যখন যৌনতা হয়ে ওঠে ভিসা কৌশল

দালাল হয়তো একজনের কাছে সীমান্ত পেরোনোর পথ বিক্রি করে। কিন্তু নীরবে যা বিক্রি হয়ে যায়, তা একজন প্রকৃত শরণার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং একজন বৈধ শিক্ষার্থীর সুযোগ।

Oct 22, 2026 - 11:54
যখন যৌনতা হয়ে ওঠে ভিসা কৌশল
Photo Credit: Shutterstock

কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের এক নারী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে যুক্তরাজ্যের কোনো এক মহিলা নাগরিককে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে দেখিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসের বৈধতা এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পাসপোর্ট পেতে পারে কি না।

আমি জানতে চাইলাম, ঠিক কী ভাবছে সে। অদ্ভুত শান্ত গলায় সে বলল, তারা একসঙ্গে থাকবে, আর সবাই তাদেরকে সঙ্গী হিসেবেই জানবে। সম্পর্কটা থাকবে কাগজেকলমে আর প্রকাশ্য অভিনয়ে; গন্তব্য একটাই, অভিবাসনের মর্যাদা।

আমি দৃঢ়ভাবে তাকে বললাম, এ কাজ যেন সে না করে। এটা একটি কঠিন ব্যবস্থার ভেতরে কোনো চতুর পথ খুঁজে নেওয়া নয়; এটা একটি প্রতারণা। আমি তাকে বৈধ বিকল্প খুঁজে দেখতে বললাম। তখন কথোপকথনটাকে আমি একজন মানুষের ভয়নক চিন্তা হিসেবেই দেখেছিলাম।

কিন্তু বিলেতের সাম্প্রতিক খবর বলছে, বিষয়টা আরও বড়। বিশেষ কোনো পরিচয়ই এখন সংগঠিত অভিবাসন-বাজারের পণ্য হয়ে উঠেছে।

বিলেতি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, একটি চক্র যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে ভুয়া আশ্রয়ের আবেদন তৈরি করে দিতে অভিবাসীদের কাছ থেকে ১,০০০ থেকে ৪,৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নিয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী এই প্যাকেজে ছিল সাজানো ছবি, জাল নথি, সমলিঙ্গের সম্পর্কের বর্ণনা দিয়ে লেখা চিঠি এবং স্বদেশে নিপীড়নের বানানো প্রমাণ। লন্ডনে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর হোম অফিস (বিলেতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) সংশ্লিষ্ট একশর বেশি আবেদন পর্যালোচনা করছে।

গ্রেপ্তার মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়, আর কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র মানেই প্রাতিষ্ঠানিক দায় প্রমাণিত হওয়া নয়। এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি অভিবাসন-প্রতারণার চেয়েও বেশি কিছু। এটি এমন এক ব্যবসা, যেখানে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা ও নিপীড়নকে কেনা যায় এমন প্রমাণে পরিণত করা হয়েছে।

প্রেমও দেখা যাচ্ছে নানা প্রশাসনিক ধাঁচের পাওয়া গেছে। ছবি সাজানো গেছে, সম্পর্ক নথিভুক্ত করা গেছে, আর নিপীড়নের স্মৃতি জোগান দেওয়া হয়েছে প্রয়োজন মতো।

মানুষের কষ্ট যখন বাজারে ওঠে, দালাল তখন শুধু কাগজ বিক্রি করে না; সে বিক্রি করে বিশ্বাসযোগ্যতা।

এর সবচেয়ে কদর্য পরিহাসটা লুকিয়ে আছে এই পরিচয়ের যাত্রাপথে। বাংলাদেশে প্রকাশ্যে সমকামী মানুষকে পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে, ধর্মের নামে অপমান করা হতে পারে, কিংবা তাদেরকে অদৃশ্য হয়ে থাকতে বাধ্য করা হতে পারে।

অথচ বিলেতে সেই একই পরিচয় হয়ে উঠতে পারে অভিবাসন-কাগজ। দেশে সমকামিতাকে বলা হয় পশ্চিমা ষড়যন্ত্র। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার পর সেটাই হঠাৎ কৌশলগত মূল্য পেয়ে যায়।

