ড. ইউনূস কোথায় ঠিক ছিলেন, আর কোথায় ছিলেন না
বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টাকে বাংলাদেশ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে যখন দেশের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। সরকারে তার রেকর্ড, অনুমানযোগ্যভাবে, মিশ্র। এর চেয়ে বেশি আশা করা কি ন্যায্য ছিল?
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর যেই অন্তর্বর্তীকালীন, প্রায় সংবিধান বহির্ভূত প্রশাসনের দায়িত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিয়েছিলেন, সেটি ছিল প্রায় হার নিশ্চিত এমন এক বাস্তবতা। উপদেষ্টা পরিষদ এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের উত্তরাধিকার পেয়েছিল, যা কার্যত অস্তিত্বহীন এবং অচল ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল চরম অর্থনৈতিক সংকট। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য যেই নীতিগত হাতিয়ারের ও প্রয়োগক্ষমতার দরকার ছিল, সেগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় করা যায়নি – কারণ, সেসব প্রয়োগ করার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই ভেঙে পড়েছিল পতিত আওয়ামী লীগ শাসনে।
একই সঙ্গে ছিল একটি মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত সমাজ। রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় একটি অংশ – আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সংসদ সদস্য, আমলা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এমনকি জাতীয় মসজিদের শীর্ষ দায়িত্বশীলরাও – ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ানোর ফলে দেশ ছেড়ে পালান বা আত্মগোপনে যান।
এই পরিস্থিতিই ছিল বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার জন্য ‘গ্রাউন্ড জিরো’। ড. ইউনূসের গত ১৮ মাসের কার্যকারিতা বিচার করতে হলে এই প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা অসৎ হবে। ড. ইউনূসের ক্ষমতার উৎস ছিল একাধিক: ১) ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান ও তার নেতৃত্ব; ২) আওয়ামী লীগ বিরোধী দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত; ৩) সশস্ত্র বাহিনী।
এই তিন শক্তিকেন্দ্রের সমর্থনে তিনি তিনটি অগ্রাধিকার ঘোষণা করেন – সংবিধান সংস্কার, আওয়ামী লীগ শাসনে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এই নির্বাচনই তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে, যার প্রস্তুতি নিখুঁত না হলেও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। বড় কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটলে বাংলাদেশ ভোট দিতে প্রস্তুত, আর ড. ইউনূসও ক্ষমতা হস্তান্তর করে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বটি শেষ করে সরে যেতে আগ্রহী।
নির্বাচনটির বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে সেটার মূল মানদণ্ড – উচ্চ ভোটার উপস্থিতি, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ, ফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, এবং কারও পক্ষ থেকে বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ না থাকা। এই মানদণ্ড পূরণ হলেই বলা যাবে যে গত ১৫ বছর ধরে যেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বাংলাদেশ পায়নি, সেটি অন্তত একবার পাওয়া গেছে।
সংস্কার
সংবিধান সংস্কারে ইউনূস সরকারের উদ্যোগ বিষয়গতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রক্রিয়াগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। জুলাই সনদ তৈরির পথে যে পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা প্রয়োজনীয় মাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। আলোচনার কেন্দ্র ছিল মূলত রাজনৈতিক দলগুলো। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ – সবার প্রভাব ছিল সীমিত। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কার্যত অনুপস্থিত ছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায়।
এর ওপর ভোটারদের সামনে যে গণভোটের প্রশ্ন রাখা হয়েছে, তা এতটাই কারিগরি ও জটিল যে মানুষ ঠিক কী অনুমোদন দিচ্ছে, সেটাই অস্পষ্ট থেকে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। তবুও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে গেছে। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের বেশিরভাগ প্রতিবেদন ছিল যুক্তিসংগত। কেন সেগুলোর অনেকটাই পরে আড়ালে চলে গেল, তা আজও পরিষ্কার নয়। কিছু সুপারিশ নীরবে কাগজে গৃহীত হয়েছে, আবার গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এসেছে।
দলগুলো, যারা ভবিষ্যতে সরকার ও বিরোধী দলে বসবে, তারা খোলাখুলি দরকষাকষি করেছে এবং একটি যৌথ সংস্কার প্যাকেজে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে কয়েক দশকে এমন সমঝোতা দেখা যায়নি।
প্রক্রিয়াটি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রকাশ্যে আলোচনা ও আপসের টেবিলে আনাই ছিল একটি গণতান্ত্রিক অর্জন। এই জায়গায় ড. ইউনূস একটি সম্মানজনক নম্বর পান।
বিচার
বিচারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, তবে ঘাটতি স্পষ্ট। গণহত্যার মামলায় বিচার শুরু হয়েছে; হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠরা দণ্ডিত হয়েছেন। কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কি না – এই প্রশ্ন রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনা একেবারে অমূলক নয়।
বিচার বিভাগে আলাদা সচিবালয় গঠন একটি ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু পুরো বিচারব্যবস্থায় পুরনো রোগ রয়ে গেছে – শত শত আসামির নামে মামলা, গণহারে অভিযোগ, জামিনযোগ্য অপরাধেও দীর্ঘ আটক, গ্রেপ্তারের পর পরোয়ানা – আইনের চেয়ে প্রতিশোধের গন্ধ বেশি। সব মিলিয়ে বিচার প্রশ্নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফলাফল ‘পাস’ আর ‘ফেল’-এর মাঝামাঝি।
পাঁচটি ব্যর্থতা
এই পর্যায়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বগত পাঁচটি ব্যর্থতা স্পষ্ট।
এক – প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা। ড. ইউনূস ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন অতিশয় আড়ম্বরপূর্ণ ভাষায়, যা বৈশ্বিক মঞ্চে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাংলাদেশ তখন বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়ক চাইছিল। ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ জাতীয় কথা বাস্তবতার চেয়ে প্রতীকী হয়ে পড়ে।
অভিজ্ঞতা ছাড়া ছাত্রনেতাদের দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়াটা সরকার ও ছাত্র উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়েছে। এতে রাষ্ট্র যেন এনসিপি তৈরির পৃষ্ঠপোষক – এমন ধারণাও জন্ম নেয়। ড. ইউনূসের সবচেয়ে বড় শক্তিই হচ্ছে তার বক্তব্য। অথচ কথার সঙ্গে বাস্তবতার ফাঁক তার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে ফেলেছে।
দুই – গণমাধ্যমের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ। শুরুর দিকে কিছু সাক্ষাৎকার থাকলেও অধ্যাপকের নিয়মিত প্রেস সন্মেলন ও মুখোমুখি জবাবদিহিতা অনুপস্থিত ছিল। অস্থির রূপান্তরকালে নীরবতা গুজব ও বিভ্রান্তির জায়গা তৈরি করে।
তিন – স্বার্থের সংঘাত বিষয়ে উদাসীনতা। ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার – তা ন্যায়সঙ্গত হলেও দৃষ্টিগত সমস্যা তৈরি করেছে। গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও ‘থ্রি জিরো’ এজেন্ডা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে প্রচার করাটা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সীমারেখা ঝাপসা করেছে।
চার – স্বচ্ছতার ঘাটতি। উপদেষ্টা পরিষদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ না করা ছিল একটি বড় সুযোগ হারানো।
পাঁচ – ইসলামপন্থী চরমপন্থার উত্থান মোকাবিলায় ব্যর্থতা। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের পক্ষে সরকার দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়নি। নারী বিদ্বেষ, হুমকি, হামলার বিরুদ্ধে প্রতীকী ছবি তোলা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দুর্বল।
শেষ কথা
ড. ইউনূস এখনো অনেকের চোখে সৎ ও সদিচ্ছাসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের ভেতরের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে তিনি নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন – এমন ধারণা শক্ত হয়েছে।
শেষ বিচারে একটিই পরীক্ষা – বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। যদি সেটি হয়, তবে ইতিহাস ড. ইউনূসের প্রতি উদার হবে।
সবকিছু মিলিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস ‘পাস’ করবেন, তবে নম্বর বাড়বে সংশ্লিষ্ট মানদণ্ড কিছুটা শিথিল করে।
মীর আফতাবউদ্দিন আহমেদ কানাডা-ভিত্তিক একজন পাবলিক পলিসি কলামিস্ট যার বাংলাদেশি এবং কানাডিয়ান মিডিয়া এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলিতে ১৪০ টিরও বেশি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বর্তমানে টরন্টো শহরের পলিসি ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। [email protected] এই ঠিকানায় তার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রকাশিত মতামত তার নিজস্ব।
What's Your Reaction?