এটাই কি সেই বাংলাদেশ, যেটা আমরা চেয়েছিলাম?

নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আর সংখ্যালঘু অধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই হবে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা উসকানিমূলক অভিযোগের জন্য নয়, বরং কারণ এটা নৈতিকভাবে সঠিক।

Feb 5, 2026 - 12:30
Feb 5, 2026 - 15:41
এটাই কি সেই বাংলাদেশ, যেটা আমরা চেয়েছিলাম?

দিপু চন্দ্র দাসকে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সবাইকে লজ্জায় ডুবিয়েছে।

বিদেশে বসে থাকা বাংলাদেশের সমালোচকরা অন্তত একটি বিষয়ে সঠিক। এই গণপিটুনি করে হত্যা ছিল জঘন্য, অমানবিক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এটাকে অন্য দেশে সংখ্যালঘুদের উপর হওয়া সহিংসতার সঙ্গে তুলনা করে হালকা করা যাবে না। আবার এটাও বলে দায় সারা যাবে না যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এটা কোনো “পদ্ধতিগত” সহিংসতার অংশ নয়। এসব তর্ক আর বিশ্লেষণ দিপুর আতঙ্কগ্রস্ত পরিবারকে কোনো সান্ত্বনা দেয় না; দেয় না বাংলাদেশের প্রতিটি সংখ্যালঘু মানুষকেও, যারা এখন শিউরে ওঠা সেই ভিডিওগুলো দেখেছে। এটা ছিল এক ভয়াবহ ব্যর্থতা; শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সমাজেরও।

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা দিয়ে শুরু করি। কথাটা স্পষ্ট করে বলতে হবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি হলো সংখ্যালঘু সুরক্ষা। হ্যাঁ, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যে গল্পগুলো ছড়ানো হয়েছে, তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত। বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের জন্য সেই বিভীষিকাময় নরক নয়, যেভাবে তাকে আঁকা হয়েছে। এটাও সত্য যে এই সরকার সংখ্যালঘুদের শত্রু নয়, এবং তাদের সুরক্ষার চেষ্টা যে একেবারেই করেনি, তা নয়।

কিন্তু সত্যটা হলো, এই চেষ্টা মোটেও যথেষ্ট হয়নি। নির্মম সত্য হলো, সব ত্রুটি সত্ত্বেও আগের শাসনামলের তুলনায় আজ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কম নিরাপদ। সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে, এবং এই সরকার তা মোকাবিলা করতে কিংবা দূর করতে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

যে কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাবে, ভয়টা বাস্তব। এর একটা কারণ হলো সার্বিক আইনহীনতার অনুভূতি, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোই সবচেয়ে কম সুরক্ষা পায়। তবে আরও বড় কারণ হলো, ঘৃণা আর অসহিষ্ণুতা ছড়ানো লোকদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এই সরকারের অনিচ্ছা বা অক্ষমতা, এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকারে না আনা।

যদি সত্যিই সেটা অগ্রাধিকার হতো, তাহলে দিপু চন্দ্র দাসের মতো ঘটনাই ঘটতো না। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, এটা ভালো। কিন্তু এটুকু মোটেও যথেষ্ট নয়। যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন বাংলাদেশি নাগরিককে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী যাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারকে স্বীকার করতে হবে যে গত ১৮ মাসে সংখ্যালঘু সুরক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই এমন বর্বর ঘটনা সম্ভব হয়েছে। সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, এই ধরনের সহিংসতার প্রতি শূন্য সহনশীলতা থাকবে।

দিপুর খুনিদের এমন প্রকাশ্য সাহস এল কোথা থেকে? জনসমক্ষে, ডজন ডজন মানুষ মোবাইলে ভিডিও করতে করতে তারা কীভাবে ভাবলো, তারা আইনের ঊর্ধ্বে? কীভাবে তারা বিশ্বাস করলো, তারা কোনো শাস্তি ছাড়াই একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে, তাও এমন এক অভিযোগে, যা সে নাকি বলেইনি?

কীভাবে তাদের মধ্যে এই বিকৃত ধারণা জন্মালো যে এ রকম নৃশংস হত্যা “আল্লাহর জন্য কাজ”, আর এজন্য তাদের কিছুই হবে না? কীভাবে তারা মনে করলো, নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপাতে সহিংসতা আর ভয় দেখানো বৈধ পদ্ধতি?

এখানে প্রশ্ন শুধু সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, ভয়ংকর সংখ্যক মানুষ এখন মনে করছে, ধর্মীয় বিশ্বাসের নামে কিছু করলে দেশের আইন তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই কথা আলাদা করে বলার দরকার নেই যে কোনো ধর্মই, ইসলাম তো নয়ই, ঠান্ডা মাথায় খুনকে সমর্থন করে না। যারা ইসলামের নামে এভাবে মানুষ হত্যা করে, তারা নিজেরাই চরম ধরনের ধর্মদ্রোহের অপরাধী এবং নিজেদের বিশ্বাসকেই অপমান করে।

বাংলাদেশে আমাদের দরকার আইনের শাসন। দরকার এই বোধ যে, কোনো উসকানি বা অজুহাতেই কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। একজন মানুষকে নির্যাতন করে পিটিয়ে মারা সবসময়ই ভুল, সবসময়ই অগ্রহণযোগ্য।

দিপু কোনো অপরাধই করেনি, এই সত্যটা তার হত্যাকে আরও হৃদয়বিদারক করে তোলে। কিন্তু সে যদি কিছু ভুল করেও থাকতো, তাহলেও এমন ভয়াবহভাবে তার জীবন নেওয়ার কোনো অধিকার কারও ছিল না।

আর একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দিপু ছিল একজন সংখ্যালঘু। আমাদের দেশেই, আমাদের অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের বাড়তি সুরক্ষা দরকার, কারণ তারা সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে প্রান্তিক, এবং সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে। সংখ্যালঘু বলেই তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আর সংখ্যালঘু অধিকারকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই হবে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা উসকানিমূলক অভিযোগের জন্য নয়, বরং কারণ এটা নৈতিকভাবে সঠিক।

এক সময় আমরা এটা সহজাতভাবেই বুঝতাম, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ছিল এই যে ধর্ম বা পরিচয় যাই হোক, প্রতিটি বাংলাদেশি সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। যদি আমরা সত্যিই আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের যোগ্য একটি দেশ চাই, তাহলে আবারও বুঝতে হবে, আমাদের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোর সুরক্ষা দেওয়া কোনো দয়া নয়। এটা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

সম্পাদক, কাউন্টারপয়েন্ট