ধোঁয়া ছাড়াও কখনো আগুন জ্বলে

আধুনিক শিশু সুরক্ষা শিশুদের প্রায় বিপরীত একটি জিনিস শেখায়: তোমার শরীর তোমারই। শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয় বা অন্য যেকোনো প্রাপ্তবয়স্কের অনুচিত স্পর্শ তুমি প্রত্যাখ্যান করতে পারো। কর্তৃত্বে থাকা কারও বিরুদ্ধেও তুমি অভিযোগ জানাতে পারো। তুমি ভয় পেলে কাউকে বলতে পারো।

Sep 13, 2026 - 12:14
ধোঁয়া ছাড়াও কখনো আগুন জ্বলে
Photo Credit: Shutterstock

আমীরের মন্তব্য পড়ে অদ্ভুত একধরনের স্বস্তি পেলাম। মনে হলো, আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর অন্তত একটির সমাধান হয়ে গেছে -- মাদ্রাসার ছাত্ররা গাঁজা খায় না।

তারপর মনে পড়ল, সম্প্রতি মাদ্রাসা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যেসব অভিযোগ উঠে আসছে, সেগুলো গাঁজা বা সিগারেট নিয়ে নয়। সেগুলো শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, মামলা মীমাংসার জন্য চাপ প্রয়োগ, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগকারী শিশুটিকেই মিথ্যাবাদী বা নৈতিকভাবে সন্দেহজনক হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা নিয়ে।

তাহলে কি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক উৎকর্ষের মানদণ্ড সত্যিই এতটা নিচু যে, "আমাদের ছাত্ররা মাদক নেয় না" -- এই একটি বাক্যই তার চারিত্রিক সনদ হিসেবে কাজ করতে পারে?

ধূমপান ক্ষতিকর, নিঃসন্দেহে। মাদকও ক্ষতিকর। কিন্তু যৌন নিপীড়ন কোনো "বদভ্যাস" নয় -- এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এবং শিশু যৌন নির্যাতনকে কেবল "নৈতিক বিচ্যুতি"র ভাষায় লঘু করে দেখা যায় না। এটি একটি শিশুর শরীর, নিরাপত্তা, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও মৌলিক অধিকারের ওপর সহিংস আক্রমণ।

শিশুদের ঠোঁট পরীক্ষা করা ভালো কথা। কিন্তু তাদের শরীর নিরাপদ কি না, তা কে পরীক্ষা করছে?

সাভারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই প্রশ্নকে আরও বিচলিত করে তোলে। সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক ছাত্র ও শিক্ষকের দ্বারা সাত বছর বয়সী এক শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, এবং এ ঘটনায় দশজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।

আরও বিচলিত করার মতো বিষয় হলো, শিশুটি সাহায্যের জন্য যেসব প্রাপ্তবয়স্কের কাছে গিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ শিশুটির অসহায়ত্বেরও সুযোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই পর্যায়ে এসে "একজন খারাপ হুজুর"-এর তত্ত্ব আর যথেষ্ট থাকে না। একজন অপরাধী একটি শিশুকে নির্যাতন করতে পারে।

কিন্তু যখন একটি শিশু নির্যাতনের কথা জানানোর মতো একজনও নিরাপদ প্রাপ্তবয়স্ক খুঁজে পায় না, এবং প্রতিষ্ঠানের একাধিক স্তরে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, তখন সমস্যাটি আর নিছক কোনো ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা থাকে না। এটি হয়ে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা-ব্যবস্থার সামগ্রিক পতন।

শিশুটি তাহলে যাবে কোথায়? শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে শিক্ষককে জবাবদিহি করাবে কে? পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পরিচালকের ওপর নজরদারি করবে কে? আর প্রতিষ্ঠান নিজেই যদি অভিযোগের বিচারক, তদন্তকারী ও মধ্যস্থতাকারী -- তিনটি ভূমিকা একসঙ্গে পালন করে, তাহলে শিশুটির নিরাপত্তা আসলে কার হাতে থাকে?

কতগুলো "বিচ্ছিন্ন ঘটনা" পাশাপাশি রাখলে আমরা "প্যাটার্ন" শব্দটি ব্যবহারের অনুমতি পাব? একশটি? হাজারটি? নাকি তার আগে আমাদের যাচাই করতে হবে, অভিযুক্তদের মধ্যে কারও ঠোঁটে সিগারেট ছিল কি না?

