কতকাল তারা আমাদের শ্রমিকদেরকে হত্যা করবে, আর আমরা পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকব?

আমরা তাদেরকে "রেমিট্যান্স যোদ্ধা" বলি, আর এই উপাধি তারা অর্জন করেছে। তাদের অর্থ লাখ লাখ পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে শক্ত করে রেখেছে। তারা দুটি দেশকে পিঠে বয়ে বেড়াচ্ছে।

Oct 25, 2026 - 11:28
কতকাল তারা আমাদের শ্রমিকদেরকে হত্যা করবে, আর আমরা পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকব?
Photo Credit: Shutterstock

অক্টোবরের ১৪ তারিখ সন্ধ্যা সাতটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি গ্রামে একটি ফোন বাজল। সৌদি আরব থেকে কেউ একজন ২৫ বছর বয়সি নজরুল ইসলামের পরিবারকে জানাল যে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

খবরটি শুনে তার ৬৫ বছর বয়সি নিকট আত্মীয় ভেঙে পড়লেন, আর সেই রাতেই মারা গেলেন।

মাত্র তিন দিন আগে, ১১ অক্টোবর, নজরুল বাড়িতে ফোন করেছিল। ফোনালাপ ছিল মাত্র দুই মিনিটের। কেউ জানত না, সেটাই ছিল শেষ ফোন।

এখন তার মা রহিমা বেগম বলছেন, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা। তিনি শুধু একবার শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখতে চান।

নজরুল প্রায় তিন বছর সৌদি কারাগারে কাটিয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের ভাষ্য অনুযায়ী সে এবং সুইটি আখতার নামের আরেক বাংলাদেশি মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে একটি "অনৈতিক কাজ" করেছে। রিয়াদ এটুকুই সবাইকে জানিয়েছে। নজরুলের পরিবার খবরটি জেনেছে ফোনে।

বাংলাদেশ সরকার জেনেছে একটি সংবাদ বিবৃতি থেকে। জেদ্দার কনসুলেট জেনারেলের দপ্তর (আঞ্চলিক দূতাবাসের শামিল) বলছে, আগে থেকে তাদেরকে কিছু জানানো হয়নি। কয়েক দিন পরেও ঢাকা নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা কারা।

বিচার তো অন্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু সৌদি বিচারের দৃষ্টিশক্তি নিখুঁত। সে পাসপোর্ট দেখে।

একটি দুর্বল দেশের গরিব অভিবাসী সৌদি আদালতে এসে দাঁড়ালে সে যেই ধাঁচের বিচারের মুখোমুখি হয়, তা একই কাজের জন্য একজন সৌদি নাগরিকের, কিংবা কোনো ধনী দেশের মানুষের প্রাপ্য বিচার থেকে ভিন্ন।

যেসব অপরাধের জন্য রাজ্যটি বিদেশিদের শাস্তি দেয়, সেসব অপরাধে নিজের নাগরিকদেরকেও কি তারা একই কঠোরতায় শাস্তি দেয়?

একজন বাংলাদেশি বা ইথিওপীয় যেই মূল্য চোকায়, একই অপরাধে অভিযুক্ত একজন সৌদিকে কি কখনো সেই মূল্য চোকাতে বলা হয়?

সৌদি রাষ্ট্র কখনো এসব প্রশ্নের জবাব উচ্চকণ্ঠে দেয় না। বরং জবাবগুলো মেলে রায়ে রায়ে; এমন বিচারে যেখানে অভিযুক্তগণ ভাষাই বোঝে না, আর যেখানে প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের পর নেমে আসে নীরবতা।

ফলাফল যেন নির্ভর করে অভিযুক্ত কী করেছে তার চেয়ে বেশি সে কে এবং কে নজর রাখছে, তার ওপর।

দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে মামলা

শুরু করা যাক কাঠগড়া দিয়ে। রিয়াদ বলছে, একটি আদালত তা'জির, অর্থাৎ বিচারকের বিবেচনাধীন দণ্ডের আওতায় ওই দুজনকে সাজা দিয়েছে, আর কারণ হিসেবে অপরাধের গুরুত্ব এবং স্থান ও কালের পবিত্রতার কথা বলেছে। তারা অপরাধটির নাম বলেনি, মসজিদটির নামও না।

