নির্যাতনের স্বাভাবিকীকরণ
আইনের বাইরে, সহনশীল ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং মধ্যপন্থী কণ্ঠগুলোকে সামনে আসতে হবে, বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, এবং নৈতিক স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এই পথ সহজ নয়। এর জন্য পরিবার থেকে সাহস, রাষ্ট্র থেকে সতর্কতা, এবং নাগরিক সমাজ থেকে নিরলস চাপ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে সিএনএনের একটি ভয়াবহ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন আমাদের সামনে এক গভীর অন্ধকার বাস্তবতা তুলে ধরেছে -- একটি তথাকথিত “অনলাইন রেপ একাডেমি”, যেখানে ধর্ষণ শেখানো হয়, বাস্তব ধর্ষণের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়, এবং যা ইতোমধ্যেই ৬২ মিলিয়নেরও বেশি ভিজিট পেয়েছে। এই তথ্য আমাদেরকে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অনিবার্য মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করায়। এটি আমাদের সমষ্টিগত নৈতিক উদাসীনতার ভাঙনকে প্রকাশ করে -- এবং অজ্ঞতার অজুহাতকে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে দেয়।
এমন ঘটনার পর আমাদের থেমে যাওয়া উচিৎ এবং গভীর ও সৎ আত্মসমালোচনায় প্রবেশ করা উচিত। কিন্তু আমরা প্রায়ই সহজ পথটি বেছে নেই। আমরা এটিকে একটি দূরবর্তী বিকৃতি হিসেবে দেখি, অথবা “পশ্চিমা বিশ্বের সমস্যা” বলে এড়িয়ে যাই। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটু গভীরভাবে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে নারী, এমনকি শিশুদের প্রতিও সহিংস যৌন দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বিদেশি আমদানি নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের ভেতরেই প্রোথিত, এবং তা অস্বাভাবিক নয়, বরং উদ্বেগজনকভাবে পরিচিত।
বাংলাদেশে এই যৌন বিকৃতি প্রকাশ্য নয় -- এটি স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকানো থাকে। ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপব্যবহারের মাধ্যমে এটি সূক্ষ্মভাবে বৈধতা পায়। আর সাম্প্রতিক সময়ে, এটি ক্রমেই আমাদের অনলাইন ও জনপরিসরে প্রবেশ করে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১৪ মাসে দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে ৮০০-রও বেশি যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মার্চ মাসে সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা -- যেখানে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে তার গলা কেটে ফেলে রেখে দেওয়া হয় -- এমন ঘটনা আমাদের সমষ্টিগত বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে আমরা কি সত্যিই নাড়াচাড়া খাই, নাকি কয়েক দিনের মধ্যে সব ভুলে যাই?
এই ঘটনাগুলো কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয় -- এগুলো গভীর জাতীয় লজ্জার প্রতিফলন। এবং এগুলো কেবল ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভ বা ফাঁপা সমবেদনা দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না। এগুলো আমাদের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং আমাদের বাধ্য করে নিজেদের দিকে তাকাতে।
তবে সমস্যাটি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। এই নৃশংস ঘটনাগুলো দৃশ্যমান অংশ মাত্র, অর্থাৎ আইনের আওতায় আনা যায় এমন সরাসরি অপরাধ। কিন্তু এর আগে, অনেক আগেই, এই অপরাধগুলো জন্ম নেয় মানুষের চিন্তায় -- একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে বিকৃত ধারণাগুলো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যুক্তি দিয়ে নিজেকে বৈধতা দেয়, এবং অবশেষে আচরণে রূপ নেয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত একটি সুপ্ত বিকাশ -- যেখানে এমন বিশ্বাস তৈরি হয় যা পাপকে স্বাভাবিক করে, নির্যাতনকে ন্যায্যতা দেয়, এবং নৈতিক সীমারেখাকে ধীরে ধীরে মুছে দেয়।
