মক্কা থেকে শেষ ফোনালাপ
ওয়াহাবি কর্তৃপক্ষ কোনো স্বাধীন নৈতিক কর্তৃপক্ষ নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান। আলেম শ্রেণি এমন সব ফতোয়া দেয়, যা শাসকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে পবিত্র করে তোলে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পনেরো দিন আগে সুইটি আখতার টাঙ্গাইলে তার বাবা-মাকে ফোন করেছিল। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে সে সৌদি আরবের একটি নারী কারাগারে বন্দি ছিল।
মেয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে থাকা তার বাবা-মা মেয়ের কণ্ঠ শুনল। সুইটি তাদের বলেছিল, হয়তো তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তারা জানত না, এটাই তাদের শেষ কথা।
সুইটি তখন মক্কায় ছিল নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুলের বয়স ২২, এক কৃষকের ছেলে। ছেলের একটা ভবিষ্যৎ কিনে দিতে তার বাবা সাত লাখ টাকা ধার করেছিল। দুজনেই একই কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করত।
২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ব্যভিচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় সুইটি।
২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, ফাঁসির মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেলের দপ্তর (আঞ্চলিক দূতাবাসের শামিল) ৯৭ জন বাংলাদেশি বন্দির একটি গোপন তালিকা পায়। সেই তালিকায় নজরুল আর সুইটিও ছিল। মৃত্যুদণ্ডের ঘরটা ছিল ফাঁকা। কনসুলেট কিছুই করেনি।
১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজনেরই শিরশ্ছেদ করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে, মসজিদের ভেতরে "অনৈতিক কাজ"-এর দায়ে তাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের মৃত্যুর খবর পেল সংবাদ থেকে। আর সুইটির বাবা-মা জানল, বাড়ি ফেরার আশা নিয়ে থাকা মেয়েটি আর নেই।
এটা একটা কাঠামোর পরিণতি। একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর একটি তরুণী কীভাবে অন্ধকারে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হলো, আর তাদের পরিবার কীভাবে ফোনের পাশে বসে অপেক্ষা করল, সেটা বুঝতে হলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হিসেবে ধর্মকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়, আর পশ্চিমা শক্তিগুলো কীভাবে সেটাকে টিকিয়ে রাখে।
আল সৌদের উত্থান কোনো ঐশ্বরিক অধিকারে হয়নি। এর ভিত্তি ১৭৪৪ সালের একটি চুক্তি, যা হয়েছিল তলোয়ার আর মিম্বরের মধ্যে। কিন্তু আধুনিক ভূগোলকে আকার দিয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্য। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ কূটনীতিক সেন্ট জন ফিলবি ইবনে সৌদকে গোয়েন্দা তথ্য জোগাতেন, যাতে সে প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে পারে।
চূড়ান্ত লেনদেনটা হয় ১৯৭৪ সালে, যখন হেনরি কিসিঞ্জার সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। তেলের দাম ঠিক হবে ডলারে, উদ্বৃত্ত অর্থ ফিরে যাবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে, আর সিংহাসনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে আমেরিকা।
এই পেট্রোডলার চুক্তি পশ্চিমের নীরবতা কিনে নিয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের ব্যাখ্যা এতে মেলে না। সেটা বুঝতে হলে তাকাতে হবে ভেতরের যন্ত্রের দিকে।
ওয়াহাবি কর্তৃপক্ষ কোনো স্বাধীন নৈতিক কর্তৃপক্ষ নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান। আলেম শ্রেণি এমন সব ফতোয়া দেয়, যা শাসকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে পবিত্র করে তোলে।
ধর্মকে এভাবেই অস্ত্র বানানো হয়। সৌদি রাষ্ট্রের দাবি, নজরুল আর সুইটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করেছে। অথচ সুইটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ব্যভিচারের। নৈতিকতার ভাষার আড়ালে রাষ্ট্র তার খেয়ালি বিচারব্যবস্থাকে লুকিয়ে রাখে।
তা'জির ব্যবস্থায় বিচারকের বিবেচনা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকে। এর ফলে রাষ্ট্র প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা করে নির্ধারণ করে নেয় অনৈতিকতা কী।
একজন গরিব বিদেশির ওপর আইনের সবচেয়ে কঠোর ব্যাখ্যাটাই প্রয়োগ করা হয়। এই নৈতিকতা ঐশ্বরিক নয়। এটা লেনদেনের নৈতিকতা, যা ক্ষমতাবানকে রক্ষা করে আর অসহায়কে ধ্বংস করে।
সংখ্যাই এই ভণ্ডামির প্রমাণ। গত নয় মাসেই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছে ৯৭৯ জন বাংলাদেশি নারী।
মাসে একশোরও বেশি নারী। অথচ যেই সৌদি নিয়োগকর্তারা তাদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করে, তাদের মৃত্যুদণ্ড হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে মামলাই হয় না। তলোয়ার নামে শুধু গরিব, বিদেশি আর ক্ষমতাহীনদের ঘাড়ে।
এই ব্যবস্থার খেয়ালিপনা ধরা পড়েছে গত সপ্তাহেই। ইসলামকে অবমাননার অভিযোগে এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে। তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার পরই আদালত এই পদক্ষেপ নেয়।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের কারণে একজন শ্রীলঙ্কানের প্রাণ রক্ষা পেল। অথচ নজরুল আর সুইটিকে নিঃশব্দে, অন্ধকারে শিরশ্ছেদ করা হলো।
বাংলাদেশ সরকার জানত যে তারা কারাগারে আছে। ৩০ সেপ্টেম্বর কনসুলেট জেনারেলের দপ্তরের হাতে তাদের নাম ছিল। মৃত্যুর পনেরো দিন আগে সুইটি তার বাবা-মাকে ফোন করেছিল, ভেবেছিল হয়তো মুক্তি মিলবে।
তবুও কোনো আইনজীবী পাঠানো হয়নি। ক্ষমা চেয়ে কোনো আবেদন করা হয়নি। যেই রাষ্ট্র প্রবাসী শ্রমিকদের বলে রেমিট্যান্সযোদ্ধা, টাকা এলে যাদের উদযাপন করে, যখনই তাদের কণ্ঠস্বরের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, তখনই রাষ্ট্র তাদের ছেড়ে দিল।
পশ্চিম এখনো এই শাসকগোষ্ঠীকে অস্ত্র আর অর্থ জোগাচ্ছে। পশ্চিমা নেতারা এখনো যুবরাজকে আতিথ্য দিচ্ছে। মানবাধিকারের বুলির এই বাছবিচার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি নয়, এটাই তার বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিম এই শাসনব্যবস্থা গড়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, আর এখনো একে আড়াল করে চলেছে।
নজরুলের বাবার একটাই ইচ্ছা বাকি আছে। সে ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। সে এখনো অপেক্ষা করছে। পাওনাদাররা এখনো ফোন করে যাচ্ছে।
টাঙ্গাইলে সুইটির বাবা-মায়ের হাতে রয়ে গেছে একটি ছবি, একটি নীরব ফোন, আর এমন এক মেয়ের স্মৃতি, যাকে বলা হয়েছিল হয়তো সে বাড়ি ফিরছে।
নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ২২। সুইটি আখতার ছিল এক তরুণী, যে শুধু বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর তারা বেঁচে ছিল।
তারা ছিল একটি কনসুলেটের তালিকায়। তাদের নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল। আর রিয়াদ থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ওয়াশিংটন, এই গোটা ব্যবস্থা তাদের মরতে দিল।
এটাই আসল অনৈতিকতা। মসজিদে দুজন মানুষের মধ্যে যা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে, সেটা অপরাধ নয়। অপরাধ হলো তাদের ঘিরে আমরা যেই অবকাঠামোটি গড়েছি, আর যেই নীরবতা আমরা ধরে রেখেছি।
জাকির কিবরিয়া নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক বাংলাদেশি লেখক, নীতি বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তা। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানা [email protected]