বাংলাদেশের চারটি শিক্ষাধারা এক করতে হবে কেন
এই শ্রেণি একদিকে তাদের সন্তানদেরকে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠাচ্ছে, আবার একইসঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে -- সম্ভবত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে বাংলাদেশের চার ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের উপর খুব ছোটবেলা থেকেই কোন ধরণের প্রভাব ফেলছে? শুধু ব্যক্তি নয় -- এর প্রভাব পড়ছে আমাদের বাংলা ভাষা, আমাদের জাতীয় পরিচয়, এবং আমাদের সামাজিক সংহতির ওপরও।
প্রথমেই চারটি ধারার কথা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক -- বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যম, এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। এখানে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত -- অর্থাৎ উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত।
বাংলা মাধ্যম হচ্ছে দেশের প্রধান ও বৃহত্তম ধারা যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। ইংরেজি ভার্সন হচ্ছে একই পাঠ্যক্রমের ইংরেজি অনুবাদ। এটিও সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই চালু।
অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম, যা হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবসা, বাংলাদেশের জাতীয় বোর্ড কাঠামোর বাইরে থেকে বিলেতি আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, মূলত কেমব্রিজ আন্তর্জাতিক শিক্ষা (সিআইই) বা পিয়ারসন এডেক্সেল -এর অধীনে।
মাদ্রাসা শিক্ষা আবার দুই ভাগে বিভক্ত -- আলিয়া এবং কওমি। আলিয়া মাদ্রাসাগুলো অধিকাংশই বেসরকারি হলেও সেগুলো সরকার-সমর্থিত -- যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ধর্মীয় বিষয়বস্তুবিহীন বিষয়গুলোও পড়ানো হয়। এখানে সাধারণ বিষয়গুলো এনসিটিবি অনুযায়ী পড়ানো হয়, আর ধর্মীয় বিষয়গুলো পড়ানো হয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বিএমইবি) অনুযায়ী। শিক্ষার ভাষা প্রধানত বাংলা।
কওমি মাদ্রাসা হচ্ছে সম্পূর্ণ বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান -- অনেক ক্ষেত্রেই আবাসিক। এখানে মূলত ইসলামী আইনশাস্ত্র, আরবি, কোরআন মুখস্থকরণ এবং ধর্মতত্ত্ব শেখানো হয়। এগুলো নিজস্ব বোর্ড যেমন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে চলে এবং দারসে নিজামি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। শিক্ষার ভাষা কাগজে-কলমে বাংলা হলেও বাস্তবে সেখানকার ভাষাগত পরিবেশ আরবি ও উর্দুকেন্দ্রিক।
এবার মূল কথায় আসা যাক।
এই জটিল, অসংগত এবং বিভাজনমূলক শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন কাঠামোয় রূপান্তর করাটা জরুরি, যেখানে সবার জন্য একই পাঠ্যক্রম, একই শিক্ষার ভাষা, এবং একই ভিত্তি থাকবে।
আগেই বলেছি যে এখানে আমার আলোচনার সীমা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। এই বিষয়টি বাংলাদেশে আগে আলোচিত হয়েছে -- কিন্তু কখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। তাই সামাজিক ও জাতীয় বাস্তবতার কিছু দিক সামনে এনে আবার আলোচনাটি শুরু করা প্রয়োজন।
তার আগে আমার প্রস্তাবগুলো পরিষ্কার করে বলি।
আগামী কয়েক বছর এবং দশকজুড়ে বাংলা মাধ্যমের ওপর ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে -- এমনভাবে, যাতে দেশের অন্যান্য শিক্ষা ধারাগুলো ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
ব্যতিক্রম হিসেবে ঢাকা ও বড় বড় শহরগুলোতে বিদেশি কূটনীতিবিদ, বিদেশি ব্যবসায়ী, এবং পশ্চিমা দেশ থেকে ফিরে আসা প্রবাসী বাংলাদেশি সন্তানদের জন্য সীমিত সংখ্যক আন্তর্জাতিক স্কুল থাকতে পারে। এগুলো প্রায় প্রতিটি দেশে অবস্থিত "আন্তর্জাতিক স্কুল" নামক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেই থাকবে।
কিন্তু লক্ষ্য থাকতে হবে স্পষ্ট -- বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি নতুন, আধুনিক বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে।
“কিন্ডারগার্টেন, প্রি-প্রাইমারি ইত্যাদি আজগুবি শিক্ষা-স্তরগুলো তুলে দিতে হবে। প্রত্যেক শিশুর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ১ম থেকে ১২শ শ্রেণি পর্যন্ত ধারাবাহিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে -- সম্ভব হলে একই প্রতিষ্ঠানে। পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী শিশুদেরকে তাদের নিজস্ব ভাষা সঠিকভাবে শেখাতে হবে -- পাশাপাশি এনসিটিবির বিষয়বস্তু বাংলা ভাষায় পড়াতে হবে।
