যেভাবে কৃষক তার স্বাধীনতা হারাল

এই কৃষি আগ্রাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পথ আমাদের একেবারে অজানা নয়। কৃষি বাঁচাতে হলে কৃষকের হারিয়ে যাওয়া চিরায়ত প্রজ্ঞাকে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

Oct 11, 2026 - 12:17
যেভাবে কৃষক তার স্বাধীনতা হারাল
Photo Credit: Shutterstock

নানা কাজের সূত্রে গত কয়েক মাস ধরে রংপুরের কোলকোন্দ চরের পথেঘাটে আর মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সবুজ মাঠের বুক চিরে চলে যাওয়া পথ ধরে এগোতে এগোতে নাকে এসে ঝাপটা মারে ঝাঁঝালো রাসায়নিক গন্ধ।

চোখ জুড়ানো দৃশ্যের আশায় ফসলের মাঠে তাকালেই চোখে পড়ে কেউ না কেউ সার আর কীটনাশক ছিটাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলে ফসলে রোগবালাই বড় বেশি, তাই রাসায়নিক ছাড়া উপায় নেই। এতে যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না, সেটাই তাদের বিশ্বাস।

এই সহজসরল কৃষকদেরকে আসলে কে ঠকাচ্ছে?

একটু পেছনে ফিরে তাকালেই বোঝা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলের চাষাবাদের সঙ্গে এখনকার ব্যবস্থার কোনো মিলই আর অবশিষ্ট নেই। জমির দলিল হয়তো কৃষকের নিজের বাক্সেই যত্নে রাখা আছে। অথচ সেই জমিতে সে কী বুনবে, পোকা দমনে কী ছিটাবে -- তার ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

এক সময়ে কৃষক নিজের গোলায় তুলে রাখা বীজ নিয়ে মাঠে নামত; আজ সে ছোটে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিতরণকারীদের দোকানে। নিজের জমিতে স্বাধীন কৃষক আজ কার্যত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে জিম্মি।

সংকর বীজ, রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের এই দুষ্টচক্র কৃষিকে নতুন এক পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে।

বেশি দিন আগের কথা নয়, আমাদের পূর্বপুরুষদের চাষাবাদ ছিল পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর। কৃষকের গোয়াল ছিল গরুতে ভরা, গোলা ছিল ধানে ভরা।

গোবর, কচুরিপানা, ছাই আর সবুজ পাতা জমিতে প্রাকৃতিক সার হিসেবে দেওয়া হতো। কেঁচো ও উপকারী অণুজীব মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে তার উর্বরতা বাড়াত। নিমপাতার মিশ্রণ বা ছাই দিয়ে পোকা দমন করা হতো।

মাটির পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে এক ফসলের ফাঁকে আরেক ফসল বোনা হতো। পুরো কৃষিব্যবস্থাই ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এক চক্র। বাইরে থেকে কিছু কেনার জন্য কৃষকের প্রায় কোনো খরচই ছিল না।

কৃষকের জ্ঞানই ছিল তার সবচেয়ে বড় পুঁজি। আধুনিকায়নের নামে সেই চিরায়ত প্রজ্ঞাকে অচল বলে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একসময় কৃষকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার বীজতলা। দেশি বীজের নিজস্ব প্রাণশক্তি ছিল। ফসল তোলার পর সবচেয়ে পুষ্ট অংশটুকু আগামী মৌসুমের জন্য তুলে রাখা হতো। বীজ সংরক্ষণের কয়েক শতকের পুরোনো এই জ্ঞান ও সংস্কৃতি আজ প্রায় বিলুপ্ত।

সেই জায়গার পুরো দখল এখন সংকর বীজের হাতে। এই সংকর ফসল থেকে রাখা বীজ পরের প্রজন্মেই তেজ হারায়।

ফলন এতটাই কমে যায় যে, পুনরায় বোনার জন্য তা কার্যত অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে প্রতি মৌসুমেই চড়া দামে নতুন বীজ কেনে। বীজ সংরক্ষণই ছিল কৃষকের স্বনির্ভরতার প্রধান চাবিকাঠি। সেই চাবি এখন কোম্পানিচক্রের হাতে তালাবন্দী।

বীজ এখন নিছকই বাজারনির্ভর পণ্য। এই সুযোগে হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা বীজের বাজার পুরোপুরি একচেটিয়া দখল করে নিয়েছে।

আধুনিক সংকর বীজের সঙ্গে আসে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিপুল চাহিদা। সার পাওয়ার জন্য কত অনুনয়-বিনয় আর দেনদরবার করা হয়, চরের এক নারী সেকথাও আমাকে জানালেন। পাশের এলাকায় সারের সংকট তো মারামারি পর্যন্ত গড়িয়েছে। কথাটা বলতে বলতে তিনি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