সমাজ সাধারণত অপরাধ ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু যে মানসিক ও আদর্শিক ভিত্তি এই অপরাধের জন্ম দেয়, তার দিকে খুব কমই নজর দেয়। অথচ মনোবিজ্ঞান আমাদের বলে যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীরাও বিবেকহীন নয়। বরং তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস, বিকৃত মতাদর্শ, এবং গোষ্ঠীগত সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের বিবেককে অতিক্রম করতে শেখে।
এই প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় “নৈতিক বিচ্ছিন্নতা” -- যেখানে মানুষ তার ভুল কাজকে পুনর্ব্যাখ্যা করে, এবং সেটিকে গ্রহণযোগ্য, এমনকি কখনো কখনো নৈতিক বলেও মনে করতে শুরু করে। এই বিকৃতি এককভাবে তৈরি হয় না -- এটি সামাজিকভাবে গড়ে ওঠে। ধর্মের নির্বাচিত ব্যাখ্যা, প্রসঙ্গহীন উদ্ধৃতি, এবং ইচ্ছাকৃত বিকৃতি -- সব মিলিয়ে একটি ভুয়া নৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয়, যা নির্যাতনকে বৈধতার মুখোশ দেয়।
এই কারণেই সমস্যাটি কেবল আইনি নয় -- এটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক। এই ক্ষতিকর ধারণাগুলোকে প্রকাশ্যে আনতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে, এবং যুক্তি, প্রমাণ ও নৈতিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে ভেঙে দিতে হবে। আমরা ধর্ষণের ঘটনা দেখি, কিন্তু ধর্ষণের পূর্বশর্তগুলো দেখি না। আমরা দেখি না সেই প্রাতিষ্ঠানিক যৌনীকরণকে, যা এই অপরাধের মঞ্চ প্রস্তুত করে -- যেখানে বিকৃত চিন্তা, ভুল ধারণা, এবং সামাজিক অনুমোদন একসাথে কাজ করে।
এই শক্তিগুলো সরাসরি দৃশ্যমান নয়। তাই এগুলো আইনের সংজ্ঞার বাইরে থেকে যায়, এবং আদালতের আলোয় আসে না। ফলে এগুলো স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে টিকে থাকে। আরও উদ্বেগজনক হলো -- সমাজের কিছু উগ্র অংশের মধ্যে এগুলোকে উৎসাহিত করা হয়, এমনকি মহিমান্বিতও করা হয়।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ অনলাইন জগৎ। বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অন রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে বাংলাদেশে ৮৯% নারী সামাজিক মাধ্যমে যৌন হয়রানি ও অবমাননাকর যৌনীকরণের শিকার হন। যেকোনো মেয়ের ওপর যৌন সহিংসতার খবরের নিচে মন্তব্যগুলো প্রায় একই -- “সে কী করছিল?”, “কার সাথে ছিল?”, “তার পোশাক কেমন ছিল?”
এই প্রশ্নগুলো অপরাধীকে আড়াল করে এবং ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। যেন একটি কাপড়ের টুকরো নৃশংসতাকে বৈধতা দিতে পারে, কিংবা একটি কিশোরীর বয়স শিকারিকে ন্যায্যতা দিতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াশীল ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার দৃষ্টিভঙ্গি মেয়েদের ওপর একটি অদৃশ্য দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় -- মেয়েদেরকে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে পুরুষদের “অধিকারবোধ” আঘাত না পায়। প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যায় দায়মুক্ত এবং সমাজের এই মনোভাব তাদের আরও সাহসী করে তোলে।
এই মানসিকতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় বাল্যবিবাহ নিয়ে বিতর্কে। কয়েক সপ্তাহ আগে ১৬ বছর বয়সী শিশু শিল্পী সিমরিন লুবাবার বিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় -- পক্ষে ও বিপক্ষে নানা মত উঠে আসে। বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এটি অব্যাহত রয়েছে। এই বিষয়ে বিতর্ক নিজে সমস্যা নয়, কারণ বিয়ের আইনি বয়স সংস্কৃতি ও দেশের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে।
কিন্তু যে যুক্তিগুলো বাল্যবিবাহের পক্ষে দেওয়া হয়, সেগুলোই আসল উদ্বেগের জায়গা। সেগুলো আমাদের সামনে এক বিকৃত মানসিক কাঠামো উন্মোচন করে। সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তি -- বাল্যবিবাহ নাকি “নৈতিক অবক্ষয়” রোধ করে। বলা হয় যে শিশুদের তাড়াতাড়ি বিয়ে না দিলে তারা “অবাধ মেলামেশা” করবে, বিবাহপূর্ব “পাপ”-এ লিপ্ত হবে, এবং নৈতিকতা হারাবে।
এই যুক্তির অন্তর্নিহিত ধারণা হলো -- নৈতিকতা রক্ষার একমাত্র উপায় হলো একটি অপ্রাপ্তবয়স্ককে বৈধ যৌন সম্পর্কে প্রবেশ করানো। এটি নৈতিকতা নয় -- এটি গভীর বিকৃতি। নৈতিক আচরণ জোর করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আর কেউ যদি কিশোর বয়সে কোনো আচরণে লিপ্ত হয়ও, তা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যক্তিজীবনের অংশ। বিশ্বাস ও পাপ -- এগুলো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়; অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার ছাড়পত্র নয়।
ধর্ম কাউকে অন্যের ওপর জবরদস্তি করার অধিকার দেয় না এবং কাউকে অন্যের নৈতিকতার অভিভাবকও বানায় না। এটি “পাপ প্রতিরোধ” নয় -- এটি একটি কাল্পনিক পাপের ভয়ে একটি বাস্তব শিশুকে বলি দেওয়া। এটি একটি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া, যেখানে একটি শিশুর স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রাপ্তবয়স্কদের যৌন আতঙ্কের কাছে ত্যাগ করা হয়।
এমনকি এই মূল ধারণাটিও ভুল। বাল্যবিবাহ না মানেই বিবাহপূর্ব সম্পর্ক নয়। কিন্তু একটি মেয়ের প্রতিটি স্বাভাবিক কাজ -- পোশাক, কলেজে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা, এমনকি জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়াও একটি যৌন সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করা হয়। এখানেই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে -- যেই মানসিকতা বাল্যবিবাহকে বৈধতা দেয়, সেই মানসিকতাই মেয়েদেরকে অবিরাম যৌন নজরদারির বস্তুতে পরিণত করে।
একটি হিজাববিহীন ছবির নিচে মুহূর্তেই লেবেল জুড়ে দেওয়া হয়--“চরিত্রহীন”, “শাহবাগী”, “বেশ্যা”। এটি আর নৈতিকতার প্রশ্ন নয় -- এটি নৈতিকতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের যৌন দৃষ্টিতে দেখার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রক্রিয়া।
এই মানসিকতা বৃহত্তর নারীবিদ্বেষ এবং পুরুষের যৌন অধিকারবোধে পরিণত হয়। নারীদের “প্রলোভন” হিসেবে দেখা হয়, যারা পুরুষদের বিপথে নিয়ে যায়। যদি তারা নির্ধারিত পোশাক না পরে, তাহলে তাদের যৌনীকরণ, এমনকি হয়রানি বা সহিংসতাও নীরবে ন্যায্যতা পায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই “প্রাকৃতিক”, “টেস্টোস্টেরনের জৈবিক ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
ভাবুন, এটি কতটা অযৌক্তিক। একজন পুরুষ একটি কিশোরীকে দেখে কামনা অনুভব করে এবং সমস্যাটি তার নয়, মেয়েটির! তাই মেয়েদের ঢেকে দাও, সীমাবদ্ধ করো, চুপ করিয়ে দাও। তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দাও -- নইলে তারা সমাজকে “পাপে” ডুবিয়ে দেবে। কারণ সমস্যাটি পুরুষ নয় -- সমস্যাটি মেয়েদের অস্তিত্ব। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় নারীদের জন্য পর্দার বাধ্যবাধকতা জোর দিয়ে বলা হয়, কিন্তু পুরুষদের জন্য দৃষ্টি সংযমের একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয় না। এটি ধর্মীয়তা নয় -- এটি সুবিধাবাদী ভণ্ডামি।
কোনো সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ শুধুমাত্র একটি নারীর পোশাক দেখে এমন যৌন উত্তেজনায় আক্রান্ত হয় না, যা তাকে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহিংসতায় প্ররোচিত করে। আর এমন আচরণকে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি কখনোই সমর্থন করবে না, বা এর দায় নারীর ওপর চাপাবে না। তবুও বাস্তবে নারীদেরই পুরুষদের চিন্তা ও আচরণের দায় বহন করতে হয়। এতে তাদের মানুষ হিসেবে নয় -- বস্তু হিসেবে দেখা হয়।
এমনকি ছোট শিশুরাও এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রেহাই পায় না। মাদ্রাসাগুলোতে শিশু নির্যাতনের উচ্চ হার তার প্রমাণ। অথচ সমকামিতাকে “মহাপাপ” বলে আখ্যা দেওয়া সত্ত্বেও, এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে চরমপন্থীদের কোনো জোরালো অবস্থান দেখা যায় না। কারণ এটি পাপ প্রতিরোধের প্রশ্ন নয় -- এটি বিকৃতিকে বৈধতা দেওয়া এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্ন। এই জায়গাতেই শিশুকামিতা, নারীবিদ্বেষ এবং যৌনীকরণ একে অপরের সাথে মিশে যায় এবং একটি বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে নির্যাতন কেবল সম্ভবই নয়, বরং সহনীয় হয়ে ওঠে। আজ এটি ভাষায় -- কাল এটি কর্মে রূপ নেয়।
