অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশকে যা দিল
ড. ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচল কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেননি। তাঁরা দায়িত্ব নিয়েছিলেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপের। তারপর শুরু হয় পুনর্গঠন।
বাংলাদেশ এমন এক কাজ করে ফেলেছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। অন্তত এক দশকের বেশি সময় পর গত ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হলো দেশের প্রথম প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক একটি জাতীয় নির্বাচন, যেখানে হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে লাখো মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বহু নির্বাচক একটি অর্থবহ ভোট দিতে সক্ষম হয়েছে।
এই নির্বাচন হওয়াটাই ছিল বড় একটি ঘটনা। নির্ধারিত সময়সূচি মেনে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া, পর্যবেক্ষক ও নাগরিকদের কাছে তা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া -- এগুলো কোনো নিছক ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল ১৮ মাসের কাজের ফল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের কাজ ছিল শুধু প্রশাসন চালানো নয়, বরং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে দেশকে ফেরানো। এই প্রেক্ষাপটটি ভুলে গেলে সকল বিশ্লেষণ ভোঁতা হয়ে যাবে।
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মুখে, যেখানে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যন। তখন বাংলাদেশ কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই ছিল না; দেশটি তখন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন পতনের মুখে ছিল।
পুলিশের বড় অংশ তাদের কর্ম ছেড়ে ভেগে যায় -- বিভিন্ন জেলায় ঘটিত হয়েছে সহিংসতা। রাজনৈতিকভাবে আদায় করা ঋণের মাধ্যমে জমে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে যায় ব্যাংকিং খাত। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা -- সবই ১৫ বছর ধরে একটি দলের স্বার্থে কাঠামোগতভাবে অধীনস্থ হয়ে গিয়েছিল।
ড. ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচল কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেননি। তাঁরা দায়িত্ব নিয়েছিলেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপের। তারপর শুরু হয় পুনর্গঠন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ ছিল সংস্কার প্রক্রিয়া। সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ কর্ম, গণমাধ্যম, শ্রম, নারীর অধিকারসহ নানা খাতে ১১টি কমিশন গঠন করা হয়। তাদের সুপারিশ একত্রিত করে সাত মাসব্যাপী জাতীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত রাজনৈতিক সংলাপ হয়। ফল? জুলাই সনদ -- ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব -- প্রায় দুই ডজন দলের সমর্থন।
দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সমঝোতাবিহীন শূন্য-সম ক্ষমতার লড়াইয়ে অভ্যস্ত সংস্কৃতিতে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী বহুদলীয় আলোচনার নজির সাম্প্রতিক কালে নেই বললেই চলে। সনদটি নিখুঁত নয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনে বাস্তব ঐকমত্য তৈরির প্রচেষ্টাটি ছিল অকৃত্রিম, ছিল বস্তুনির্ভর।
নির্বাচন ব্যবস্থাও নতুন করে সাজানো হয় -- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়; প্রথমবারের মতো ডাকযোগে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধিদলসহ প্রায় ৫০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিককে অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের দাবি হচ্ছে নির্বাচনের দিন নির্বাচকদের উপস্থিতি ছিল ৬০ শতাংশের বেশি। গত তিনটি নির্বাচনের তুলনায় এটি ছিল গুণগত পরিবর্তন।
অর্থনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রটি ছিল এক কঠিন পরীক্ষার সামিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশের মূল্যস্ফীতি কমে আসে, যদিও তা সরকারের লক্ষ্য ছাড়িয়ে যায় এবং গৃহস্থালি ব্যয়ে চাপ বজায় রাখে। তবে সুদের বিনিময় হারের সংস্কার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত স্থিতিশীল করে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করে। ইউনুস সরকার আগস্ট মাসে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। নির্বাচনের তিন দিন আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে শুল্ক কমে আসে ১৯ শতাংশে। কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানিতে শূন্য-শুল্ক সুবিধা নির্ধারিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের চুক্তি চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদন করা হয় যার ফলে সেই দেশে বাংলাদেশের হাজারো পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চে বেইজিং সফরে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়; পাশাপাশি নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার অঙ্গীকার পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখা বাংলাদেশ আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসে। এটাও কম অর্জন নয়।
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই সরকার জোরপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করে, যা আগের সরকার করেনি। তদন্ত কমিশনে হাসিনা আমলের ১,৬০০-র বেশি গুমের অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের পর প্রথমবার জাতীয় বাজেট সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
কিন্তু কিছু ব্যর্থতা ছিল যা একেবারেই উল্লেখযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা ছিল নড়বড়ে, সাংবাদিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির ভার নারীদের ওপর বেশি পড়ে এবং সংখ্যালঘু অধিকার প্রশ্নে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তরুণ বেকারত্ব উচ্চই থেকে যায়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি আনেনি।
এসব উপেক্ষা করা যাবে না, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চরিত্রটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদেরকে স্থায়ী করার চেষ্টা করেনি। ড. ইউনূস তখন ৮৪ বছর বয়সী যখন তিনি ছাত্রনেতাদের আহ্বানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেন এবং যা তিনি কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে করেননি। তিনি মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন, আগাম তারিখ ঘোষণা করেন, নির্বাচন দেন এবং সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেন।
যে অঞ্চলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাংবিধানিক কৌশল ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, সেখানে নিজের উত্তরসূরি তৈরির যন্ত্রপাতি বানিয়ে সরে দাঁড়ানোটা একটি বিরল ঘটনা।
এখন নতুন একটি অধ্যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুগ শেষ। নির্বাচিত সরকারের সময় শুরু। পরবর্তী সংসদে যে জোট গঠিত হবে, তাদের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ। নাগরিক সমাজের সতর্কতা নির্ধারণ করবে সংস্কারের গতি। জুলাই সনদ, পুনর্গঠিত নির্বাচন কাঠামো, পুনরুদ্ধার হওয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক -- এগুলো চূড়ান্ত অর্জন নয়। এগুলো সম্ভাবনা। অনেকের কাছে এটি এক অস্বাভাবিক অধ্যায়ের সমাপ্তি -- নাগরিক সমাজ থেকে উঠে আসা এক নোবেলজয়ীকে দিয়ে জাতীয় পুনর্গঠন।
ড. ইউনূস নিখুঁত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর দিকনির্দেশ ছিল জবাবদিহিতা, ঐকমত্য ও জুলাই বিপ্লবের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের দিকে। তিনি ও তাঁর দল একটি ভাঙা রাষ্ট্র নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সেটার ভিত্তি মেরামত করেছেন যা অসম্পূর্ণ হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন দিয়েছেন, বহুদলীয় সংস্কার ঐকমত্য গড়েছেন, অস্থির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
এখন সামনে আরও বড় কাজ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সবে শুরু -- সংস্কারের বড় অংশ আংশিক বাস্তবায়িত। সমাজ এখনও স্বৈরশাসন ও বিপ্লবের আত্মিক আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে। পরিবেশগত সংকট, অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক উত্তেজনা -- সব পরস্পর সংযুক্ত।
বহুত্ববাদ ও জবাবদিহির পরিসর বাড়বে না সঙ্কুচিত হবে, তা নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়ন ও নাগরিক সতর্কতার ওপর।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যেই সাহস রাস্তায় দেখা গিয়েছিল, তা এবার ব্যালট বাক্সে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সেই শক্তিকে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দিতে সময় লাগে।
এখন দায়িত্ব নতুন সরকারের, নাগরিক সমাজের -- আমাদের সবার। নির্বাচন ও গণভোট দেশের শাসন ব্যবস্থার কিছুটা প্রক্রিয়াগত বৈধতা ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দৈনন্দিন শাসনে সেই বৈধতা প্রোথিত করাই কঠিন কাজ। জুলাইয়ের শহীদদের ত্যাগ যাতে বিফলে না যায়, তা নিশ্চিত করার দায় সবার। বাংলাদেশ মোড় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন পথ নির্ধারণ করবো আমরা।