কখন তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের কোনো আইনজীবী ছিল কি না, কেউ তাদের পরিবারকে জানিয়েছে কি না, তাও বলেনি।

কিছু সংবাদমাধ্যম তাদেরকে দম্পতি বলছে, কিন্তু তারা পরস্পরের বিবাহিত ছিল, এটি নিশ্চিত নয়।

ঢাকার প্রতিমন্ত্রী বলেছে, মিশনের শ্রম শাখা মামলাটিকে ব্যভিচার বলে বর্ণনা করেছে। কিন্তু এটি পরোক্ষ বিবরণ, অভিযোগপত্র নয়।

নজরুল সম্পর্কে আমরা যা জানি, তার বেশিরভাগই এসেছে তার পরিবারের কাছ থেকে। সে চার সন্তানের মধ্যে বড়, মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিল।

সৌদিতে পৌঁছানোর প্রায় আট মাস পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, আর পরিবার বলছে, সে প্রায় তিন বছর কারাগারে ছিল।

তার মা বলছেন, অভিযোগটি মিথ্যা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা এবং তার পুরোনো মাদ্রাসার প্রধান পত্রিকাটিকে বলেছে, তারা যেই তরুণকে চিনত, এই অভিযোগ তার সঙ্গে মেলে না।

আইন কী বলে

রিয়াদ যেই আইন অনুসরণের দাবি করে, এই সাজা কি তার সঙ্গে মেলে? ইসলামি ফিকহের দিকে তাকালে, মেলে না।

প্রাচীন শরিয়াহ আইনজ্ঞরা ব্যভিচারকে পরিষ্কার দণ্ডের অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে এবং দোষী সাব্যস্ত করার মানদণ্ড রেখেছে অত্যন্ত উঁচুতে: স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি, অথবা কর্মটি নিজ চোখে দেখেছে এমন চারজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী।

সামান্য সন্দেহই দণ্ডটি ঠেকাতে যথেষ্ট ছিল, আর সেই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী এসব দণ্ড কদাচিৎ কার্যকর হয়েছে। অভিযুক্তরা অবিবাহিত হলে নির্ধারিত দণ্ড ছিল ১০০ বেত্রাঘাত।

আর তারা বিবাহিত হয়ে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ালে প্রাচীন মাজহাবগুলো পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছে, তবে কেবল প্রমাণের ভিত্তিতেই। এই দুই মানদণ্ডের কোনোটি পূরণ হয়েছে, এমন কোনো ইঙ্গিত রিয়াদ দেয়নি।

তাই সে হাত বাড়িয়েছে তা'জিরের দিকে। যেসব অপরাধের জন্য ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো দণ্ড বলা নেই, সেসবের ক্ষেত্রে দণ্ডের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করার ভার বিচারকের হাতে। সাধারণত এর দণ্ড তিরস্কার থেকে শুরু করে বেত্রাঘাত বা কারাদণ্ড পর্যন্ত হয়।

যেই অপরাধে তা'জিরের ঐতিহ্য বেত্রাঘাতের বিধান দেয়, সেখান থেকে লাফ দিয়ে মৃত্যুদণ্ডে পৌঁছানো সেই ঐতিহ্যের প্রয়োগ নয়। এটি ঐতিহ্যকে উলটে ফেলা।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নথিবদ্ধ করেছে সৌদি বিচারকরা কীভাবে তা'জির ব্যবহার করে দণ্ডকে কঠোরতর করে, এমনকি যেখানে কেউ নিহত হয়নি সেখানেও। অথচ যুবরাজ প্রকাশ্যে দাবি করেছে যে, তা'জির অপরাধে রাজ্যটি মৃত্যুদণ্ড সীমিত করছে।

আর প্রকাশ্য নথিতে রিয়াদ দেখায়নি যে, সে নিজে স্বাক্ষর করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেছে, যেমন আরব মানবাধিকার সনদ, যেটি মৃত্যুদণ্ডকে কেবল সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখে এবং আইনজীবী ও দোভাষীর নিশ্চয়তা দেয়।