এই বারো বছরের শিক্ষাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এখানে রাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব থাকা প্রয়োজন।
আমার ভেতরের আংশিক সমাজতান্ত্রিক মানসিকতা বলে -- সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে দিয়ে রাষ্ট্র যেন এই বারো বছরের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করে। এটি বাস্তবসম্মত কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন; এবং সেটি এখানকার আলোচনার বিষয় নয়।
এখানকার মূল বিষয় -- প্রথম বারো বছরে সবাই একই জিনিস একইভাবে শিখবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে।
এই সময়ের মধ্যে কোনো গ্রুপভিত্তিক বিষয় নির্বাচন বা বিশেষায়ন থাকা উচিৎ নয়।
এই নতুন ভুবনে ইংরেজি শেখানো কি বাদ পড়বে? একেবারেই নয়! বরং এই নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে প্রমাণ করা যে বাংলাদেশে ইংরেজি শেখানোর জন্য ইংরেজি মাধ্যম নামক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেগুলোর প্রয়োজন নেই।
বাংলা মাধ্যমেই আধুনিক পদ্ধতিতে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখানো সম্ভব; ধরা যাক তৃতীয় শ্রেণি থেকে তা শুরু করা যেতে পারে (একটি প্রস্তাবনা মাত্র)। এরপর ধাপে ধাপে এমনভাবে তা শেখানো হবে, যাতে দ্বাদশ শ্রেণির শেষে প্রতিটি শিক্ষার্থী ইংরেজিতে উচ্চমানের মৌখিক ও লিখিতভাবে নিজের ভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়।
এই দক্ষতা তাদেরকে বৈশ্বিক জগতের সঙ্গে যুক্ত করবে -- সাইবার জগৎ, স্মার্ট যন্ত্র, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম এবং দেশে বা বিদেশে ঐচ্ছিক উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে।
ইংরেজি শেখানোর পুরোনো পদ্ধতি -- যেখানে ব্যাকরণের ওপর অতিরিক্ত আসক্তি এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর নির্ভর করা হয় -- তা চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে।
বাংলাদেশে ইংরেজি শেখার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এর লক্ষ্য হওয়া উচিৎ প্রয়োজনে প্রত্যেক মানুষ যেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে এবং এইচএসসি সম্পন্ন করার পর, প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজি ভাষায় আরও জ্ঞান অর্জন, বিশেষজ্ঞতা, সনদ ও ডিগ্রি অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে।
অতএব, ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রে যোগাযোগমূলক ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে হবে -- পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি অথবা ব্যবসা -- এই ক্ষেত্রগুলোতে ইংরেজি-ভিত্তিক বিশেষায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তিও তৈরি করতে হবে। ইংরেজি সাহিত্য প্রাথমিক পরিচয়ের বাইরে পড়ানোর প্রয়োজন নেই। চার্লস ডিকেন্স বা শেক্সপিয়ার বাংলাদেশে আমাদের জন্য কি সত্যিই জরুরি? না।
এই চিত্রে ধর্মীয় শিক্ষার এই অবস্থান কোথায়? আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলব যে দুই ধরনের মাদ্রাসা ব্যবস্থার মধ্যে কওমি মাদ্রাসাই সবচেয়ে অকার্যকর এবং ক্ষতিকর। তথাকথিত শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে পড়া একজন শিক্ষার্থীকেও আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করে না।
এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা যে দরিদ্র অভিভাবক এবং এতিমদের অভিভাবকরা অনেক সময়ে বাধ্য হয়ে শিশুদেরকে এসব জায়গায় পাঠান -- যেখানে সেই শিশুদেরকে বছরের পর বছর অপচয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক এবং/অথবা যৌন নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পূর্ববর্তী সরকারগুলো কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাতে তারা সফল হয়নি। কারণ ছিল হেফাজতে ইসলাম নামের ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব, যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আদর্শিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বে। বাংলাদেশকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এই সব প্রতিষ্ঠানে পড়া বা আবাসিকভাবে পড়াশোনা করা শিশুদেরকে মূলধারার বাংলা শিক্ষার দিকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করতে হবে।
অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো বিবেচনার দাবি রাখে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি বাংলা মাধ্যমের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকায়ন করা যায় -- প্রয়োজনে ধর্মীয় পাঠ্যক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে বা প্রয়োজন মতো হালনাগাদ করে -- তাহলে এগুলো মূলধারার শিক্ষার একটি সহায়ক ধারা হিসেবে টিকে থাকতে পারে। আমি এগুলোর বিলুপ্তির পক্ষে প্রচারণা করব না। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা, ইংরেজি ভার্সন এবং সকল ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের বিরোধিতা করব -- এবং যথেষ্ট কারণ সহ।
কিন্তু সেটা করার আগে আমি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষার লক্ষ্যগুলো আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতে চাই। এই বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে নতুন সরকারের তত্ত্বাবধানে ব্যাপক আলোচনা চলছে, এবং আমিও সেই আলোচনায় যুক্ত হতে চাই। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে বাংলা স্কুলগুলোতে ইংরেজিকে একটি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পড়ানো হবে এবং তার উদ্দেশ্যও ব্যাখ্যা করেছি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো -- ধর্মীয় শিক্ষা মূলধারার বাংলা মাধ্যমে না এনে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। মূলধারার শিক্ষা হতে হবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় বিষয়বিহীন, এবং এর লক্ষ্য হতে হবে ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। অমুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে এটির প্রয়োজন এবং সবার জন্য একটি সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্র গড়ে তুলতে এর বিকল্প নেই।
আগেই আমি কিছু সামাজিক ও জাতীয় বিষয় উল্লেখ করেছিলাম যেগুলো পরে আবার আলোচনায় আনব বলেছিলাম। এখন আমি সেগুলোকে একত্র করে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার আরো কিছু উদ্দেশ্য এবং কেন আমি কওমি মাদ্রাসা, ইংরেজি ভার্সন এবং সকল ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো বিলুপ্ত দেখতে চাই -- সেটি ব্যাখ্যা করছি।
প্রথমত, নতুন বাংলা পাঠ্যক্রমের তিনটি প্রধান লক্ষ্য থাকতে হবে:
১) স্বাধীনতার ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য, কবিতা, সংগীত, নৃত্য এবং কুটিরশিল্পের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে বাংলাদেশি ও বাঙালি (বা আদিবাসী) পরিচয়বোধ তৈরি করা।
২) সামাজিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, জীবনধারা বিষয়ক জ্ঞান এবং খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ, উৎপাদনশীল এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।
৩) দ্বাদশ শ্রেণির পরবর্তী জীবনের জন্য মৌলিক গণিত, বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি তৈরি করা।
শিক্ষণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে আমি দৃঢ়ভাবে ফিনল্যান্ডের মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে সেটিকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করি। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার কোনো স্থান থাকবে না -- শুধু বর্ণমালা, সংখ্যা এবং গুণন সারণি শেখা ছাড়া। বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান, গবেষণা এবং সৃজনশীল প্রকল্প হবে শিক্ষার মূল ভিত্তি।
