বিএনপির "কেন্দ্রীয় ব্যাংক" এর ভুল
এই যে পারসেপশন, এই সিগ্নালিং এইটাই আগামীতে সংকট তৈরি করবে যার প্রভাব পড়বে টাকার মানের উপরে কারন একটা ১০ পয়সার কাগজকে কেন আপনি ১০০ টাকা মনে করেন তা আস্থা ও পারসেপশনের উপরে নির্ভরশীল।
কেন একটা ১০ পয়সা দামের কাগজকে আপনি ১০০ টাকা মনে করেন, তার প্রধান কারণ আস্থা। আপনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এই মানটা নির্ধারণ করেছে এবং এই মানটা ধরে রাখবে।
এই আস্থা দুইটা জিনিসের উপরে করে -- যারা ব্যাংকটি চালাচ্ছে, তারা কারা। তারা কতটুকু শক্তিশালী যে, সরকারের চাপ উপেক্ষা করেও তারা টাকার মানটা ধরে রাখতে অর্থনৈতিক মূলনীতি গুলো মেনে চলবে ।
মূলনীতি গুলো হচ্ছে, বছরের যে নতুন উৎপাদন হয় তার থেকে বেশি নতুন টাকা ছাপাবে না, সুদের হার এমন জায়গায় রাখবে যেন অর্থ প্রবাহ বেশি বৃদ্ধি না পায় এবং মূল্যস্ফীতি ও চাহিদা-যোগানের সাথে তাল মিলিয়ে টাকার আন্তর্জাতিক মান অর্থাৎ ডলারের সাথে এক্সচেঞ্জ রেট ধরে রাখবে।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, এই ব্যক্তিরা কী সিগন্যাল দিচ্ছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর বাৎসরিক রেমিটেন্স এভারেজ ২৪ বিলিয়ন ডলার ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উঠে গেল।
কেন?
তার কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুর সাহেব স্পষ্ট সিগন্যাল দিয়েছেন, তিনি সুদের হার কমাবেন না এবং টাকার মান একটা মোটামুটি স্বচ্ছ রোলিং পেগে ছেড়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ তিনি আর্টিফিশিয়ালি টাকার মান ধরে রাখবেন না।
ফলে তিনি যখন আর্টিফিশিয়ালি টাকার মান ধরে না রাখার এবং উচ্চ সুদের হারের মাধ্যমে অর্থ প্রবাহ সংকোচন করায় সবাই সিগন্যালিং পেল যে, , ১২৪ থেকে টাকার দাম আর আর পড়বে না। তার আগের হাসিনার আমলের গভর্নরের প্রতি আমাদের ধারনা ছিল যে তিনি, জোর করে টাকার মান ধরে রেখেছেন ,সেইটা না করলে টাকার মান ১২৪ থেকে ২০০ পর্যন্তও যেতে পারে।
তাই আহসান মনসুরের নীতির ফলে যারা পূর্বের তাদের উপার্জন, আগামীতে বেশি টাকা পাওয়া যাবে সেই আশায় বিদেশে আটকে রাখতো তারা তখন আয় হলেই ডলার পাঠানো শুরু করলো। এর ফলের ১.৫ বছরে রিজার্ভ ১৮ বিলিয়ন থেকে ৩০ বিলিয়নে উঠে এসেছে ।
কিন্তু, ব্যক্তির প্রতি এই আস্থা, পলিসি কন্টিনিউটি ও সিগন্যালিং এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর যে টাকার মান ধরে রাখে বা রাখতে চায়, সেই চাওয়ার সাথে সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রুপের ইচ্ছা সাংঘর্ষিক।
যেমন সরকার চায়, অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ, যেন ব্যাংকিং সেক্টরে অতিরিক্ত লিকুইডিটি তৈরি হয় যার থেকে সে সহজে ঋণ নিতে পারবে, প্রাইভেট সেক্টরের সাথে কম্পিটিশান হবেনা ।
সরকার চায়, নিম্ন সুদের হার যেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানরা কম খরচে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে পারে, যার ফলে কর্মসংস্থান হবে , সরকার রাজস্ব বেশি পাবে ও সাফল্য দাবি করতে পারবে ।
কিন্তু সুদের হার কমানো ও অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধির যে ট্রেড-অফ আছে সেইটাও আবার সরকার চায় না। তা হলো --
ভ্যালু ক্রিয়েশনের অতিরিক্ত টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি হয় ।