পূর্বপুরুষদের আমলের প্রাণবন্ত মাটি আজ রাসায়নিকে আসক্ত। মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম উপায়ে ফলন বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া ধরিত্রীর প্রাণরস শুষে নিচ্ছে। দেশি জাতের ফসলের রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা ছিল। অথচ সংকর ফসল পোকামাকড়ের আক্রমণে ভীষণ ভঙ্গুর।

ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল ও বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে। প্রান্তিক কৃষকদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এসব রাসায়নিক ছিটানোর সময় ন্যূনতম সুরক্ষাব্যবস্থাও তাদের প্রায়ই থাকে না।

এই বিষাক্ত সংস্পর্শের কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ শুরু হলেই মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমতে থাকে।

একই ফলন ধরে রাখতে প্রতি মৌসুমেই প্রয়োগের মাত্রা বাড়ানো হয়। মাটিকে এই বিষাক্ত শৃঙ্খলে আটকে ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে, আর প্রান্তিক কৃষক নিঃস্ব হচ্ছে।

কৃষকের উৎপাদন খরচ আজ আকাশছোঁয়া। যেখানে চাষাবাদ পুরোপুরি ঘরের গোবর আর গোলার বীজের ওপর নির্ভর করত, সেখানে প্রতিটি ধাপেই এখন নগদ টাকা লাগে।

একদিকে বীজের দাম বাড়ছে; অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের খরচ কৃষকের নাগালের বহু বাইরে চলে যাচ্ছে। বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষক খোলা মাঠে অক্লান্ত খেটে যায় বজ্রপাতের মতো প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই। তবুও মাথার ওপর ঋণের খড়্গ ঝুলে থাকে।

দিনশেষে ফসল বাজারে উঠলে কৃষক ন্যায্য দাম পায় না। ফসল উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা নেয় কৃষকই।

অথচ মুনাফার সিংহভাগ অনায়াসে চলে যায় কোম্পানি আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। নিজের জমিতে ঘাম ঝরিয়েও কৃষকের প্রকৃত আয় কেবল কমছেই। হাজার হাজার কৃষক দুর্ভেদ্য ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।
স্বাধীন কৃষক ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোর কৃষিদাসে পরিণত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এই পরাধীনতার সংকটকে আরও গভীর করছে। খরা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা নদীবেষ্টিত চর এলাকায় বালু জমার মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংকর ফসল সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। অথচ আমাদের দেশি জাতের ফসলের প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি।

প্রবল বন্যা বা খরায় টিকে থাকতে পারে, এমন শত শত স্থানীয় জাত আমাদের ছিল। কোম্পানির বীজের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আমরা সেই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হারিয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তনকে সুবিধাজনক অজুহাত বানিয়ে সংস্থাগুলো এখন নতুন মোড়কে "জলবায়ু সহনক্ষম" বীজ নিয়ে আসছে।

কৃষকের সংকটকে তারা ব্যবসার লাভজনক নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কৃষকের চরম অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এ যেন এক নিপুণ বাণিজ্য।

এই কৃষি আগ্রাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পথ আমাদের একেবারে অজানা নয়। কৃষি বাঁচাতে হলে কৃষকের হারিয়ে যাওয়া চিরায়ত প্রজ্ঞাকে ফিরিয়ে আনা জরুরি। গ্রামে গ্রামে সমাজভিত্তিক বীজভান্ডার গড়ে তুলে দেশি বীজের জাত সংরক্ষণ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রাসায়নিক বিষের বদলে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের চর্চা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা উচিত। মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে জৈব সারের ওপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের কৃষির একেবারে শিকড়টুকু বাঁচাতে নতুন করে জেগে ওঠার সময় এসেছে।

কৃষকের স্বাধীনতা কেবল ফসলের ভালো দাম পাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। জমির মালিক হলেই কৃষক স্বাধীন হয় না, যদি না বীজের ওপর তার নিরঙ্কুশ অধিকার থাকে।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেঁধে দেওয়া কঠোর কাঠামোর মধ্যে কৃষকের খাদ্যসার্বভৌমত্ব কখনোই নিশ্চিত হতে পারে না।

কৃষিকে বাজারনির্ভর এই নব্য উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীন করে প্রকৃত স্বনির্ভরতায় ফিরিয়ে নেওয়ার ঠিক এখনই সময়।

এএল শরিয়া একজন কলামলেখক, পরিবেশকর্মী এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী।