কাকে বিশ্বাস করব: আবদুর রাজ্জাক, নাকি মিয়া গোলাম পরওয়ারকে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের এটি একটি পরিচিত ব্যাধি: নিজের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিপক্ষের দিকে আঙুল তোলা। আওয়ামী লীগ আঙুল তোলে বিএনপির দিকে। বিএনপি তোলে আওয়ামী লীগের দিকে।

Oct 11, 2026 - 12:24
কাকে বিশ্বাস করব: আবদুর রাজ্জাক, নাকি মিয়া গোলাম পরওয়ারকে?
Photo Credit: Open Source

মিয়া গোলাম পরওয়ারের যুক্তি ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার চেয়েও বেশি কিছু করে। এটি দায়ের উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা -- তিনটিই অন্যত্র সরিয়ে ফেলে।

ধরুন, মধ্যরাতে সশস্ত্র লোকজন একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তারা পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলল, কয়েকজনকে তুলে নিয়ে গেল, বাকিরা পালিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিল। প্রতিবেশী তাদের আশ্রয় দিল, পরে অস্ত্রও জোগাল, আর শেষে নিজেও লড়াইয়ে নামল।

পঞ্চাশ বছর পর কেউ একজন সেই রাতের ইতিহাস লিখতে বসে ঘোষণা করল, আসল কাহিনি হলো “প্রতিবেশীর আগ্রাসন”।

আপনি সম্ভবত বলবেন: অবশ্যই, প্রতিবেশী পরে কী করেছিল তা খতিয়ে দেখা হোক। তার স্বার্থ কী ছিল, সে কী সুবিধা চেয়েছিল, তার আচরণ পুরোপুরি নিঃস্বার্থ ছিল কি না -- সবই প্রশ্ন করা যাক। কিন্তু তার আগে একটা ছোট্ট প্রশ্ন: সেই প্রথম রাতে বাড়িতে ঢুকেছিল কে?

জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্য পড়ে আমার এই কথাটাই মনে এসেছে। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতের নেতারা “ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে” অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল; জামায়াত কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেনি; আর রাজাকারের হিসাব করতে বসলে বিএনপি জামায়াতের উপরে অবস্থান নেবে।

এই দাবিগুলো একসঙ্গে জুড়লে একটি চমৎকার রাজনৈতিক কৌশল বেরিয়ে আসে।

প্রথমত, দায়ের উৎস পাকিস্তান থেকে সরে ভারতে চলে যায়। দ্বিতীয়ত, দায়ের প্রকৃতি বদলে যায়: ১৯৭১ সালে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা ও সহযোগী কাঠামোগুলো কী করেছিল, সে প্রশ্নের বদলে আমাদের বলা হয়, “জামায়াত” নামের একটি বিমূর্ত সত্তা নিজে কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেছে কি না তা ভাবতে। সবশেষে দায়ের মালিকানা জামায়াত থেকে সরে বিএনপির ঘাড়ে চাপে।

পরওয়ারের ঐতিহাসিক মঞ্চে ভারত আছে, বিএনপি আছে, “জনগণ” আছে। আর পাকিস্তান, আশ্চর্যজনকভাবে, ধীরে ধীরে ছায়ায় সরে গেছে।

তাই “ভারতীয় আগ্রাসন” কথাটি শুধু রঙচঙে ভারতবিরোধী বুলি নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক কৌশল যা কারণ ও ফলাফলকে নতুন করে সাজায়। মুক্তিযুদ্ধকে যদি মূলত ভারত ও অখণ্ড পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সংকটের প্রধান কুশীলব হিসেবে পাকিস্তানি রাষ্ট্র আর থাকে না।

১৯৭০ সালের নির্বাচন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান, বাঙালির প্রতিরোধ এবং শরণার্থী বিপর্যয় -- সবই তখন একটি বৃহত্তর ভারত–পাকিস্তান কাহিনির ভেতরের পর্ব হয়ে যায়।

এই যুক্তির জন্য কালক্রম অস্বস্তিকর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হয় মার্চে। ভারত–পাকিস্তানের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ হয় ডিসেম্বরে।

সমকালীন মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চালানো সহিংসতার বর্ণনা আছে, যা ভারতের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রচলিত যুদ্ধের কয়েক মাস আগের ঘটনা।