বৃহত্তর চিত্র

এটি একবারের ঘটনা হলে এই মামলাটির দুর্বল আইনি ভিত্তি ততটা আলোচিত হতো না। অথচ এটি একবারের ঘটনা নয়।

সৌদি আরব ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৩৫৬ জনের, ২০২৪ সালে ৩৪৫ জনের এবং ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আরও ৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বিদেশি নাগরিক।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলো, পাকিস্তান ও সিরিয়া থেকে নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়া পর্যন্ত, বেশিরভাগই গরিব বা মধ্য আয়ের, ধনী পশ্চিমা শক্তি নয়।

এসব তালিকায় বাংলাদেশের নাম কদাচিৎ দেখা যায়। আগে সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশিদের যেসব মৃত্যুদণ্ডের খবর এসেছে, সেগুলো ছিল হত্যা মামলা: ২০১১ সালে আটজন এবং ২০২৩ সালে দুজন।

সৌদি সমর্থকরা বলে, সৌদিদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর সেই দেশে শ্রমজীবীর ৭৭ শতাংশই বিদেশি। কিন্তু এর কোনোটিই আসল প্রশ্নের উত্তর নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মানুষের বিচার কীভাবে হয়।

অ্যামনেস্টি বিদেশি নাগরিকদের মামলায় পদ্ধতিগত ব্যর্থতা পেয়েছে: আইনজীবীর সুযোগ দুর্বল, কনসুলেট থেকে পাওয়া সহায়তা অপর্যাপ্ত, দোভাষী মানহীন, আর স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্যাতনের কিছু অভিযোগও রয়েছে।

পরিবারগুলো মৃত্যুদণ্ডের খবর জেনেছে অন্য বন্দিদের কাছ থেকে কিংবা গণমাধ্যম থেকে, আর নথিবদ্ধ প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেই মরদেহ আটকে রাখা হয়েছে।

নজরুলের বাবা-মা এখন শুধু একবার ছেলের মরদেহ দেখতে চাইছেন; এর বেশি কিছু নয়। এবং তাদের এই অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করা হবে বলে আশঙ্কা করার সব কারণই রয়েছে।

অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ

সৌদি আরব যেই বিদেশিদের অভিযুক্ত করে, তাদের সঙ্গে এই আচরণটিই করে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, যেই বিদেশিরা অভিযোগ করে, তাদের সঙ্গে সে কেমন আচরণ করে।

বিদেশি শ্রমিকরাই সৌদি ঘরগুলো সচল রাখে। অ্যামনেস্টির হিসাবে রাজ্যটিতে ৪০ লাখের বেশি গৃহকর্মী রয়েছে, আর তারা এখনো জাতীয় শ্রম আইনের বাইরে।

জুলাই মাসে অ্যামনেস্টি ১৯ জন ফিলিপিনো নারীর সাক্ষ্য প্রকাশ করেছে। তারা ১৪ থেকে ২১ ঘণ্টার কর্মদিবস এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ নিয়োগকর্তা বা তাদের আত্মীয়ের হাতে যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছে।

এক বছর আগে সংস্থাটি অনুরূপ অভিজ্ঞতার ৭০ জনের বেশি কেনিয়ান নারীর বিবরণ নথিবদ্ধ করেছিল।

পাসপোর্ট ব্যাপকভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, আর গৃহকর্মীরা অনুমতি ছাড়া আইনত দেশ ছাড়তে পারে না। ফলে নির্যাতনকারীর হাত থেকে বাঁচতে হলে দেশে ফেরার টিকিটের জন্য তার কাছেই হাত পাততে হয়।

বাংলাদেশি তথ্যও একই কথা বলে, আর সর্বশেষ পরিসংখ্যান এই মাসেরই। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ১,৬৮৭ জন নারী শ্রমিক বিদেশ থেকে ফিরেছে, অনেকেই নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে, আর তাদের মধ্যে ৯৭৯ জন এসেছে সৌদি আরব থেকে।

এটি শুধু বিমানবন্দরের কল্যাণ ডেস্কে নথিবদ্ধ নারীদের হিসাব, কারণ সরকারের কাছে ফেরত আসাদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।

২০২৫ সালে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচির (ওকুপ) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনিচ্ছায় ফিরে আসা নারীদের ৯৪ শতাংশ বিদেশে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আর প্রায় অর্ধেক যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছে।

খবর রয়েছে, কিছু নারী যৌন নির্যাতনের পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরেছে, আর অন্যরা ফিরেছে কফিনে।

আরও পরিসংখ্যান চিত্রটিকে স্পষ্টতর করে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বাংলাদেশে ফিরেছে। তাদের বেশিরভাগই নানা ধাঁচের নির্যাতনের অভিযোগ করেছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত এসেছে। তাদের বেশিরভাগের মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা লেখা হয়েছে, আর অধিকাংশ ঘটনাই সৌদি আরব থেকে এসেছে। এটা একটু ভেবে দেখুন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত মন্ত্রণালয়কে লেখা এক চিঠিতে জানিয়েছে যে, গড়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন শ্রমিক কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের মুখে দূতাবাসে আশ্রয় চায়।

আর নিয়োগকর্তাদের কী হয়? রিয়াদ অ্যামনেস্টিকে জানিয়েছে যে, গৃহকর্মীরা সুরক্ষিত, আর প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করা হয়।

অ্যামনেস্টি আইন প্রয়োগের তথ্য চেয়েছিল। রিয়াদ তা দেয়নি, আর অ্যামনেস্টি এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, সুরক্ষাব্যবস্থা মূলত অপর্যাপ্ত।

শ্রমিকরা সাক্ষ্য দেয়, অধিকার সংগঠনগুলো নথিবদ্ধ করে, আর রাষ্ট্র দেয় আশ্বাস, কোনো সংখ্যা নয়।

তাই রিয়াদ চাইলে আগামীকালই যেই প্রশ্নের অবসান ঘটাতে পারে, সেটি এই: কতজন সৌদি নিয়োগকর্তাকে একজন গৃহকর্মীকে ধর্ষণ বা মারধরের দায়ে অভিযুক্ত, দণ্ডিত ও শাস্তিপ্রাপ্ত করা হয়েছে?

যতদিন সে না বলছে, ততদিন চিত্রটি এমন এক ব্যবস্থার, যা মসজিদে দুজন বিদেশির বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে, অথচ নিজের ঘরে একজন বিদেশিকে নির্যাতনের দায়ে একজন নাগরিককেও শাস্তি দিয়েছে বলে দেখায়নি।

যেই রাষ্ট্র বিদেশিদের সঙ্গে কী করে তা ব্যাখ্যা করে না, আর নিজের নাগরিকরা বিদেশিদের সঙ্গে যা করে তার জন্য তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনে বলে দেখায় না, তার ওপর নিজেকে শাসন করার ভরসা রাখা যায় না। তাকে চাপ দিতে হবে।

কূটনীতির কাছে নুয়ে পড়া বিচার

একই সপ্তাহের আরেকটি মামলার কথা ভাবুন। অনোজন শিবরাসা, ২৪ বছর বয়সি এক শ্রীলঙ্কান নির্মাণশ্রমিক, ফেসবুকে নবির প্রতি অবমাননাকর একটি মন্তব্য করেছিল। আদালত তাকে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছে।

তারপর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি শরিয়ার আওতায় পরিচালনার আবেদন করে, আর ১৭ সেপ্টেম্বর একটি আপিল আদালত সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অ্যামনেস্টি এই সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারিতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তারপর শ্রীলঙ্কা চাপ দিয়েছে। তাদের রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা জড়িত হয়েছে, রাষ্ট্রদূত কারাগারে তার সঙ্গে দেখা করেছে, আর আইন বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধিদল সৌদি আরবে গেছে। শ্রীলঙ্কান কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালত সাজা বাতিল করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী সে মুক্ত নয়, আর এই রায়ের মানে এও নয় যে, মামলা শেষ। তবে গতিপথ স্পষ্ট: পাঁচ বছর, তারপর মৃত্যুদণ্ড, তারপর বাতিল, সবই কয়েক মাসের মধ্যে। শেষ দোলাটি এসেছে আইনের কোনো পরিবর্তন থেকে নয়, বরং সামনে এসে দাঁড়ানো একটি সরকারের কাছ থেকে।