মূল্যস্ফীতি হলে এক্সচেঞ্জ রেটের পতন ঘটে । জ্বালানি মুল্য ও উৎপাদনের কাঁচামালের মুল্য বৃদ্ধি পায় ফলে সকল আমদানিকৃত ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় , যেটা সরকারকে অজনপ্রিয় করে ।
কিন্তু সরকার যেহেতু পলিটিক্যাল অ্যানিমাল এবং সরকার যেহেতু ইন্টারেস্ট গ্রুপ দ্বারা তাড়িত হয় তাই সরকার এই ট্রেড-অফটাকে রেসপেক্ট করতে চায় না। তারা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিজের লোককে দিয়ে বসায়, সুদের হার, এক্সচেঞ্জ রেট ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি করবে।
বর্তমান সময়ে এই পলিসিটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন একটা রিসেশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেটাকে বলে ব্যালান্স শিট রিসেশন।
হাসিনোমিক্সের কারণে, অনেক বিজনেস খেলাপি হয়ে গিয়েছে। সকল খেলাপি বিজনেস অসৎ নয়। এস আলমের মত যারা টাকা পাচার করেছে তাদের কথা আলাদা। কিন্তু অনেক সৎ ব্যবসায়ী আছে, তাদের উৎপাদনের ক্যাপাসিটি আছে, কিন্তু ক্রেতা নাই। তারা ওভার-ইনভেস্টমেন্ট করেছে, বিক্রিত পন্যের মুনাফা দিয়ে ব্যাংক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে পারছে না।
ফলে অর্থনীতিকে রিকাভার করার জন্যে এখন সুদের হারটা কমানো দরকার, তাদের জন্য ব্যাংকিং সেক্টরে বিভিন্ন ধরনের পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়াটা প্রয়োজনীয়।
কিন্তু সেইটা আপনি কীভাবে করবেন?
করবেন, ক্রেডিবল অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য লোক দিয়ে, যে লোকের উপরে জনগণ, আন্তর্জাতিক সংস্থা আস্থা পাবে যে এই লোক সরকারের চাপে নমনীয় হবে না। বরং বিজনেসকে রিভাইভ করার জন্য, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য, নেগেটিভ রিয়েল ঋণ প্রবৃদ্ধির হারকে বিগত ২০ বছরের এভারেজ রেট ২০% বা ২৫% এ নেওয়ার জন্য, নিজের তাগিদেই সে অর্থনৈতিক নীতি অনুসারে সুদের হার নির্ধারণ করবে।
কিন্তু প্রবলেম হচ্ছে, বিএনপির সরকার সেই ক্রেডিবিলিটির ধার ধারছে না। তাই বাংলাদেশ সরকার এমন একজন প্রক্সি গভর্নর নিয়োগ দিতে চাইছে, যিনি রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছার বাইরে যাবে না।
এর ফলে যে কাজটা করার দরকার তার সম্পূর্ণ উল্টো প্রভাব পড়বে। আমার ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্সের সাথে যুক্ত একজন অর্থনীতিবিদ বন্ধু সকালে বললেন --
নিউইয়র্ক-বেসড একজন ব্যাংকার, যে বিশ্বের ৫টা গ্লোবাল ব্যাংককে অ্যাডভাইজ করে, যে তারা অপেক্ষায় ছিল যে কবে নতুন সরকার আসবে, তখন সে তার অ্যাডভাইজ করা ব্যাংকগুলোকে বলবে বাংলাদেশের ক্রেডিট লাইন বৃদ্ধি করতে --
সে সকালে ফোন দিয়ে বলেছে, সে পাঁচটা গ্লোবাল ব্যাংককেই জানাবে বাংলাদেশে যেন ক্রেডিট লাইন বৃদ্ধি না করে।
কারণ তারা ভাবছে, কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ব্যতীত একজন সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার অর্থ, ব্যবসায়ীদেরকে ছাড় দেওয়া যার হাত ধরে, পলিসি সাপোর্ট, লোন ক্লাসিফিকেশন নীতিমালায় সূক্ষ্ম ছাড়, পরিদর্শন কাঠামো দুর্বল করা এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলে শুরু হবে।
হাসিনার আমলের শেষের দিকের কথা ভুলে যান না, করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলো ক্রেডিট লাইন ফ্রিজ করা শুরু করে।
হাসিনোমিক্সের সবচেয়ে বড় পরিণতি হলো সে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে নাই, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও ধ্বংস করে দিয়েছে।