ভারতের যে কৌশলগত স্বার্থ ছিল, তা নিশ্চিত। ভারত বাঙালি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছে, শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা প্রায় এক কোটি মানুষের বিপুল চাপ সামলেছে, এবং শেষ পর্যন্ত সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। পাকিস্তানের পরাজয় ভারতের কৌশলগত স্বার্থেও কাজে লেগেছে।

এসবের কোনোটিই লুকানোর দরকার নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্র দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালায় না, ভারতও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

কিন্তু ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ছিল বলেই যুক্তির নিয়মে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে ১৯৭১ সালের কেন্দ্রীয় ঘটনা ছিল ভারতীয় আগ্রাসন। আবার ডিসেম্বরের ভারতীয় হস্তক্ষেপকে পরে টেনে এনে মার্চে শুরু হওয়া পাকিস্তানি সামরিক অভিযানকে আড়াল করাও চলে না।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, এই কাঠামো বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব ভূমিকাকে খাটো করে তোলে। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ভোটাররা অত্যন্ত স্পষ্ট গণতান্ত্রিক রায় দিয়েছিল।

ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকট এসেছে সেই রায়ের পরে। তারপর এসেছে সামরিক নিপীড়ন ও প্রতিরোধ। বাঙালিরা কোনো ভারতীয় প্রকল্পের দর্শক ছিল না; তারা নিজেদের ইতিহাসের রাজনৈতিক কুশীলব ছিল।

গল্পের কেন্দ্রে একবার “ভারত বনাম পাকিস্তান” বসে গেলে বাংলাদেশ নিজের জন্মের ইতিহাসেই তৃতীয় পক্ষ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

এই পুনর্বিন্যাসে একটি রাজনৈতিক সুবিধাও আছে। ভারতকে ব্যাখ্যার কেন্দ্রে আনলে জামায়াতের পাকিস্তান-সমর্থনকে আর প্রধানত এই মাপকাঠিতে যাচাই করতে হয় না যে পাকিস্তানি রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে কী করেছিল। তখন সেটিকে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

এই যুক্তি নতুন নয়। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ৩৩ বছর জামায়াতে ছিলেন, সহকারী মহাসচিব হয়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের অন্যতম প্রধান আইনজীবী ছিলেন।

তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত স্মৃতিকথায় বর্ণিত আছে, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য দলের ক্ষমা চাওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে বারবার অভ্যন্তরীণ বিতর্ক হয়েছে।

স্মৃতিকথাটি নিয়ে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ক্ষমা চাওয়ার বিরোধীরা যুক্তি দিয়েছিল, অন্যান্য কথার মধ্যে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা সমর্থন করা ভুল ছিল না এবং ভারতীয় আধিপত্যের আশঙ্কা অমূলক ছিল না। একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাকি ক্ষমা চাইলে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিল!

তাহলে পরওয়ারের “ভারতীয় আগ্রাসন” উল্লেখ করাটা কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন জবাব নয়। এটি সেই পুরোনো ভাষার ভেতরেই পড়ে, যার মাধ্যমে জামায়াত ১৯৭১ সালের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক সামলে নিয়েছে।

রাজ্জাক নিজে পৌঁছেছিলেন ভিন্ন সিদ্ধান্তে।

তার স্মৃতিকথায় আছে, ২৫ মার্চের সেনা অভিযানের পর জামায়াত আগের অবস্থান উল্টে পাকিস্তানি সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিল।

তিনি লিখেছেন, সেনাবাহিনী বাঙালিদের উপর নৃশংসতা চালিয়েছিল, আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে না নেওয়াটা জামায়াতের জন্য ছিল অনৈতিক ও ইসলামবিরোধী।

এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অভিযোগ কোনো আওয়ামী লীগ প্রচারকের নয়। এটি জামায়াতের একজন সাবেক সহকারী মহাসচিবের, এবং এমন একজন আইনজীবীর, যিনি দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পক্ষে মামলা লড়েছেন -- অর্থাৎ এটি ভেতর থেকে আসা সমালোচনা।

এই সমালোচনা “আমরা অখণ্ড পাকিস্তান সমর্থন করেছি” কথাটির অসম্পূর্ণতা ধরিয়ে দেয়। প্রশ্নটা কখনোই কেবল এটুকুতে সীমাবদ্ধ ছিল না যে পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড থাকুক, এমন বিশ্বাস কেউ পোষণ করত কি না।