দ্বাদশ শ্রেণি শেষ হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে সে নিখুঁত বাংলা এবং ইংরেজি -- উভয় ভাষায় মৌখিক ও লিখিতভাবে সাবলীল হবে, এবং যেকোনো পরিবেশে নিজেকে উপস্থাপন বা নিজের পক্ষে অবস্থান নিতে সক্ষম হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে উঠতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে কি এই বাস্তবতা বিদ্যমান? উত্তর এক কথায় -- না। এটি বোঝার একটি সহজ উপায় হলো শিক্ষার্থীদের কথা শোনা এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের লেখার ধরন পর্যবেক্ষণ করা। প্রথমে আমরা তাদের বাংলা ভাষার ব্যবহারটা দেখি।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয় -- কিছু শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং "ইনফ্লুয়েন্সার" নামক ব্যক্তিরাও অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ না ঢুকিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা বাক্য গঠন করতে পারে না -- যেখানে সেই ইংরেজি শব্দগুলোর সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য বাংলা শব্দ বিদ্যমান। আগে এই প্রবণতা শুধু কথ্য ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন তা ক্রমশ লিখিত ভাষাতেও ছড়াচ্ছে।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায় যে এই মানুষদের অনেকেই প্রকৃতপক্ষে সেই বাংলা শব্দগুলোই জানে না -- কারণ দীর্ঘদিন ইংরেজি শব্দ ঢোকানোর অভ্যাস আমাদের সম্মিলিত ভাষা-চেতনা থেকে সেই বাংলা শব্দগুলোকে আড়াল করে দিয়েছে।
কেউ কেউ এটিকে ভাষার প্রবহমানতা এবং জীবন্ত স্বভাব বলে আখ্যা দিতে পারে। আমি এটিকে দেখি বাংলা ভাষার প্রতি এক ধরনের হীনমন্যতা হিসেবে -- এর শব্দ, এর সমৃদ্ধি, এর সৌন্দর্য এবং ইতিহাসের প্রতি।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজিভাষী এক ‘বাবু’ শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, যেটি বিলেতি শাসকগণ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে মধ্যবর্তী ভূমিকা পালন করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাবুরা নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় এক উচ্চতর শ্রেণি হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে ইংরেজি ব্যবহারই উচ্চতর সামাজিক অবস্থানের পরিচায়ক।
স্বাধীন বাংলাদেশে যারা সামর্থ্যবান, তারা তাদের সন্তানদেরকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠায় এই বিশ্বাসে যে সেটিই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। এটি অবশ্যই মূলধারার বাংলা শিক্ষার ব্যর্থতার ফল, তবে এর প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবা জরুরি।
আমি কোনো সাধারণীকরণ করছি না যখন বলি যে এই অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে এমন এক মানুষ তৈরির কারখানা, যেখানে শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয় নিজেদের দেশ, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও সংগীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে, এবং এ-লেভেল সম্পন্ন করার সাথে সাথেই পশ্চিমে পাড়ি জমানোর মানসিকতা দিয়ে।
তাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং নিজেদের দেশ সম্পর্কে মতামত শুনলে আমার ভেতরে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। তাদের বাংলা শুনলে গায়ে কেরোসিন ঢালতে ইচ্ছে করে। আর যেহেতু বাংলাদেশে (বা যেকোনো সমাজেই) মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিই সামাজিক প্রবণতা নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে, তাদের বাংলা ভাষার এই বিকৃত ব্যবহার -- যা মূলত অর্ধেক ইংরেজি দিয়ে ভরা -- তা ধীরে ধীরে সমাজের বাকি স্তরগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন আমরা তাদের ইংরেজি ভাষার ব্যবহার নিয়েও কথা বলতে পারি। অনেকে মনে করে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে নিশ্চয়ই অত্যন্ত দক্ষ হবে -- কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। তাদের মাঝে আমি ইংরেজি ভাষার অনেক ভুল ব্যবহার এবং অস্বাভাবিক উচ্চারণ দেখেছি।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা বাস্তবে বাংলা ও ইংরেজি -- দুই ভাষাতেই যথাযথ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না, এবং বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর অবস্থাও এর থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। এই হচ্ছে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ফল।
আর আমাদের দেশে এনসিটিবির ইংরেজি ভার্সনের প্রয়োজনই বা কী? এটি আমাদের বাংলা ভাষার অবস্থান সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয় -- যে ভাষার জন্য আমরা লড়েছি, প্রাণ দিয়েছি, এবং যার সংগ্রামই বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তি রচনা করেছিল?