আমাদের সামাজিক নৈতিকতা যেন এক অদ্ভুত স্তরবিন্যাস তৈরি করেছে -- গান বিপজ্জনক, সিনেমা বিপজ্জনক, একজন নারী কী পরছেন তা বিপজ্জনক, কে কার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে তা বিপজ্জনক, সিগারেটও বিপজ্জনক। স্বনিযুক্ত নৈতিক অভিভাবকদের রাডার এসব বিষয়ে অস্বাভাবিক রকম স্পর্শকাতর।

কিন্তু শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সেই একই রাডারে যেন সাময়িক প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে একটি সমাজ কয়েক মিনিটের মধ্যে জনতা জড়ো করতে পারে, অথচ সাত বছরের একটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে কীভাবে এত নীরব থাকতে পারে?

আপনি যদি নিজেকে সমাজের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তাহলে আপনার নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় প্রতিপক্ষের পাপ চিহ্নিত করার সময় নয়, বরং নিজের সম্প্রদায়ের ভেতরে অন্যায় ঘটলে তার মুখোমুখি হওয়ার সময়।

প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করা সহজ। সততা শুরু হয় তখনই, যখন আপনি নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অন্যায়ের মুখোমুখি হতে পারেন।

এগারো বছর বয়সী গর্ভবতী শিশুটির ঘটনায় আমরা এরই আরও নগ্ন এক রূপ দেখেছি।

অভিযুক্ত শিক্ষক প্রকাশ্যে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার পর আলোচনা মোড় নেয় শিশুটির বয়স, আচরণ, পোশাক, তথাকথিত "দুরন্তপনা", এমনকি সে পর্দা মানত কি না -- সেদিকে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিরুদ্ধে একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে, অথচ কীভাবে যেন সেই শিশুর "পর্দা" এসে যায় আত্মপক্ষ সমর্থনে। পিতৃতন্ত্রের এর চেয়ে নিখুঁত দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।

একটি শিশুর জন্য "ধর্ষণ-প্রতিরোধী" কোনো পোশাক হয় না, "ধর্ষণ-প্রতিরোধী" কোনো চরিত্র হয় না, "ধর্ষণ-প্রতিরোধী" কোনো ধার্মিকতাও হয় না। একটি শিশুকে যৌন নির্যাতন না করার দায় সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্তবয়স্কের; আর সেই শিশুকে নিরাপদ রাখার দায় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের।

এই কারণেই শফিকুর রহমানের বক্তব্যটিকে আমার রাজনৈতিকভাবে উদ্বেগজনক মনে হয়।

একজন জাতীয় রাজনৈতিক নেতা যখন কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ ছাড়াই একটি বিশাল ও বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ছাত্রদের সমষ্টিগতভাবে নৈতিক সনদ দিয়ে দাবি করেন যে তারা মাদক নেয় না এবং তাদের ঠোঁটে সিগারেট দেখা যায় না, তখন সেই বক্তব্য আর নিছক মাদকবিরোধী পর্যবেক্ষণ থাকে না।

এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক পরিচয় নির্মাণ করে -- মাদ্রাসা-পরিচয় নিজেই হয়ে ওঠে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

সমস্যা হলো, একটি প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে দিলে, তার ভেতরকার অপরাধ নিয়ে আলোচনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগকে দ্রুতই পুরো পরিচয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে চিত্রিত করা যায়।

এভাবেই গড়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতির ধাপ। প্রথমে: "এখানে এসব ঘটে না।" তারপর: "ঘটলেও তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।" তারপর: "অভিযোগকারী মিথ্যা বলছে।" তারপর: "আপনি মাদ্রাসার সুনাম ক্ষুণ্ণ করছেন।" শেষ পর্যন্ত শিশুটি আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়, আর প্রতিষ্ঠানের সুনাম সেই শিশুর জায়গা দখল করে নেয়।

আমি বরং উল্টো একটি নৈতিক নীতির প্রস্তাব করব: কোনো প্রতিষ্ঠান যত জোরালোভাবে নৈতিক কর্তৃত্বের দাবি করে, তার জবাবদিহিতাও ততটাই বেশি হওয়া উচিত।

কতগুলো আবাসিক মাদ্রাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালা রয়েছে? একটি শিশু কার কাছে গোপনীয় ও নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারে? অভিযোগের তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত শিক্ষককে অবিলম্বে শিশুদের নাগাল থেকে সরিয়ে রাখার প্রোটোকল কী?

স্বতন্ত্র পরিদর্শন করে কে? কর্মীদের পটভূমি যাচাই কোথায় হয়? যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অভ্যন্তরীণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে "মিটমাট" করার চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানের আইনি সীমা কতটুকু?