যেই ব্যবস্থা কূটনীতির কাছে নুয়ে পড়ে, সেই ব্যবস্থা আইন প্রয়োগ করছে না। সে প্রয়োগ করছে প্রভাব। কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে যদি বিচার বদলে যায়, তাহলে সেই বিচার সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ এখানে হাজির হয়নি। সরকারি ভাষ্যে, সে জানতই না।

জেদ্দায়, যেখানে বাংলাদেশের কনসুলেট রয়েছে, খবর অনুযায়ী একটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার বিচার কয়েক মাস ধরে চলেছে, আর ঢাকা বলছে, কেউ তাকে জানায়নি। কর্মকর্তারা এখন জানতে চাইছে, ওই দুজনের পক্ষে কাজ করা কেউ কেন কখনো কনসুলেট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করেনি।

অথচ নজরুলের পরিবার বলছে, তারা এক মাসের মধ্যেই তার গ্রেপ্তারের কথা জেনেছে।

ঢাকা যদি সত্য বলে, তাহলে হয় সৌদি আরব আমাদের কনসুলেট থেকে একটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলা লুকিয়েছে, নয়তো এটি এমন একটি মামলা যার কথা নজরুলের পরিবার জানত, অথচ যা নিয়ে কাজ করার জন্য বেতন পাওয়া মানুষদের কাছে তা কখনোই পৌঁছায়নি।

দুটিই ব্যর্থতা, আর এর মধ্যে শুধু একটিই আমাদের শোধরানোর দায়িত্ব।

কনসুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের অধীনে রিয়াদকে আটক বিদেশিদের তাদের কনসুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকারের কথা জানাতে হবে এবং কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্য করতে হবে; ঢাকার কাছে এই তথ্যটি রয়েছে পাওনা।

কিন্তু যেই সরকার বলতে পারে না তার নাগরিকরা কোথায় বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে, তার দর কষাকষির কোনো শক্তিই নেই, আর রিয়াদ তা জানে।

পরে ঢাকার সাড়াও তেমন ভালো ছিল না: একটি কূটনৈতিক পত্র, কয়েক দিন পরেও যার কোনো জবাব আসেনি, আর একজন প্রতিমন্ত্রী মামলাটিকে "আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা" বলেছে, এবং একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিজস্ব আইনি কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করেছে। শিক্ষাটি রিয়াদের।

যেই দর কষাকষির শক্তি বাংলাদেশ উপেক্ষা করে

বাংলাদেশের কাছে যতটা শক্তি রয়েছে, সে ব্যবহার করে তার চেয়ে কম। সৌদি আরবে ৩৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করে, যা বিশ্বের যেকোনো স্থানে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংখ্যা, আর গত অর্থবছরে তারা দেশে পাঠিয়েছে ৫৮৫ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ।

গত বছর সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে গেছে, যা কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া মোট মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

অন্যদিকে সৌদি আরব চলে বিদেশি শ্রমে। প্রবাসীরা তার কর্মীবাহিনীর তিন-চতুর্থাংশের বেশি, আর গড়ে তারা সৌদি কর্মীদের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মজুরি পায়। রাজ্যটির কাফালা (পৃষ্ঠপোষকতা) ব্যবস্থা ১ কোটি ৩০ লাখ অভিবাসী শ্রমিককে তাদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে বেঁধে রাখে।

এই নির্ভরতা পারস্পরিক। এই শ্রমিকদেরকে রিয়াদের ততটাই প্রয়োজন, যতটা তাদের পরিবারগুলোর প্রয়োজন মজুরির। ঢাকা সৌদি শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকারকে অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য করে। অথচ এটি একটি বাণিজ্য, আর সকল বাণিজ্যেরই শর্ত থাকে।

