প্রবাসী শ্রমিকদের প্রাপ্য সম্মান
নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের এই বিয়োগান্ত ঘটনাটি আমাদের প্রবাসী শ্রমশক্তির প্রতি নীতিতে পরিবর্তনের প্রেরণা হোক। তাদের অধিকার ও কল্যাণকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখার সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।
সৌদি আরবে এক তরুণ বাংলাদেশি দম্পতির সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ন্যায়বিচারের এক নির্মম প্রহসন। এটি সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশটির অন্তরে লুকিয়ে থাকা ক্যানসারটিকে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
কিন্তু সৌদি আরবের অন্যায়-অবিচার নিয়ে আক্ষেপ করে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমাদেরকে ভাবতে হবে সেইসব বিষয় নিয়ে, যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি; যা পারি না, তা নিয়ে নয়।
সৌদি আরব নৈতিক দিক থেকে এবং সভ্যতাগত একটি পশ্চাৎপদ দেশ, যেখানে বিচার স্বচ্ছ নয়, সুষ্ঠু নয়, সমান নয়। আমরা এটি বদলাতে পারব না, আর দেশটি এমনই থেকে যাবে। বাস্তবতা এটাই।
আমরা যা করতে পারি এবং যা আমাদের করা উচিৎ, অথচ লজ্জাজনকভাবে করতে ব্যর্থ হয়েছি, তা হলো সেখানে কর্মরত লাখো বাংলাদেশিদেরকে সুরক্ষা দেওয়া।
এটি শুধু সৌদি আরবের বাংলাদেশিদের জন্য নয়; বিশ্বজুড়ে যেই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা বিপজ্জনক ও কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করছে, তাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য।
এই নারী-পুরুষরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা প্রতি বছর বাংলাদেশে যেই কোটি কোটি ডলার পাঠায়, সেটা না থাকলে অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ত।
প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, আমাদের কল্যাণে এই মানুষগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সকল সরকার নিয়মিতই এদেরকে "রেমিট্যান্স যোদ্ধা" বলে বাহবা দেয়, কিন্তু তাদের জন্য বাস্তবে কী করে? প্রায় কিছুই না।
অর্থনীতিতে এই মানুষগুলোর গুরুত্ব যে কতখানি, সেটি প্রতিফলিত হওয়ার উপযুক্ত নীতি খুব কমই রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে তার প্রকৃত রূপে স্বীকৃতি দেওয়া উচিৎ: এটি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, যা আসলে বাণিজ্য বা শিল্প মন্ত্রণালয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের উচিৎ প্রবাসী শ্রমশক্তির পেছনে সম্পদ ঢালা এবং এটিকে প্রসারিত, উন্নত ও কার্যকর করতে যথাসাধ্য সবকিছু করা।
এর অর্থ শুধু প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বাড়ানো নয়; এর অর্থ শ্রমশক্তিকে সুরক্ষা দেওয়াও, যাতে তারা শোষণের ঝুঁকিতে না থাকে।
ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো তাদের অভিবাসী শ্রমিকদেরকে অনেক ভালোভাবে সুরক্ষা দেয়। আমরা তাদের কাছ থেকে শিখতে পারি।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি এর একটি উপযুক্ত দৃষ্টান্ত; আর যত বেশি জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ কনসুলেটের কর্তব্যে অবহেলা ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এটা পরিষ্কার যে, সৌদি আরবে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদেরকে আইনি সহায়তা, এমনকি অনুবাদ সেবা দেওয়ার মতো কোনো নীতিই আমাদের নেই।
বস্তুত এটাও প্রকাশ পেয়েছে যে, সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার কোনো প্রটোকল তো আমাদের নেই-ই, উপরন্তু দূতাবাস ও কনসুলেটগুলো এটিকে নিজেদের দায়িত্ব বলেই মনে করে না।
এটি বদলাতেই হবে। যদি মানবিক যুক্তি, অর্থাৎ এরা বাংলাদেশি নাগরিক, যারা সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য, সরকারকে নাড়া না দেয়, তাহলে হয়তো ব্যবহারিক যুক্তি তা দেবে; আমরা আমাদের শ্রমিকদের যত ভালো যত্ন নেব, তারা তত বেশি অর্থ দেশে পাঠাতে পারবে।
এটি সবচেয়ে সহজলভ্য একটি অর্জন। সরকার সঠিক কাজটি করেই এর পুরস্কার পেতে পারে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ব্যয় করা প্রতিটি পয়সা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দশগুণ হয়ে ফিরে আসবে।
দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে একটি মনোভাব রয়েছে যে, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বেশি হৈচৈ করলে তা উল্টো ফল দেবে এবং দরজা বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমাদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
কিন্তু এই ভয় ভিত্তিহীন এবং এটি পৃথিবী কীভাবে চলে, সেই বিষয়টিকেই মূলত ভুল বোঝে। নিজের নাগরিকদের পক্ষে দাঁড়ালে সম্মান পাওয়া যায়। এতে দরজা বন্ধ হয় না, বরং খুলে যায়।
জাতীয় গর্ব ও মর্যাদার যদি কোনো অর্থ থাকে, তাহলে এর মানে হলো সেই ভীরু অবস্থান ও বিশ্বাস ত্যাগ করা যে, আমরা একটি করুণাপ্রার্থী জাতি এবং অন্য দেশ যাই দেবে, বিনা প্রতিবাদে তাই মেনে নিতে হবে।
বাণিজ্য চুক্তি হোক, প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার হোক, কিংবা পোশাক ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের শর্ত হোক, অপর পক্ষের সামনে নিজেদেরকে লুটিয়ে দিয়ে তলানিতে নেমে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামলে আমরা সেখানেই আটকে থাকব। এটি টেকসই কৌশল নয়।
টেকসই কৌশল হলো নিজের ও নিজেদের মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ন্যূনতম সম্মান দাবি করা।
আমরা যদি নিজের ও নিজেদের মানুষের প্রতি সম্মান না দেখাই, তাহলে বাকি বিশ্বের কাছে সম্মান আশা করব কীভাবে?
নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের এই বিয়োগান্ত ঘটনাটি আমাদের প্রবাসী শ্রমশক্তির প্রতি নীতিতে পরিবর্তনের প্রেরণা হোক।
তাদের অধিকার ও কল্যাণকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখার সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।
জাফর সোবহান, সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্টের সম্পাদক।