সেই অনাস্থা থেকে রিবিল্ড করতে হলে সরকারের দরকার ছিল আস্থাভাজন লোকের নিয়োগ দেওয়া। কিন্তু সেইটার বদলে অর্থ মন্ত্রণালয় সিগন্যালিং দিচ্ছে যে তারা দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করবে।
আমার একজন অর্থনীতিবিদ বন্ধু নতুন গভর্নরের হাতে কী কী ডিজাস্টার হতে পারে তার একটা লিস্ট করেছেন --
১। আল্ট্রা লুজ মনিটারি পলিসি। ১% এর উপরে যে কোনো পরিমাণ রেট কাট।
২। আইএমএফের প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে আসা, যার ফলে গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল সিস্টেমের আস্থা নষ্ট হবে।
৩। ব্যাংকিং সেক্টরের কাঠামোগত সংস্কার না করা।
৪। খেলাপি ঋণের তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা, এবং নতুন করে তথ্য গোপন করা।
৫। নেগেটিভ অ্যাসেট ভ্যালুর ব্যাংকগুলোকে কোনো ধরনের প্রক্রিয়া ব্যতীত ক্রমাগত রিফিন্যান্স করে যাওয়া।
৬। ক্লায়েন্টের সক্ষমতার বদলে, গভর্নরের আদেশে ব্যাংকগুলোকে ব্ল্যাঙ্কেট ঋণ রিসিডিউল করতে বাধ্য করা।
৭। খারাপ ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রভিশনিং ডিফার করার সুযোগ করে দেওয়া।
কিন্তু এই লিস্টটা দেখে আমার মজা লেগেছে, দুইটা কারণে --
১। এই লিস্টের অন্তত দুইটা জিনিস আহসান মনসুর সাহেব করেছেন, এবং সবচেয়ে খারাপটাই করেছেন, তা হচ্ছে নেগেটিভ অ্যাসেট ভ্যালুর ব্যাংকগুলোও তিনি রিফিন্যান্স করেছেন এবং দেড় বছরে ব্যাংকিং সেক্টরের কাঠামোগত সংস্কার করেন নাই ।
কিন্তু তারপরেও তার উপর সকলে আস্থা রেখেছে। কারণ একটাই -- সকলেই জানতো তিনি অর্থমন্ত্রীর পাপেট না।
তিনি যে সুদের হার ধরে রেখেছেন, সেইটা নিয়ে এমনকি মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়ে আমার বিপরীত মত রয়েছে। কিন্তু তবুও ব্যক্তি হিসেবে আমরা সকলেই তাকে আস্থা রাখার মতো মনে করেছি, যে আস্থার কারনে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে স্ট্যাবিলিটি এসেছে।
এবং দুই -- এই লিস্টের প্রধান যে অংশ তা হচ্ছে রেট কাট করা -- আমি সেইটার পক্ষে।
অথচ সেই একই কাজ আহসান মনসুর করলে আমি কোনো শব্দ করবো না। কিন্তু নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান করলে আমার মনেই প্রশ্ন আসবে। কারণ আমরা তাকে পারসিভ করি সরকারের একটা রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট হিসেবে, যিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কথা মেনে চলবেন।
এই যে পারসেপশন, এই সিগ্নালিং এইটাই আগামীতে সংকট তৈরি করবে যার প্রভাব পড়বে টাকার মানের উপরে কারন একটা ১০ পয়সার কাগজকে কেন আপনি ১০০ টাকা মনে করেন তা আস্থা ও পারসেপশনের উপরে নির্ভরশীল।
এই যে অনাস্থা দিয়ে শুরু এইটা নতুন গভারনর সাহেব কাটাইতে পারবেন বলে আমার মনে হয়না, কারন অত্যন্ত সংকট ময় একটা সময়ে গভারনর হয়েছেন যখন তাকে অনেক গুলো ডিফিকাল্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং প্রতিটা সিদ্ধান্তের ট্রেড অফ রয়েছে । এই সিদ্ধান্ত গুলো যখন তিনি নেবেন তখন এই ট্রেড অফের ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ বিএনপির ক্রনিজদেরকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ি করবেন।
সকল ক্রিটিকাল ক্ষেত্রেই তাকে জনরোষের মুখোমুখি হইতে হবে যার পরিণতি পড়বে, টাকার মানের উপরে ।
আই এম সরি বিএনপি,
আগুন নিয়েও খেলা যায় কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভারনর নিয়ে এই ভাবে খেলা যায় না।
What's Your Reaction?