সেই বিশ্বাস ঐতিহাসিকভাবে যতই ভুল, আপত্তিকর বা স্বাধীনতাবিরোধী হোক, একটি রাজনৈতিক মত পোষণ করা নিজে কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। রাজনৈতিক বিশ্বাস রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। ফৌজদারি দায় প্রমাণ, আইন ও আদালতের বিষয়।

কিন্তু এই পার্থক্যের উল্টো পিঠও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সামরিক বাহিনী যখন বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে, অপহরণ করছে, নির্যাতন করছে এবং ব্যাপক সহিংসতা চালাচ্ছে, তখন জেনেশুনে সেই বাহিনীকে সহায়তা করা, লক্ষ্য চিহ্নিত করে দেওয়া, অপহরণে সহযোগিতা করা, হত্যায় অংশ নেওয়া কিংবা অন্য কোনোভাবে অপরাধে ভূমিকা রাখা “রাজনৈতিক মত” নামের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যেতে পারে না।

সেই পর্যায়ে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা হয়তো ব্যাখ্যা করে কেন কাজটি করা হয়েছিল। কিন্তু কাজটি অপরাধ ছিল কি না, তা নির্ধারণ করে না।

পরওয়ারের বক্তব্য ঠিক এই পার্থক্যটিকেই ভেঙে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে: রাজনৈতিক বিশ্বাস, সাংগঠনিক সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়। এগুলো সম্পর্কিত, কিন্তু বিনিময়যোগ্য নয়। এগুলোকে গুলিয়ে ফেললে ইতিহাস বর্ণনা করা সহজ হয়। কিন্তু ইতিহাস তাতে আরও নির্ভুল হয় না।

কথাটা কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা দরকার। হত্যা হত্যাই। অপহরণ অপহরণই। নির্যাতন নির্যাতনই। অপরাধীরা পাকিস্তান রক্ষা করছে ভেবেছিল বলেই মানবতাবিরোধী অপরাধ রাজনৈতিক মতভেদ হয়ে যায় না। আদর্শ, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ভয় কোনো অপরাধমূলক কাজের আইনি চরিত্র মুছে দেয় না।

এবার আসা যাক পরওয়ারের আরও সাহসী দাবিতে: “জামায়াত কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেনি”। এর মানে ঠিক কী? একটি রাজনৈতিক দল তো রাইফেল হাতে দাঁড়ানো মানুষ নয়।

ফৌজদারি আইন সাধারণত নির্দিষ্ট আচরণের জন্য চিহ্নিত ব্যক্তিদের উপর দায় আরোপ করে, যদিও আইনব্যবস্থা সাংগঠনিক দায়ের ব্যবস্থাও করতে পারে।

তাই প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক প্রশ্নটি এই নয় যে “জামায়াত” শব্দটি নিজে ট্রিগার টিপতে পারে কি না। প্রশ্ন হলো, জামায়াতের নেতৃত্বের বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট অপরাধে অংশ নিয়েছিল, নির্দেশ দিয়েছিল, সহায়তা করেছিল, কিংবা অন্য কোনোভাবে আইনত দায়ী ছিল কি না।

এই প্রশ্নে “কোনো ফৌজদারি অপরাধ নেই” ধরনের নিঃশর্ত দাবি টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হয়েছে, এবং কিছু রায় পরে আপিল বিভাগে বিবেচিত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলোতে জামায়াত নেতা, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিষয়ে প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, কামারুজ্জামানের আপিলে আদালত পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অধ্যাদেশ, ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীদের আল-বদরে নিয়োগ, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে তাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাওয়া, এবং কামারুজ্জামানের নেতৃত্বের ভূমিকা সংক্রান্ত প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করেছে।

এসব বিচারকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখাও যায় না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৯৭১ সালের নৃশংসতার জবাবদিহির পক্ষে বারবার অবস্থান নিয়েছে, অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে, গোলাম আযমের মামলাসহ, ন্যায্য বিচারের গুরুতর উদ্বেগের কথা নথিভুক্ত করেছে।

সেই সমালোচনার মূল্য আছে। যথাযথ প্রক্রিয়াকে ঐচ্ছিক বিবেচনা করে কোনো সমাজ ঐতিহাসিক নৃশংসতার ন্যায়বিচার দাবি করতে পারে না।

তবে এখানেও একটি মৌলিক যৌক্তিক পার্থক্য আছে। “বিচার ত্রুটিপূর্ণ ছিল” আর “অপরাধ কখনো ঘটেনি” -- এ দুটি এক প্রস্তাব নয়।