একজন বেঁচে থাকার জন্য সত্য লুকায়। আরেকজন বিদেশে থেকে যাওয়ার জন্য মিথ্যা মুখস্থ করে। প্রথমজনকে দেখা হয় লজ্জার উৎস হিসেবে; দ্বিতীয়জন হয়তো প্রশংসাও পায়, কারণ সে জানে কীভাবে 'ব্যবস্থাটিকে টেক্কা' দিতে হয়। নৈতিক ভণ্ডামির এর চেয়ে দক্ষ আন্তর্জাতিক সরবরাহশৃঙ্খল গড়তে পারে, এমন সমাজ খুবই কম।

অনলাইনে বহুল প্রচারিত একটি বাংলা ছবিকার্ড পুরো ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল বানিয়ে ফেলেছে: পাকিস্তান প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়।

পদক, ফুলের তোড়া আর জাতীয় সংগীত বাজার অপেক্ষাই যেন বাকি। তাদের মাঝে রাজনৈতিক বিরোধ যাই থাকুক না কেন, বিলেতি প্রশাসনিক পরিসংখ্যানে দুই প্রতিবেশীর ভ্রাতৃত্ব দেখা যাচ্ছে চমৎকারভাবে অটুট।

কিন্তু এই ব্যঙ্গ যেন পরিসংখ্যান সচেতনতার স্থান না নেয়। ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়া হোম অফিসের বাৎসরিক তথ্য অনুযায়ী, ১,৩৭৭টি আশ্রয় আবেদনে যৌন অভিমুখিতা ছিল দাবির আংশিক বা সম্পূর্ণ ভিত্তি। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৫৭৮টি, বাংলাদেশিদের ১৭৫টি।

এই তথ্যভান্ডার থেকে বোঝা যায় না কতজন আবেদনকারী সমকামী, কতগুলো দাবি মিথ্যা, বা শেষ পর্যন্ত কতগুলো গৃহীত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, তাদের নথিতে হাতে বসানো সংকেতচিহ্ন আবেদনকারীদের দাবির ভিত্তিটি উল্লেখ করে, দাবিদারের প্রকৃত যৌন অভিমুখিতা উল্লেখ করে না।

ছবিকার্ডটি তাই একটি তথ্যভান্ডারকে পুরস্কারমঞ্চে পরিণত করেছে। 'পাকিস্তান প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়' মনোযোগ কাড়তে পারে, কিন্তু এটি কোনো প্রতারণার ক্রমতালিকা হওয়া উচিৎ নয়!

আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে থাকতে পারে প্রকৃত নিপীড়ন, অভিবাসনের পথ, প্রবাসী নেটওয়ার্ক, আইনি পরামর্শ, ব্যবস্থার অপব্যবহার, অথবা এর একাধিক কারণ একসঙ্গে। সংখ্যা কেবল প্রবণতা দেখায়; ব্যাখ্যার প্রয়োজন মিটিয়ে দেয় না।

সম্প্রতি আমি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কল্যাণ ও দারিদ্র্য পরিসংখ্যানে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি পরিবারের উচ্চ উপস্থিতি নিয়ে লিখেছি। সেখানেও একই পার্থক্য প্রযোজ্য ছিল।

যোগ্য হলে সরকারি সহায়তা নেওয়া বৈধ। আশ্রয় চাওয়াও বৈধ, যদি নিপীড়নের ভয় সত্যিকারের হয়। অপরাধ শুরু হয় তখনই, যখন আয় লুকানো হয়, প্রমাণ প্রস্তুত করা হয় বা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পরিচয় কিনে নেওয়া হয়।

আমাদের দালালি সংস্কৃতি, আইনকে অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনায় অনুবাদ করতে অসাধারণ দ্রুত। কোন ঘরে টিক দিতে হবে? কোন তথ্য লুকাতে হবে? কোন সংগঠন সবচেয়ে কাজে লাগার মতো চিঠি দিতে পারবে?

