প্রবল, তারা যেতে পারে জুনিয়র কলেজে, যা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করে। অন্যরা ভর্তি হয় সিঙ্গাপুরের পলিটেকনিকগুলোর কোনো একটিতে -- এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে কঠোর একাডেমিক পাঠের সঙ্গে মেলে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, নকশা ও আরও বহু ক্ষেত্রে শিল্পমুখী বাস্তব শিক্ষা।
পলিটেকনিক থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে কর্মক্ষম, অথচ চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথও খোলা থাকে তাদের জন্য।
আরেকটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিষ্ঠান হলো ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন (আইটিই)। অনেক উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি শিক্ষাকে অন্যায়ভাবে দ্বিতীয় সারির বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। সিঙ্গাপুর ইচ্ছাকৃতভাবে এই মানসিকতা প্রত্যাখ্যান করে।
আইটিই উন্নত উৎপাদনশিল্প, ইলেকট্রনিক্স, আতিথেয়তা, রসদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা সহায়তাসহ আরও অনেক খাতে বিশ্বমানের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেয়। এখানকার স্নাতকেরা এমন হাতেকলমে দক্ষতা নিয়ে বের হয়, যা নিয়োগদাতাদের সত্যিকারের প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এই পথগুলো কোনো অন্ধগলি নয়। আইটিই থেকে শুরু করা একজন শিক্ষার্থী পরে পলিটেকনিকে যেতে পারে, এরপর বিশ্ববিদ্যালয়েও যেতে পারে। একইভাবে, একাডেমিক শর্ত পূরণ করলে পলিটেকনিকের স্নাতকও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির পথে এগোতে পারে।
সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব।
পাঠ্যক্রম তৈরি হয় নিয়োগদাতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে। অনেক কর্মসূচিতে শিক্ষানবিশি অন্তর্ভুক্ত থাকে। শিল্পের পেশাদাররা শিক্ষাদানে অংশ নেন, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত কোর্স সমন্বয় করে। তাই শিক্ষা, জনশক্তি পরিকল্পনা ও শিল্পনীতিকে সরকারের আলাদা আলাদা কাজ হিসেবে দেখা হয় না -- এগুলোকে দেখা হয় জাতীয় উন্নয়নের পরস্পর সংযুক্ত অংশ হিসেবে।
এর ফলাফল নিজেই কথা বলে। সিঙ্গাপুর এমন অতিরিক্ত সংখ্যক স্নাতক তৈরি করে না, যাদের যোগ্যতার সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসংস্থানের সামান্যই সম্পর্ক থাকে। আবার কারিগরি দক্ষতাকে একাডেমিক অর্জনের চেয়ে নিকৃষ্টও মনে করা হয় না। একজন উচ্চদক্ষ কারিগর, নিখুঁত যন্ত্রচালক, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ বা গবেষণাগার প্রযুক্তিবিদ সমাজে পেশাগত সম্মান পান, কারণ সমাজ কেবল সনদ নয়, দক্ষতাকেই মূল্য দেয়।
বাংলাদেশ অবশ্যই সিঙ্গাপুর নয়। আমরা অনেক বড়, অনেক জনবহুল, আর আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও ভিন্ন। সিঙ্গাপুরের পুরো ব্যবস্থা হুবহু প্রতিস্থাপন করা অবাস্তব -- হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিতও। প্রতিটি দেশকেই নিজের ইতিহাস ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু সাফল্য থেকে শেখা মানে অনুকরণ নয়; তা প্রজ্ঞা।
বহু বছর আগে আমি এই পর্যবেক্ষণগুলোর কিছু এক সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলাম। তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল উপেক্ষাসূচক। "আপনারা বিদেশে বেশি সময় কাটান," তিনি বলেছিলেন, "এখানে আসলে কী হচ্ছে, তা আপনারা জানেন না। পত্রিকা পড়ে মতামত গড়ে তোলেন। অনেক কিছু ইতিমধ্যেই করা হয়ে গেছে।"
হয়তো সত্যিই অনেক কিছু করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি এই নয় যে কতগুলো নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে, কতগুলো কমিশন গঠিত হয়েছে, কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আসল প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতির প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিযোজনক্ষমতাসম্পন্ন স্নাতক তৈরি করছে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত।
বাংলাদেশ আজ এক জনতাত্ত্বিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় সম্পদ -- অথবা আমাদের সবচেয়ে বড় হতাশার উৎস। শিক্ষা যদি দক্ষতার চেয়ে সনদকে, সৃজনশীলতার চেয়ে মুখস্থবিদ্যাকে, আর সক্ষমতার চেয়ে সনদকে বেশি পুরস্কৃত করতে থাকে, তাহলে জাতীয় রূপান্তরের অন্যতম বড় সুযোগ আমরা হারাবো।
তাই সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই নয় যে সে বাংলাদেশের চেয়ে ধনী, ছোট বা বেশি সুশৃঙ্খল। তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে দার্শনিক। সে বোঝে যে শিক্ষার উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের সংখ্যা সর্বোচ্চ করা নয়।
শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সক্ষম নাগরিক, দক্ষ পেশাজীবী, উদ্ভাবনী চিন্তাবিদ এবং সমাজের উৎপাদনশীল সদস্য গড়ে তোলা। যতদিন না বাংলাদেশ এই নীতি গ্রহণ করে, ততদিন আমরা স্নাতকের ক্রমবর্ধমান হারকে উদযাপন করতেই থাকব, অথচ উপেক্ষা করে যাব সেই বাড়তে থাকা স্নাতকদের, যারা অর্থবহ কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছে না।
আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এই নয় যে আমরা আরেকটি সিঙ্গাপুর হতে পারব কি না। চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের কি সেই দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়সংকল্প আছে, যা দিয়ে আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে পারি -- এমনভাবে, যাতে তরুণ বাংলাদেশিরা কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং নিজেদের জীবন গড়া, শিল্পকে শক্তিশালী করা, অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা আর জাতীয় অগ্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত হতে পারে।
লেখক একজন পেশাদার কূটনীতিবিদ ছিলেন এবং তিনি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।