একটি হত্যা-তদন্ত খারাপভাবে পরিচালিত হতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ অপর্যাপ্ত হতে পারে বা ভুলভাবে সামলানো হতে পারে। তাতে এটা প্রমাণ হয় না যে ভুক্তভোগী কখনো খুন হয়নি।

প্রক্রিয়াগত সমালোচনা বিচারের ন্যায্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে; তা নিজে থেকে নৃশংসতা, সহযোগী বাহিনী বা সহযোগিতার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব মুছে দেয় না।

এ কারণেই ক্ষমা চাওয়া নিয়ে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও তা নিজে ফৌজদারি দায়ের প্রমাণ নয়। রাজ্জাকের বিবরণে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দলকে ১৯৭১ নিয়ে ক্ষমা চাইতে রাজি করানোর বারবার চেষ্টা হয়েছে।

একাধিক খসড়া তৈরি হয়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ সংস্থাগুলোতে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। এক পর্যায়ে জামায়াত বিলুপ্ত করে নতুন সংগঠন গড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছিল।

মুখোমুখি হওয়ার মতো কোনো গুরুতর ঐতিহাসিক দায় যদি না-ই থাকত, তাহলে দলটি ক্ষমা চাওয়ার ভাষা নিয়ে এত বছর বিতর্ক করল কেন?

অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ফৌজদারি দণ্ড নয়। কিন্তু এটি ১৯৭১ সালে জামায়াতের দায়ের পুরো প্রশ্নটিকে তার রাজনৈতিক শত্রুদের বানানো কাহিনি বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন করে তোলে।

জনাব পরওয়ার, আপনার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত ফৌজদারি দণ্ডকে নিছক রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতায় নামিয়ে আনা তাই একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ।

এগুলো কেবল পাকিস্তান অখণ্ড থাকবে কি না তা নিয়ে মতভেদ ছিল না। জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হয়েছে।

সেই দণ্ড যাচাই করা যেতে পারে, বিচারের ন্যায্যতাও অবশ্যই যাচাই করতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিজে থেকে অপরাধমূলক আচরণকে বৈধ রাজনৈতিক মতে রূপান্তরিত করে না।

“জনগণই বিচার করবে” -- এটাও ফৌজদারি দায়ের জবাব নয়। জনগণ অবশ্যই দলগুলোর রাজনৈতিক বিচার করে। তারা ভোট দেয়, প্রত্যাখ্যান করে, ক্ষমতায় ফেরায় কিংবা বিরোধী দলে পাঠায়।

কিন্তু জনসমর্থন অপরাধ মুছে দেয় না, আর নির্বাচনী ম্যান্ডেট কোনো অপরাধকে বৈধ রাজনৈতিক অবস্থানে পরিণত করতে পারে না। ব্যালট রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে। কিন্তু পূর্বপ্রভাবী খালাস দিতে পারে না।

এরপর আসে ‘রাজাকার’ শব্দটি। সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এমন নির্বিচারে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যে এর ঐতিহাসিক অর্থ প্রায়ই ঢাকা পড়ে গেছে।

তবে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেই কাউকে ‘রাজাকার’ বলা হতো না। পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অধ্যাদেশ প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে একটি নির্দিষ্ট সহযোগী বাহিনী গঠন করেছিল, যেখানে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের বিধান ছিল।

পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টও রাজাকার ও অন্যান্য সহযোগী বাহিনী নিয়ে আলোচনা করেছে।

এখানে ঐতিহাসিক নিখুঁততা জরুরি। স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এমন প্রত্যেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকার ছিল না, আর প্রত্যেক স্থানীয় সহযোগীও রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিল না। শান্তি কমিটি, আল-বদর, আল-শামস এবং অন্যান্য কাঠামোও ছিল।

কিন্তু এই নিখুঁততাকে বেছে বেছে কাজে লাগিয়ে জামায়াত, তার তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ও পাকিস্তানপন্থী সহযোগী কাঠামোগুলোর মধ্যকার নথিভুক্ত যোগসূত্রকে “রাজনৈতিক মতভেদ”-এর নিরীহ শ্রেণিতে মিলিয়ে দেওয়া যায় না।

তাই “জামায়াত মানেই রাজাকার” -- এটি ভালো ইতিহাস হওয়ার পক্ষে বেশি স্থূল। কিন্তু “জামায়াত কেবল অখণ্ড পাকিস্তান সমর্থন করেছিল” -- এটিও বিভ্রান্তিকর সরলীকরণ।