কোনো বিদেশি রাষ্ট্র নিয়ম লেখা শেষ করার আগেই গোত্রভিত্তিক কেউ না কেউ সেই নিয়মের ফাঁকফোকর নিয়ে ব্যক্তিগত অধ্যয়ন খুলে বসে।

বিলেতি সরকার একটি দরজা বন্ধ করে, আর দালাল জানালা খুঁজে বের করে। জানালা বন্ধ হলে কেউ ছাদের নকশা জোগাড় করে। রাষ্ট্র তখন নজরদারি কঠোর করলে আমরা ঘোষণা দেই "আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে"।

এটি কোনো জাতিগত বৈশিষ্ট্য নয়। কাঠামোগত দারিদ্র্য, কম মজুরির কাজ, ভাষার বাধা আর বৈষম্য, অভিবাসীদের বৈষম্যের যেকোনো গুরুতর বিশ্লেষণের কেন্দ্রেই থাকে।

কিন্তু কাঠামোগত ব্যাখ্যা নৈতিক দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না। রাষ্ট্রকে ফাঁকি দেওয়ার যেই সংস্কৃতি দৃশ্যমান, তার মুখোমুখিও হতে হবে।

আমাদের শব্দভান্ডারই এই এড়িয়ে যাওয়াকে সহজ করে তোলে। প্রতারণা হয়ে যায় 'সামলানো'। জাল কাগজ হয়ে যায় 'কাগজপত্র ঠিক করা'। বানানো আশ্রয় আবেদন হয়ে যায় 'থাকার একটা উপায় খোঁজা'। কাজের নাম বদলে দিলে বিবেকের ওপর চাপ কমে যায়।

আমাদের সমাজের কিছু অংশে 'সামলানো' বা 'ম্যানেজ' শব্দটি এমন সামাজিক মর্যাদা পেয়েছে, যা দেখে সততারও ঈর্ষা হওয়ার কথা।

এই চতুরতার মূল্য এখন দৃশ্যমান উচ্চশিক্ষায়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ সীমিত করছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগে দেওয়া ভর্তিপত্র প্রত্যাহার করছে।

জাতীয় পর্যায়ে সামগ্রিক কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবুও কিছু পাসপোর্ট ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি হিসেবে গণ্য হচ্ছে, পাসপোর্টধারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা যাচাইয়ের আগেই।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রত্যাহার-করা শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে ৪০.৯ শতাংশ, বাংলাদেশিদের ২৩.৫ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ানদের ২২.৭ শতাংশ।

এগুলো ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নয়, ভর্তি প্রত্যাহারের হার। হোম অফিস সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপত্র বা আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা তুলে নেওয়ায় অনেক ভিসার আবেদন সেখানেই শেষ হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এটি করার জোরালো কারণ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে চালু হওয়া বিধি অনুযায়ী, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানকে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে হবে এবং পৃষ্ঠপোষণ করা শিক্ষার্থীদের অন্তত ৯৫ শতাংশকে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যয়ন শেষ করানোর বর্তমান সীমা ৮৫ শতাংশ, যা ২০২৭ সালের জুন থেকে বেড়ে হবে ৯০ শতাংশ।

গুরুতর ব্যর্থতার মূল্য হতে পারে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির অধিকার হারানো। অথচ ভিসার সিদ্ধান্তের আগেই প্রত্যাহার করা পৃষ্ঠপোষকতা সনদকে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারে গণনা করা হয় না।

ভর্তি দপ্তর তাই ক্রমে ক্রমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের একটি উপসংস্থায় পরিণত হচ্ছে। আগে তাদের মনোযোগ ছিল নম্বর, ভাষাদক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্যে।

এখন তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে, আবেদনকারীর পাসপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন ইতিহাসের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কি না। আপনার গবেষণা প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ হয়তো তিনশ শব্দের; আপনার জাতীয়তা তার চেয়ে কম শব্দের কিন্তু বেশি চূড়ান্ত একটি নির্ণায়ক।

এখানেই একজন ব্যক্তির প্রতারণা সমষ্টিগত শাস্তির কারণ হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি মিথ্যা প্রমাণ কিনেছে, সে হয়তো ইতিমধ্যে থাকার অনুমতি পেয়ে গেছে; দালালও তার পারিশ্রমিক নিয়ে নিয়েছে।

আর বাংলাদেশে বসে স্বচ্ছ আর্থিক নথি ও বিশ্বাসযোগ্য গবেষণার পরিকল্পনা নিয়ে আবেদন করা প্রকৃত একজন শিক্ষার্থীকে এখন প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে অন্য কারও প্রতারণার ধারাবাহিকতা নয়।

এই পরিণতি ন্যায্য নয়। অভিবাসন নীতি ক্রমেই জাতীয়তাকে পূর্বাভাসমূলক ঝুঁকিতে রূপান্তর করছে, আর নিজেদের ছাড়পত্র বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

ভিসার সিদ্ধান্ত অসংগত এবং কখনো কখনো দুর্বল যুক্তিতে নেওয়া হয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরাও এই সমালোচনাটি করেছে।

যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরকে স্বাগত জানায় তাদের শিক্ষামাশুলের জন্য; বিপণন জগতে তাদেরকে উপাধি দেয় "বৈশ্বিক নাগরিক", আর তারপর তাদের পাসপোর্টকে দেখে সম্ভাব্য দায় হিসেবে। শিক্ষামাশুল কাম্য; যে মানুষটি তা দিচ্ছে, সে থেকে যায় সন্দেহভাজন।

তবুও বিলেতি নীতির সমালোচনা অভিবাসী সম্প্রদায়ের ভেতরের প্রতারণার অজুহাত হতে পারে না। শিক্ষার্থী ভিসা কখনো কখনো পরোক্ষ উপায়ে স্থায়ী বসবাসের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

কেউ কেউ কখনো ভর্তিই হয় না, অধ্যয়ন ছেড়ে দেয় কিংবা অনুমোদনহীন কাজে ঢুকে পড়ে। কেউ কেউ পরে আশ্রয়ের আবেদনও করে।

সরকারের জবাব কড়া এবং বৈষম্যমূলক হতে পারে, কিন্তু বারবার ঘটা অপব্যবহারই সেই জবাবের রাজনৈতিক যুক্তি জোগায়।

একটি ভুয়া আবেদন জনপরিসরের বিতর্কে খুব কমই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। দ্রুতই সেটি একটি দেশ, একটি পাসপোর্ট ও একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে ওঠে।

অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি এমন ঘটনার অপেক্ষাতেই থাকে, কারণ একটি সাজানো ছবিই হাজারটা প্রকৃত আবেদনের ওপর সন্দেহ ছড়াতে পারে।

সবচেয়ে গভীর ক্ষতি হয় প্রকৃত যৌন সংখ্যালঘু (এলজিবিটি) আশ্রয়প্রার্থীদের।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় পুরুষে-পুরুষে যৌনসম্পর্ক এখনো অপরাধ। ধারাটি খুব কমই প্রয়োগ হয়, কিন্তু হোম অফিসের নিজস্ব দেশ-মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশে এটি হয়রানি, গ্রেপ্তার ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

এলজিবিটি মানুষ পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক কলঙ্ক ও বহিষ্কারের মুখেও পড়ে, অথচ তাদের আইনি সুরক্ষা দুর্বল।

বাংলাদেশের একজন প্রকৃত সমকামী আবেদনকারীর হাতে হয়তো কোনো সম্পর্কের প্রকাশ্য ছবিই নেই, কারণ তেমন ছবি তোলা ছিল বিপজ্জনক।

যৌন সংখ্যালঘু সংগঠনের সদস্যপদ-কার্ডও হয়তো নেই, কারণ পরিচয় ফাঁস হলে বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

তার সামাজিক মাধ্যমেও হয়তো কিছুই দেখা যায় না, কারণ গোপনীয়তাই ছিল তার বেঁচে থাকার অংশ।

অন্যদিকে প্রতারক আবেদনকারী হয়তো আসে যত্নে সাজানো ছবি, পরিপাটি সম্পর্কের চিঠি আর মুখস্থ করা নিপীড়নের বিবরণ নিয়ে।

ভয়ে সত্য লুকানো মানুষটিকে তখন কম বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে, যেখানে পেশাদার সহায়তায় মিথ্যা অভিনয় করা মানুষটিকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

তাই প্রতারণা শুধু রাষ্ট্রকে ঠকায় না। এটি প্রকৃত নির্যাতিতদের বিশ্বাসযোগ্যতাও চুরি করে।

আশ্রয় প্রক্রিয়ার একটি দুর্বলতাও এতে ফাঁস হয়ে যায়: এই প্রক্রিয়া আশা করে যে যৌনতা একটি পরিচিত আখ্যান, নথির সূত্র এবং প্রকাশ্য প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়ে যাবে।

দালালরা একবার প্রত্যাশিত চিত্রনাট্যটি শিখে ফেললে সেটিও তারা বানিয়ে দিতে পারবে।

যথাযথ জবাবের জন্য শুধু আবেদনকারীদের শাস্তি দিলেই চলবে না। কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করতে হবে, কারা নথি বানিয়েছে, কারা অর্থ নিয়েছে, কোনো সংগঠন পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া চিঠি দিয়েছে কি না, এবং আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার কোন দুর্বলতাগুলো এই বাণিজ্যকে লাভজনক করেছে।

একই সঙ্গে ন্যায্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে, প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি যেন সংশ্লিষ্টতার দায়ে দোষী ঘোষিত না হয়।

তবে পুরো সম্প্রদায়ের ভেতর নিজেদের কুকর্মকে অস্বীকার করা কোনো সমাধান নয়। প্রতিটি বাংলাদেশি আবেদনকারীকে প্রতারক বলা যেমন সমাধান নয়, তেমনি প্রতিটি তদন্তকে বর্ণবাদী বলাও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ নয়। আত্মসমালোচনা মানে আত্মঘৃণা নয়।

সংগঠিত প্রতারণার বিরোধিতা অভিবাসনের বিরোধিতা নয়। যৌন সংখ্যালঘু শরণার্থীদের পক্ষে দাঁড়ানো মানে প্রতিটি দাবিকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়াও নয়।

একাধিক সত্য একসঙ্গে থাকতে পারে। বাংলাদেশে এলজিবিটি মানুষ প্রকৃত বিপদ ও বহিষ্কারের মুখে পড়ে। প্রতারকরা সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে পারে।

বিলেতি প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে সাড়া দিতে পারে, যা নিরপরাধ মানুষের ওপর অন্যায্য বোঝা চাপিয়ে দেয়। একটি গুরুতর বিশ্লেষণকে এই তিনটি সত্যকে একসঙ্গে ধারণ করতে হবে।

বৈপরীত্যটা কষ্টকর রকমের স্পষ্ট। দেশে আমরা যৌন সংখ্যালঘুদের মর্যাদা অস্বীকার করি, আর বিদেশে গিয়ে তাদের কষ্টের প্রশাসনিক মূল্যটি আবিষ্কার করি।

নৈতিকতা হয়তো সাথে নেওয়া কিছু মালপত্রের সাথে হারিয়ে যায়, কিন্তু দালালের ফোন নম্বর কেন যেন নিরাপদেই যাত্রীর সাথে আগমন করে।

'পাকিস্তান প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়' কোনো জাতীয় অর্জনের তালিকা নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা: ব্যাখ্যার জায়গায় ছবিকার্ড বসে গেলে, আর কয়েকজনের কৌশল সবার ওপর সন্দেহ হয়ে নেমে এলে কী ঘটে, এটি তারই সতর্কবার্তা।

দালাল হয়তো একজনের কাছে সীমান্ত পেরোনোর পথ বিক্রি করে। কিন্তু নীরবে যা বিক্রি হয়ে যায়, তা একজন প্রকৃত শরণার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং একজন বৈধ শিক্ষার্থীর সুযোগ।

ব্যবস্থাকে কত চতুরভাবে 'সামলানো' যায়, তা প্রমাণ করতে গিয়ে আমরা এমন এক ব্যবস্থা গড়তে সাহায্য করছি, যা আমাদের সবচেয়ে যোগ্য তরুণদেরকে তাদের নাম দেখার আগেই ঝুঁকি হিসেবে দেখবে।

ড. লুবনা ফেরদৌসী যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন শিক্ষাবিদ-গবেষক, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামাজিক ভাষ্যকার।