অন্যরা শর্ত দিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে রিয়াদের সঙ্গে নিজের চুক্তি সই করার আগেই ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন নির্যাতনের অভিযোগে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল।

প্রবাসী আয়ের মানবিক মূল্য

ন্যায়বিচার এখানে কেমন হতো? যেই দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে, তাদেরকে সৌদি আরব ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তবে সে হয়তো একটি উত্তর দিতে পারে।

রিয়াদের উচিৎ রায় প্রকাশ করা, অভিযোগের নাম বলা, ঢাকার কূটনৈতিক পত্রের উত্তর দেওয়া, আর মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অভিযোগের মুখোমুখি প্রতিটি বিদেশিকে আগেই, পরে নয়, একজন আইনজীবী, একজন দোভাষী ও তার কনসুলেটের সহায়তা দেওয়া।

যেই মানুষেরা তার ঘর পরিষ্কার করে, তাদেরকে নির্যাতনের দায়ে সে কতজন নিয়োগকর্তাকে শাস্তি দিয়েছে, তা বিশ্বকে জানানো উচিৎ।

ঢাকার উচিৎ এটিকে শিক্ষা বলা বন্ধ করা, সৌদি হেফাজতে থাকা নিজের নাগরিকদের হিসাব রাখা, আর ৩৫ লাখ শ্রমিক তাকে যেই দর কষাকষির শক্তি দিয়েছে, তা কাজে লাগানো।

এই লেখার প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ রয়েছে। নজরুলের বাবা ২৪ বছর সৌদি আরবে কাজ করে ধনী না হয়েই দেশে ফিরেছেন। বড় ছেলেকে মক্কায় পাঠাতে তিনি আত্মীয়দের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা ধার করেছেন।

সুইটি আখতারের বাবা, টাঙ্গাইলের এক দিনমজুর, ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে ছোট মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। তারা দুজন গ্রেপ্তার হওয়ার সময়ও ঋণ শোধ হয়নি।

রিয়াদ তাদের জীবনকে ফেলনা ভেবেছে। ঢাকা তাদের মৃত্যুকে শিক্ষা ভেবেছে। কেউই তাদেরকে মানুষ ভাবেনি।

আজ রাতে কোথাও আরেকজন বাংলাদেশি পুরুষ এমন এক দেশে কাজের একটি পালা শেষ করছে, যেই পালা সে বেছে নেয়নি, আর যেই দেশ তার নামটুকু জানার প্রয়োজন বোধ করেনি।

তার হাতে যা পয়সা থাকে, তা যায় ওষুধ লাগে এমন মায়ের কাছে, বিয়ে দিতে হবে এমন বোনের কাছে, স্কুলের শিক্ষামাশুল লাগে এমন সন্তানের কাছে।

আজ রাতে কোথাও একজন নারী তালাবদ্ধ এক ঘরে কাজ করছে, তার ফোন নিয়োগকর্তার হাতে, আর সে চুক্তি শেষ হওয়ার দিন গুনছে।

আমরা তাদেরকে "রেমিট্যান্স যোদ্ধা" বলি, আর এই উপাধি তারা অর্জন করেছে। তাদের অর্থ লাখ লাখ পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে শক্ত করে রেখেছে। তারা দুটি দেশকে পিঠে বয়ে বেড়াচ্ছে।

তারা অনুগ্রহ চাইছে না। তারা চাইছে এমন এক ব্যবস্থার কাছে দৃশ্যমান হতে, যেই ব্যবস্থা শুধু তাদের পাসপোর্টটুকুই দেখে।

কে নজর রাখছে, তার ওপর নির্ভর করে যেই বিচার, তা বিচারই নয়। তাই আসুন, আমরা নজর রাখতে শুরু করি।

মো. আবরার গালিব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষার্থী। তার লেখার আগ্রহের বিষয় রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বিষয় এবং মানবাধিকার। তার সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানা: [email protected]

Md. Abrar Galib Md. Abrar Galib is a student of Economics at the University of Chittagong. His writing interests include politics, governance, economic affairs, and human rights. He can be reached at [email protected].