দায় যেখানে এসে থামে
সেটি দলের লোকজনের চাঁদাবাজি হোক, বা তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি হোক, বা তার মন্ত্রিসভার নীতিগত ত্রুটি হোক, কিংবা তার বাসভবনকে ঘিরে থাকা যানজটের দুর্ভোগের মতো আপাতদৃষ্টে সামান্য কিছুই হোক, দায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছেই এসে থামে।
শুধু অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা সংকটই নয়। সরকার পরিচালনা অবশ্যই বিএনপির জন্য একটি বিশাল প্রথম সারির চ্যালেঞ্জ; এই ক্ষেত্রে তারা সাফল্য দেখাতে না পারলে বাকি সবকিছুই অর্থহীন।
কিন্তু এর সমান কঠিন আরেকটি সমস্যা তারা মোকাবিলা করছে: জনসংযোগের লড়াইয়ে তারা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। তারা মিম যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, আর এই যুগে কাজের পারদর্শিতার মতোই সেই পারদর্শিতা সম্পর্কে মানুষের ধারণাও প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতির অধঃপতন থামিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা সক্ষম হলেও (আশা করা যায়, ক্রসফায়ারের আশ্রয় না নিয়েই), কাজ দুটি সহজ নয়। তবে জনসাধারণের চোখে তাদের ভাবমূর্তি কীভাবে গড়ে উঠছে, সেই প্রশ্নে তাদের হাতে সময় ফুরিয়ে আসছে।
বিশেষ করে তারেক রহমানকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটা এখন পরিহাসের বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে; তিনি যদি এই উদ্বেগের অর্থপূর্ণ সমাধান না করেন, তাহলে এটি তার জন্য ভীষণ ক্ষতিকর হতে পারে।
জরিপে দেখা যায় যে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এখনও জনপ্রিয়, এমনকি তার সরকার ও মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়।
তিনি সব ঠিক কথাই বলে চলেছেন এবং একজন ভদ্র, সৎ ও উদারপন্থী নেতার ভাবমূর্তি সফলভাবে গড়ে তুলেছেন।
কিন্তু ঠিক এই জনপ্রিয়তাকেই তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে; তার যত্নে গড়া ভাবমূর্তি এবং দলের লোকজনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাক তাকে নিয়ে এমন এক সমালোচনার রসদ হয়ে উঠেছে, যা মানুষের মনে গেঁথে যেতে শুরু করেছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যেই জনসংযোগ কৌশল চালু করেছে, সেটি হলো: "প্রধানমন্ত্রী একজন ভালো মানুষ, দলের লোকজনের অপকর্ম আর সরকারের ত্রুটির জন্য তিনি দায়ী নন।" এই কৌশল তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি যদি দায়ী না হন, তাহলে দায়ী কে? তিনি যদি দায়ী না হন, তাহলে তাকে দিয়ে লাভ কী?
অধস্তনদের দিকে আঙুল তোলা যথেষ্ট নয়; দায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর টেবিলেই এসে থামে, এবং এক পর্যায়ে তার নামে এবং তার অধীনে যারা কাজ করছে তাদের দ্বারা যা কিছু করা হচ্ছে, তার সবকিছুর দায় তাকে নিতে হবে।
সরকারের প্রতি অসন্তোষ ইতোমধ্যেই দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই অসন্তোষের দায় নিজের ঘাড়ে চাপাটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য যতটা খারাপ, তার চেয়েও খারাপ হবে যদি জনগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে কিছুই তার দোষ নয়, কারণ কিছুই তার হাতে নেই।
এই প্রসঙ্গে, গুলশানে বসবাসের বিচক্ষণতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুনর্বিবেচনা করার সময় হয়তো এসেছে।
আমরা জানি যে প্রধানমন্ত্রীর পুরোনো বাসভবনটি পাওয়া যাবে না, কিন্তু যেই সরকারি বাসভবনে প্রধান উপদেষ্টা থাকতেন, সেটির মতো কিছু সরকারি বাসভবন রয়েছে, যা একটি আবাসিক এলাকার ব্যক্তিগত বাড়ির চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য হয়তো বেশি উপযুক্ত।
তার বর্তমান বাসভবনের সমস্যা হলো, তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভয়াবহ যানজট তৈরি করেছে এবং পুরো এলাকার জনজীবনকে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।
ছোট ছোট বিষয়ই আসলে গুরুত্ব বহন করে।
নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করা এবং চলাচলের সময় যান চলাচল বিঘ্নিত না করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে বলা যথেষ্ট নয়, যখন একই সাথে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের আশপাশের সব রাস্তায় চলাচল সীমাবদ্ধ করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট তৈরি করা হয়।
মানুষ ঠিক এটাই মনে রাখে।
স্মরণ করা প্রয়োজন যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-১৭ আসনে তার অপ্রত্যাশিত জামায়াতে ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে মাত্র কয়েক হাজার ভোটের বিস্ময়কর রকমের কম ব্যবধানে জিতেছেন এবং এমন একটি নির্বাচনী এলাকায়, যেখানে জামায়াত কখনোই ভালো করেনি।
তারেক রহমান যদি তার আপন করে নেওয়া এই নির্বাচনী এলাকায় সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চান, তাহলে তার বাসভবন বেছে নেওয়ার কারণে সেখানকার ভোটারদের যেই ভোগান্তি হচ্ছে, তা পুনর্বিবেচনা করাই তার জন্য ভালো।
সম্ভবত তিনি জানেনই না যে তার বাসভবনের জন্য যেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার কারণে তার প্রতিবেশীদেরকে কী লাঞ্ছনা সহ্য করতে হচ্ছে।
কিন্তু তার নামে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, নেওয়া অন্য সব পদক্ষেপের মতোই এটিই আসল কথা: তিনি নিজে সম্পূর্ণ নির্দোষ হতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে তাকেই।
সেটি দলের লোকজনের চাঁদাবাজি হোক, বা তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি হোক, বা তার মন্ত্রিসভার নীতিগত ত্রুটি হোক, কিংবা তার বাসভবনকে ঘিরে থাকা যানজটের দুর্ভোগের মতো আপাতদৃষ্টে সামান্য কিছুই হোক, দায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছেই এসে থামে।
জবাবদিহি তাকেই করতে হবে, এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা কাজ করবে না।
জাফর সোবহান সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্টের সম্পাদক।