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা? তাদের অনেকেরই বাংলা কথা শুনে আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারি না। আরবি ও উর্দুকেন্দ্রিক ভাষাগত পরিবেশে গড়ে ওঠার কারণে তারা যে বাংলা শিখে বা ব্যবহার করে, তা অনেক সময় অসম্পূর্ণ ও দুর্বোধ্য হয়ে থাকে -- তাতে কোনো বাঙালি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও প্রতিফলিত হয় না।
আদতে, মাদ্রাসাগুলোতে তাদেরকে যেই পরোক্ষ বার্তাটি বারবার দেওয়া হয়, তা হলো -- বাঙালি সংস্কৃতি মূলত একটি হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি এবং যতটা সম্ভব তা থেকে দূরে থাকা উচিত। এদের একটি অংশ আবার পুরো বিষয়টির মধ্যে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যও খুঁজে পায়।
“বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানদের পরিচয়-সংকট” শীর্ষক প্রবন্ধে, যা এই সংবাদপত্রে ১ জুন প্রকাশিত হয়েছিল, লেখক ড. সেলিম রায়হান ব্যাখ্যা করেছেন যে যখন তরুণদেরকে প্রধানত এমন একটি কাঠামোর মধ্যে শিক্ষা দেওয়া হয় যেখানে বাঙালি সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বহুত্ববাদী ঐতিহ্য, গভীর অনুসন্ধানমূলক ইতিহাস চর্চা, অথবা মুক্তিযুদ্ধের নাগরিক তাৎপর্যের জন্য সীমিত পরিসর রাখা হয়, তখন তাদের আত্মপরিচয়ের বোধ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
হ্যাঁ, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং কিছু ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আমি ঠিক এই সমস্যাটিই দেখতে পাই।
আমি বিশেষভাবে লেখকের একটি মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন -- যেখানে একটি নতুন উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা বলা হয়েছে -- যেই শ্রেণির লোকেরা রেমিট্যান্স, বিদেশে শ্রম, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, নির্মাণ, পরিবহন এবং অভিবাসন-সম্পর্কিত সেবা খাত থেকে অর্জিত সম্পদের মাধ্যমে সামাজিকভাবে এগিয়ে চলছে।
এই শ্রেণি একদিকে তাদের সন্তানদেরকে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠাচ্ছে, আবার একইসঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে -- সম্ভবত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে।
তাহলে এই তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার ফলে বাংলাদেশে কী ঘটছে? আমরা বিভিন্ন শিক্ষা ধারার মধ্যে শিক্ষার্থীদেরকে ঠেলে দিয়ে সেগুলোর ভিত্তিতে দেশকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে ফেলছি -- এবং আমরা এই বিভাজনটি তৈরি করছি একেবারে সকলের শৈশব থেকেই।
এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের নিজস্ব অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্ন বলয়, জীবনধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় চর্চা এবং পারস্পরিক অবজ্ঞার ভেতরেই আলাদা হয়ে থাকে, যতক্ষণ না তারা কেউ কেউ পরস্পরের সংস্পর্শে আসে -- হোক তা মসজিদে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে, কর্মক্ষেত্রে, অথবা বিদেশে। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরবর্তী প্রজন্মেও পুনরাবৃত্তি হয়। এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট।
সমাজের সব মানুষের মধ্যে সমতার দাবি তোলার সেই সমাজতন্ত্রীরা কোথায়? এ কি সেই বাংলাদেশ, যার স্বপ্ন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দেখেছিলেন -- যেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি অন্যায্য শ্রেণিবিন্যাসকে আরও শক্তিশালী করে, যেখানে প্রকৃত ক্ষমতা ও প্রদত্ত স্বায়ত্তশক্তি কেবলমাত্র সেই কৃত্রিম সিঁড়ির শীর্ষে থাকা গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাকী জনগোষ্ঠীকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের অপ্রয়োজনীয় উচ্ছিষ্ট হিসেবে পরিণত করা হয়?
একটি অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু জাতীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনই নয় -- এটি অর্থনৈতিক সমতারও ভিত্তি বটে।
রিয়াজ ওসমানী একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক।
What's Your Reaction?