গুরুতর প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে কারা পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখতে চেয়েছিল। প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক সহিংসতা চালাচ্ছিল, তখন কে কোথায় দাঁড়িয়েছিল এবং কী করেছিল।

পরওয়ার এরপর বিএনপির দিকে ঘুরেছেন এবং বলেছেন, রাজাকারের তালিকা করলে বিএনপি জামায়াতের উপরে অবস্থান নেবে। এই দাবিতে একটি প্রাথমিক কালানুক্রমিক সমস্যা আছে: ১৯৭১ সালে বিএনপির অস্তিত্বই ছিল না।

যা বৈধভাবে খতিয়ে দেখা যায়, তা হলো -- যারা রাজাকার, সহযোগী বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল, তারা পরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিল কি না, এবং বিএনপি পরে তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত বা উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করেছিল কি না।

এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন, এবং বিএনপির নিজের ইতিহাসের জবাব দেওয়া উচিত। বস্তুত, পরওয়ার আলাদাভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের রাষ্ট্রের উচ্চপদে নিয়োগ দিয়েছিল। প্রমাণিত হলে স্বাধীনতার পর এমন রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখার মতো।

কিন্তু দুই ধরনের দায় গুলিয়ে ফেলা চলবে না। ১৯৭১ সালে কোনো ব্যক্তি কী করেছিল, তা সেই ব্যক্তির ঐতিহাসিক এবং প্রমাণিত হলে ফৌজদারি দায়।

পরে গঠিত কোনো দল জেনেশুনে সেই ব্যক্তিকে পুনর্বাসিত বা ক্ষমতায়িত করলে তার রাজনৈতিক দায় বহন করতে পারে। শেষোক্তটি প্রথমটিকে নতুন করে লেখে না।

ধরা যাক, তর্কের খাতিরে পরওয়ারের কথাই পুরোপুরি ঠিক, এবং জামায়াতের চেয়ে বেশি সাবেক সহযোগী পরে বিএনপিতে ঢুকেছিল। তাতে কী? এতে জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও দায় কীভাবে কমে যায়?

একজন ছাত্র পরীক্ষায় ২৫ পেয়েছে, আর তাকে বলা হয়েছে সে ফেল করেছে। সে বিজয়ীর ভঙ্গিতে জবাব দিল, তার পাশের ছাত্র পেয়েছে ১৫।

অভিনন্দন: অন্য ছাত্রটি আরও খারাপ করেছে। কিন্তু আপনার ২৫ তাতে ৩৩ হয়ে যায়নি।

রাজাকারের ইতিহাস কোনো লিগ টেবিল নয়, যেখানে বিএনপি স্বর্ণ জিতবে আর জামায়াত নির্দোষিতার রৌপ্য পদক পাবে। বিএনপি যদি সহযোগীদের পুনর্বাসিত করে থাকে, সেই ইতিহাস তদন্ত করুন।

আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দল একই কাজ করে থাকলে তাদেরটাও তদন্ত করুন। কোনো ব্যক্তির পরবর্তী দলীয় সদস্যপদ ১৯৭১ সালে তিনি যা করেছিলেন তাকে পবিত্র করে না। আবার অন্য দলের অন্যায় আপনার নিজের অন্যায়ের খালাস নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের এটি একটি পরিচিত ব্যাধি: নিজের ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিপক্ষের দিকে আঙুল তোলা। আওয়ামী লীগ আঙুল তোলে বিএনপির দিকে। বিএনপি তোলে আওয়ামী লীগের দিকে।

জামায়াত তোলে বিএনপির দিকে। প্রত্যেকে অন্যের ইতিহাসের চমৎকার হিসাবরক্ষক হয়ে ওঠে, আর নিজের খাতাটি রহস্যজনকভাবে বন্ধ রাখে।

তুলনামূলক নির্দোষিতার উপর গণতান্ত্রিক জবাবদিহি গড়ে ওঠে না: “আমি খারাপ হতে পারি, কিন্তু সে আরও খারাপ।” শিশুর আত্মপক্ষ সমর্থন হিসেবে এটা চলতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের দর্শন হিসেবে এটি দুর্বল।