এগুলো শিশু সুরক্ষার প্রাথমিক প্রশ্ন। ধর্মীয় স্বাধীনতা কখনোই জবাবদিহি থেকে মুক্তির অর্থ বহন করতে পারে না।

আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা যখন "নৈতিক শিক্ষা"র কথা বলি, তখন একটি শিশু কতটা মুখস্থ করতে পারে তা নিয়েই আমাদের আগ্রহ বেশি বলে মনে হয় -- সেই শিশুর শরীরে কার প্রবেশাধিকার আছে, তা নিয়ে নয়।

অথচ যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রে নৈতিকতার প্রথম পাঠটি হওয়া উচিত অসাধারণ রকম সহজ: একটি সাত বছর বয়সী শিশুর শরীর সেই শিশুরই; শিশুর "না" প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ; শিশুর ভয় গুরুত্বপূর্ণ; শিশুর অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই শিশুর নিরাপত্তা যেকোনো প্রতিষ্ঠান, আলেম, শিক্ষক, রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় ভাবমূর্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

"মাদ্রাসার সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে" -- এই যুক্তিটিকেও উল্টোভাবে পড়া দরকার। মাদ্রাসার সমালোচনা মানেই ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ -- এই বুদ্ধিবৃত্তিক শর্টকাট নেওয়া আমাদের বন্ধ করতে হবে।

একজন চিকিৎসক অপরাধ করলে আমরা হাসপাতালের কাছে জবাবদিহি দাবি করি।

একজন স্কুলশিক্ষক অপরাধ করলে আমরা স্কুলের কাছে জবাবদিহি দাবি করি। তাহলে মাদ্রাসার কাছে একই মানদণ্ড দাবি করাটাই বা কেন ইসলামভীতি হয়ে উঠবে?

বরং একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড আরও উঁচু হওয়া উচিত, কারণ অভিভাবকেরা তার কাছে কেবল সন্তানের শিক্ষাই নয়, তাদের বিশ্বাস ও আস্থাও জমা রাখেন। আমরা যদি সত্যিই চাই মাদ্রাসা নৈতিক শিক্ষার অগ্রগতির জায়গা হয়ে উঠুক, চমৎকার। কিন্তু তাহলে সেই নৈতিক পরীক্ষা যেন ইয়াবা দিয়ে শুরু না হয়।

আমাদের আরেকটি সমস্যা আছে: আমরা প্রায় নৈতিকতা আর আনুগত্যকে সমার্থক করে ফেলেছি। যে শিশু ধূমপান করে না, প্রশ্ন করে না, মাথা নিচু রাখে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কথা মেনে চলে, তাকেই প্রায়ই "ভালো" ও "নৈতিক" শিশু বলে বর্ণনা করা হয়।

অথচ আধুনিক শিশু সুরক্ষা শিশুদের প্রায় বিপরীত একটি জিনিস শেখায়: তোমার শরীর তোমারই। শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয় বা অন্য যেকোনো প্রাপ্তবয়স্কের অনুচিত স্পর্শ তুমি প্রত্যাখ্যান করতে পারো। কর্তৃত্বে থাকা কারও বিরুদ্ধেও তুমি অভিযোগ জানাতে পারো। তুমি ভয় পেলে কাউকে বলতে পারো।

আর "হুজুর তাই বলেছেন" -- এটি কখনোই একটি শিশুকে চুপ করিয়ে দেওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে না। এই শিক্ষা ছাড়া আনুগত্য নিজেই অসহায়ত্বের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

তাই হ্যাঁ, মাদ্রাসার ছাত্ররা ইয়াবা না নিলে আমি খুশি হব। গাঁজা না খেলে আরও খুশি হব। সিগারেটও না খেলে চমৎকার।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও যদি শিশু-শিক্ষাদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মানদণ্ড এখনো হয় "আমাদের ছেলেদের ঠোঁটে সিগারেট নেই," অথচ একই আত্মবিশ্বাসে বলতে না পারি যে "আমাদের হেফাজতে থাকা প্রতিটি শিশু যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষিত," তাহলে সমস্যাটি শিশুদের নৈতিকতায় নয়। সমস্যাটি আমাদের নৈতিকতার সংজ্ঞায়।

একটি দেশের নৈতিক শিক্ষার সাফল্য শিশুদের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে মাপা যায় না। মাপতে চাইলে জিজ্ঞেস করুন, সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি সাত বছর বয়সী শিশু রাতে নিরাপদে ঘুমাতে পারে কি না।

ড. লুবনা ফেরদৌসী বিলেতে বসবাসরত একজন গবেষক ও শিক্ষাবিদ।