নারীর ক্ষেত্রে আইন যখন ব্যর্থ
নারীদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আইনকে হতে হবে স্পষ্ট সংজ্ঞাসম্পন্ন, প্রয়োগে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবে কার্যকর। কেবল আইনি সংস্কারই যথেষ্ট নয় -- প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠনও।
বাংলাদেশের আইনব্যবস্থায় সমতার প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে যথেষ্ট দৃঢ়। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করে, আর ২৮ অনুচ্ছেদ নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করে এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গুর এবং অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত।
সমস্যাটি কেবল এই নয় যে কারো ক্ষতি হওয়ার পর আইন ব্যর্থ হয়; বরং পুরোনো ও অস্পষ্ট আইন নারীদের এই নিয়েও সন্দিহান করে তোলে যে তারা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি আদৌ আইনি ভাষায় ‘ক্ষতি’ হিসেবে স্বীকৃত কি না।
বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা মূলত বিলেতি ঔপনিবেশিক আইন, ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন এবং পরবর্তী সময়ের প্রণীত আইনগুলোর এক জটিল মিশ্রণ। এই কাঠামোর বহু আইন এখনো অস্পষ্ট, যা ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ -- উভয় ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি করে। ফলে নারীদের জন্য আইনি সুরক্ষা বোঝা ও তার ওপর নির্ভর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের নারী সংস্থা অন্তত ১৯টি বৈষম্যমূলক আইনের কথা উল্লেখ করেছে, যা নারীদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। এগুলো বিচ্ছিন্ন ত্রুটি নয় -- বরং আইন কীভাবে সংজ্ঞায়িত ও প্রয়োগ করা হয়, সেই বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা, যেখানে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই আইনে “সম্মতি” স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। বাস্তবে আদালত প্রায়শই শারীরিক আঘাত বা জোরপূর্বকতার দৃশ্যমান চিহ্নের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যৌন সহিংসতা সবসময় শারীরিক চিহ্ন রেখে যায় না। ফলে বহু ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, এবং কিছু ধরনের নির্যাতন আইনের স্বীকৃতির বাইরে থেকে যায়।
এই সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন আইনের মধ্যেই ব্যতিক্রম রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৩ বছরের বেশি বয়সী কোনো মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক -- যদি সে বিবাহিত হয় -- তাহলে সেটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয় না। এতে এক অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি হয় -- যেখানে একটি শিশুকে একদিকে ‘স্ত্রী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, অন্যদিকে তার সুরক্ষা অস্বীকার করা হয়। এতে আইন ক্ষতি প্রতিরোধ না করে, বরং বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতরে সেটিকে অনুমোদন করে।
দণ্ডবিধির ৩৫৪ ও ৫০৯ ধারায় “নারীর লজ্জা ভঙ্গ” সংক্রান্ত অপরাধের কথা বলা হয়েছে। সমস্যাটি এখানে উদ্দেশ্যে নয় -- বরং ভাষায়। “লজ্জা” শব্দটি অস্পষ্ট ও বিষয়ভিত্তিক, যা অপরাধীর আচরণ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নারীর চরিত্র সম্পর্কে ধারণার দিকে নিয়ে যায়। ফলে হয়রানি ঘটলেও, অনেক নারী নিশ্চিত হতে পারেন না যে আইন এটিকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় কি না।
এই অস্পষ্টতাগুলো কেবল সুরক্ষা দুর্বল করে না -- বরং আচরণকেও প্রভাবিত করে। আইনি মানদণ্ড ও প্রমাণের শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা অভিযোগ দায়েরকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক নারী হয়রানি বা যৌন সহিংসতার ঘটনা জানাতে দ্বিধা বোধ করেন -- শুধু ভয়ের কারণে নয়, বরং সংশয়ের কারণেও।
যখন আইন স্পষ্টভাবে ক্ষতিকে সংজ্ঞায়িত করতে ব্যর্থ হয়, তখন নারীরা নিজেরাই প্রশ্ন করতে শুরু করেন -- তাদের অভিজ্ঞতা কি যথেষ্ট গুরুতর? এই প্রক্রিয়ায় তাদের আচরণ, অতীত এবং বিশ্বাসযোগ্যতাই বড় হয়ে ওঠে -- অপরাধ নয়। এর ফলে অনেকেই আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া থেকে সরে দাঁড়ান।
সীমিত সম্পদসম্পন্ন নারীদের জন্য বাধাগুলো আরও বড় -- যার মধ্যে রয়েছে অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা, সামাজিক কলঙ্ক, এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা।
একই সঙ্গে এই অস্পষ্টতা অপরাধীদেরও সুবিধা দেয়। যখন আইনি কাঠামো পরিষ্কার নয়, তখন এমন অভিজ্ঞতাগুলো কীভাবে বোঝা হবে এবং প্রতিবেদন করা হবে -- সেটিও অনির্দিষ্ট থেকে যায়।
নারীদের প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আইনকে হতে হবে স্পষ্ট সংজ্ঞাসম্পন্ন, প্রয়োগে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবে কার্যকর। কেবল আইনি সংস্কারই যথেষ্ট নয় -- প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠনও। কারণ, যে আইন নিজেই নির্ধারণ করতে পারে না কোনটি ক্ষতি -- সেই আইন কখনোই ক্ষতিগ্রস্তকে রক্ষা করতে পারে না। বরং তখন আইন সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি নয় -- অনিশ্চয়তার কাঠামো হয়ে ওঠে।
মারিয়া আফরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী।
What's Your Reaction?