বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন শুধু টিকে থাকা নয়, বরং সমৃদ্ধ হওয়া
রাজনৈতিক পরিবর্তন সুযোগের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ স্থায়ী অগ্রগতিতে পরিণত হবে কিনা, তা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো -- আর তাই আমাদের আশার সম্ভাবনা তাদের কাঁধেই নির্ভরশীল।
দুই বছর আগে, ৫ আগস্টে, বাংলাদেশ এক বিরল ঐক্যের মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেছিল। অনেকের কাছেই সেই দিনটি শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমাপ্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
যদি শুধু এই ঘটনাটিই গত দুই বছরের সবচেয়ে বড় স্মৃতি এবং সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে আমরা ঝুঁকিতে পড়ব যে যেই কারণে এত মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, তা আর কারো স্মরণে থাকবে না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র টিকে থাকাই হয়ে উঠেছিল নতুন বাস্তবতা। সাময়িকভাবে হলেও এটি কখনোই লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল না।
দীর্ঘমেয়াদে আমরা চেয়েছিলাম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহ। আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র আরও ভালোভাবে কাজ করুক।
বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিল আনুমানিক ৩.৭৮%, যা ২০২৪ সালের ৩.৬৪% থেকে বেড়েছে।
এর মধ্যে জ্বালানি সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধি, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক বন্যা -- এসব সমস্যাও অব্যাহত ছিল।
দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সাম্প্রতিক অতীতের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়েছে একের পর এক সংকট এড়িয়ে চলতে, শুধু দৈনন্দিন টিকে থাকা নিশ্চিত করতে।
এই সময়টা বাংলাদেশিরা পরবর্তী সংকটের সাথে কেবল খাপ খাইয়ে নেওয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দাবিতে ব্যয় করতে পারত।
আমরা মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে বাজেট সামলাতে পারি। আমরা বেকারত্বের মধ্য দিয়ে বেঁচে থেকেছি। আমরা জানি কোন রাস্তায় পানি জমে, আর কীভাবে তার সাথে মানিয়ে নিতে হয়।
আমরা এখনো জানি না আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে শিখেছে কিনা, নাকি তারা আমাদের দৃঢ়তাকে বিনামূল্যে ছাড়পত্র হিসেবে ধরে নিয়েছে।
ক্লান্তি পরিবর্তনের প্রেরণা জোগায় না। ক্লান্তি জোগায় স্বল্পতা মেনে নেয়াকে।
আমাদেরকে স্বল্পতা ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে হবে, এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের দৃঢ়তাকে হালকাভাবে না নেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো -- আমরা কি এমন একটি দেশ হতে পারব যা কেবল টিকে থাকে না, বরং সমৃদ্ধও হয়?
আমরা সবাই কেবল মানিয়ে নিচ্ছি, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, নীতি সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সেই একই ধরনের আলোচনা করে চলেছি, যা আমরা দুই বছর আগেও করছিলাম। আমাদের সমস্যাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়নি, শুধু আমাদের মোকাবিলার কৌশল কেবল উন্নত হয়েছে।
দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ -- এটাই আমাদের শক্তিশালী করে তোলে। আমরা বারবার প্রমাণ করেছি যে আমরা টিকে থাকতে পারি, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দৃঢ়তাকে আত্মতুষ্টির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।
আইএমএফের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্থরতার পর, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪.৭% হারে বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো -- আমাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্যাশাগুলোও কি একইভাবে পুনরুদ্ধার হচ্ছে, এবং আমরা কি নিছক টিকে থাকার ঊর্ধ্বে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করতে পারি?
বাংলাদেশ তার অস্তিত্বের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছে বাকি বিশ্বের নিম্ন প্রত্যাশার বিপরীতে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে। কিন্তু অর্থবহ অগ্রগতি প্রথমে দেশের ভেতর থেকেই শুরু হতে হবে।
সংকট পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এবং দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করার সামর্থ্যে আমাদের নিজেদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। তবেই আমরা বিশ্বকে বোঝাতে পারব যে বাংলাদেশ টিকে থাকার জন্যই এসেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন সুযোগের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ স্থায়ী অগ্রগতিতে পরিণত হবে কিনা, তা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো -- আর তাই আমাদের আশার সম্ভাবনা তাদের কাঁধেই নির্ভরশীল। আমাদের একমাত্র বিজয় কেবল একটি সরকার পতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
একটি বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী কী অর্জিত হয়েছে তার উদযাপনের হতে পারে। দ্বিতীয় বছরটি হওয়া উচিত পরিমাপের -- কী পরিবর্তিত হয়েছে তার।
শত হলেও, এই লড়াই কখনোই শুধু একটি সরকারকে ঘিরে ছিল না -- এটি ছিল একটি দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার স্বাধীনতা নিয়ে। দৃঢ়তার চেয়েও বাংলাদেশিদের আরো কিছু প্রাপ্য -- আমাদের প্রাপ্য অগ্রগতির।