এই সূক্ষ্ম প্রকাশগুলো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা, অনলাইন হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ এবং ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে শোষণের বৈধতা -- এগুলো বিচ্ছিন্ন নৃশংসতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ এগুলো দৈনন্দিন জীবনে মিশে গিয়ে এক প্রকার মানসিকতা গড়ে তোলে, বিশ্বাস প্রভাবিত করে, এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে অপরাধ চিন্তা করা সম্ভব হয়।
প্রথমে এগুলো চরমপন্থীদের প্রান্তিক বক্তব্য হিসেবে শুরু হয় -- কিন্তু ধীরে ধীরে মূলধারায় প্রবেশ করে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ডিজিটাল পরিসরে এই চরমপন্থী কণ্ঠগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব একটি বড় সামাজিক উদ্বেগের কারণ। যখন ক্ষতিকর ধারণাগুলো জনপ্রিয়তা পায়, তখন তা এমন একটি দমনমূলক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে শিশুকামিতা, নারীবিদ্বেষ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা স্বাভাবিক বা ক্ষমাযোগ্য বলে মনে হয়।
আমরা ইতোমধ্যেই জনতার হামলা, “নৈতিক পুলিশিং”-এর নামে নারীদের ওপর আক্রমণ দেখেছি। এই ধারণাগুলো যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে এগুলো আর কেবল ধারণা থাকবে না -- এগুলো কর্ম হয়ে উঠবে, এবং পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করবে। এই সমস্যার সমাধান কেবল আইন দিয়ে সম্ভব নয়। আইন কাজের শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু চিন্তাধারা ভাঙতে পারে না।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ -- সমালোচনামূলক চিন্তার শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞানের সঠিক উপলব্ধি, এবং এমন একটি জনপরিসর যেখানে ক্ষতিকর বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়, প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। বাস্তব পরিবর্তন আসে সচেতন পদক্ষেপ থেকে। বর্তমানে সাইবার উৎপীড়ন সংক্রান্ত আইনগুলো অস্পষ্ট, দুর্বলভাবে প্রয়োগ করা হয়, এবং প্রায়ই অকার্যকর। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনে এখনও এমন ফাঁকফোকর রয়েছে, যা অপব্যবহারের সুযোগ দেয়।
প্রথম পদক্ষেপ হলো -- এই আইনগুলোকে সম্পূর্ণ স্পষ্টতা ও শূন্য সহনশীলতার ভিত্তিতে এবং কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ছাড় ব্যতিতই সংশোধন করা। বাংলাদেশে পরিচালিত সামাজিক মাধ্যমগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে এবং জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে। যেসব অ্যালগরিদম ঘৃণা ছড়ায় বা শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তথ্য যাচাইকরণ সংস্থাগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সক্রিয় করতে হবে -- বিশেষ করে ধর্মীয় ভুল তথ্য দ্রুত প্রতিরোধের জন্য। একইসাথে, অনলাইন ও অফলাইন যৌন হয়রানি, জনসমক্ষে হামলা, এবং নারীদের মানহানিকে আইনের আওতায় স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আইনের বাইরে, সহনশীল ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং মধ্যপন্থী কণ্ঠগুলোকে সামনে আসতে হবে, বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, এবং নৈতিক স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এই পথ সহজ নয়। এর জন্য পরিবার থেকে সাহস, রাষ্ট্র থেকে সতর্কতা, এবং নাগরিক সমাজ থেকে নিরলস চাপ প্রয়োজন।
একটি সমাজ, যেখানে শিশুদের যৌন বস্তুতে পরিণত করা হয়, এবং নারীদের মানুষ হিসেবে দেখা হয় না, সেই সমাজ ইতোমধ্যেই ভেতর থেকে পচতে শুরু করেছে।
নীরবতা মানে সহযোগিতা। আমরা আমাদের সন্তানদের -- মেয়ে ও ছেলে -- উভয়ের কাছেই ঋণী একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য। আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। আমরা তাদেরকএ মর্যাদা দিতে বাধ্য। নির্যাতন যেখানে শুরু হয়, সেখানেই নীরবতার শেষ হওয়া উচিত -- আমাদের পর্দায়, আমাদের রাস্তায়, আমাদের কথায়, আমাদের কাজে এবং আমাদের দৃঢ় সংকল্পে, যা আর চোখ ফিরিয়ে নেয় না।
মো: আবরার গালিব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
What's Your Reaction?