আরও গভীর প্রশ্ন এটি নয় যে আজকের তরুণ জামায়াত কর্মীরা তাদের জন্মের আগে ঘটে যাওয়া অপরাধের ব্যক্তিগত দোষ বহন করবে কি না। তারা তা করবে না। ফৌজদারি অপরাধের দায় বংশানুক্রমিক নয়। প্রশ্নটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির।

কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যদি নাম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা দাবি করে, তাহলে সেই উত্তরাধিকারের অন্ধকার অংশগুলোর সঙ্গে তার বর্তমান সম্পর্কটি একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিষয়।

উত্তরাধিকার কোনো ইচ্ছাভোজন নয় যে দল গৌরবময় অধ্যায়গুলো নিজের প্লেটে তুলে নেবে আর দায়ের বাটিটি টেবিলে ফেলে রাখবে।

এখানেই পরওয়ারের যুক্তি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল। তিনি ইতিহাসের প্রশ্নের জবাব ইতিহাস দিয়ে দেন না। পাকিস্তানের ভূমিকা অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে ভারত ছবিতে ঢুকে পড়ে।

জামায়াতের দায়ের প্রশ্ন উঠলে বিএনপি হাজির হয়। আর শেষে দায় তুলে দেওয়া হয় “জনগণের” হাতে, যেন দায়কে চিরকাল গতিশীল রাখলেই তা অদৃশ্য হয়ে যাবে।
তা হয় না।

ভারতের আচরণ ভারতের আচরণ হিসেবেই খতিয়ে দেখা উচিত। বিএনপিকে বিএনপির ইতিহাসের জবাব দিতে হবে। আওয়ামী লীগকে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যবহার ও অপব্যবহারের জবাব দিতে হবে। জামায়াতকে জামায়াতের জবাব দিতে হবে।

ঐতিহাসিক অন্যায় স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে বর্তমান সদস্যরা পূর্বসূরিদের ফৌজদারি দোষের উত্তরাধিকারী হয়ে যায়। এর অর্থ আরও রাজনৈতিকভাবে পরিণত কিছু: বর্তমানের কাছে অসুবিধাজনক বলেই অতীতকে নির্দোষ বানিয়ে ফেলতে অস্বীকার করা।

কোনো দলের বদলে যাওয়ার দাবির শেষ পরীক্ষা নতুন শব্দভান্ডার, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব বা নতুন নির্বাচনী ম্যান্ডেটে নয়। পরীক্ষা হলো, দলটি নিজের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের কঠিন সত্যগুলোর সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে কি না।

তাই হ্যাঁ, ভারতের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করুন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করুন। ১৯৭১ সালে সন্দেহজনক রেকর্ডধারী ব্যক্তিদের বিএনপি-কর্তৃক পুনর্বাসনের তদন্ত করুন। প্রতিটি দলের খতিয়ান পরীক্ষা করুন।

কিন্তু নিজের খতিয়ানের জবাবে অন্যের খতিয়ান দেখাতে আসবেন না।

কারণ ভারত, বিএনপি ও জনমতের সব আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে শেষে ঐতিহাসিক প্রশ্নটি অদ্ভুতভাবে সরলই থেকে যায়: আপনারা অখণ্ড পাকিস্তান সমর্থন করেছিলেন, বুঝলাম। কিন্তু ২৫ মার্চের পর আপনাদের রাজনৈতিক পূর্বসূরিরা কী করেছিল?

এ প্রশ্নের উত্তর স্লোগান দিয়ে হয় না। উত্তর দিতে হয় প্রমাণ দিয়ে।

ড. লুবনা ফেরদৌসী ইংল্যান্ডভিত্তিক একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ার জন্য

মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও জামায়াত–বিএনপি সংশ্লিষ্ট বাদানুবাদ। যমুনা টিভি ও দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৬।

আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর স্মৃতিকথা ও ১৯৭১ নিয়ে ক্ষমা চাওয়া সম্পর্কে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক। দ্য ডেইলি স্টার, সেপ্টেম্বর ২০২৬।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বনাম চিফ প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ফৌজদারি আপিল নং ৬২/২০১৩।

মতিউর রহমান নিজামী বনাম বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ।

ফরেন রিলেশনস অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৬৯–১৯৭৬, পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ক নথি, ১৯৭১। অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

বাংলাদেশ: আযমের দণ্ড ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ১৬ আগস্ট ২০১৩।

বাংলাদেশ: যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করুন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ৯ মে ২০১৬।