কিন্তু কেন তিনি চলে যাননি?

যে সংস্কৃতি নির্যাতন সহ্য করার জন্য নারীদের প্রশংসা করে, তা অনিবার্যভাবেই নির্যাতনকারী পুরুষদের জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দেয়।

Aug 17, 2026 - 13:17
কিন্তু কেন তিনি চলে যাননি?
Photo Credit: Shutterstock

একটি সহিংস দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক বাক্যগুলোর একটি প্রায়ই কোনো অপমান বা এমনকি হুমকিও নয়। এটি হলো --

"একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।"

এই আশাই নারীদেরকে বছরের পর বছর এমন এক সম্পর্কে আটকে রাখতে পারে, যেখানে ভালোবাসার জায়গা নিয়েছে ভয়, ঘনিষ্ঠতার জায়গা নিয়েছে নজরদারি, আর সহচার্যের জায়গা নিয়েছে কেবল সহ্য করে যাওয়া।

কোনো নারী যখন একটি নির্যাতনমূলক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুতরভাবে আহত হন বা নিহত হন, তখন একটি পরিচিত প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে -- "তিনি ভীত থাকলে চলে যাননি কেন?"

শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, বাস্তবে এই প্রশ্নটি প্রায়ই প্রকাশ করে দেয় যে আমরা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা সম্পর্কে কতটা কম বুঝি।

কারণ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এই নয় যে, "তিনি কেন চলে যাননি?" বরং এই যে, "কোন জিনিষগুলো তার চলে যাওয়াকে এত কঠিন, এত ব্যয়বহুল, বা এত বিপজ্জনক করে তুলেছিল?"

প্রশ্ন দুটি এক নয়।

প্রথমটি নারীর বিচারবুদ্ধিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। দ্বিতীয়টি তার চারপাশের ক্ষমতা-কাঠামোকে পরীক্ষা করে। আর নারীবাদী বিশ্লেষণ চিরকালই দ্বিতীয় প্রশ্নটি করার ওপর জোর দিয়ে এসেছে।

আমরা প্রায়ই নির্যাতনমূলক সম্পর্ক নিয়ে এমনভাবে কথা বলি, যেন তা থেকে বেরিয়ে আসা একটি ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়ার মতোই সহজ -- যাত্রা অপ্রীতিকর হলে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়াই যথেষ্ট। কিন্তু অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা সাধারণত এভাবে কাজ করে না।

নির্যাতন কেবল শরীরের ওপরই ঘটে না। এটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করে আত্মবিশ্বাসে, সামাজিক সম্পর্কে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়, নিজের প্রতি বিশ্বাসে -- এমনকি একজন মানুষের 'কোনটা স্বাভাবিক' সেই বোধের মধ্যেও।

একজন নিয়ন্ত্রণকামী সঙ্গী সাধারণত এই বলে শুরু করেন না যে, "আমি তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নেব।" নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই ভালোবাসার ভাষা গায়ে মেখে প্রবেশ করে।

"তুমি ওই বন্ধুর সাথে এত কথা বলো কেন?"

"আমি চিন্তা করি, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

"তোমার ওই চাকরিটা দরকার কেন?"

"আমি কি তোমার জন্য যথেষ্ট নই?"

"তোমার পরিবার আমাদের সংসারে বড্ড বেশি নাক গলায়।"

"তুমি তো জানোই, তুমি উসকে দিলে আমি কেমন হয়ে যাই।"

সময়ের সাথে সাথে সেই নারী হয়তো উপলব্ধি করেন যে তার বন্ধুর সংখ্যা কমে গেছে, পরিবারের সাথে যোগাযোগ কমে গেছে, অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে, এমনকি নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাও কমে গেছে।

তিনি হয়তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, সুযোগ হাতছাড়া করেছেন, আর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন সেই মানুষটির ওপরই, যাকে তিনি ভয় পান।

সবচেয়ে বিচলিত করা পর্যায়টি হয়তো তখনই আসে, যখন তিনি নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন -- "সমস্যাটা কি আমিই?" জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের শক্তি এখানেই।

সহিংসতা কেবল শারীরিক আক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে থাকতে পারে -- তিনি কার সাথে কথা বলবেন, কোথায় যাবেন, কী পরবেন, কাজ করবেন কি না, টাকা কীভাবে খরচ করবেন, কীভাবে সন্তান লালন-পালন করবেন, পরিবারের সাথে দেখা করতে পারবেন কি না, এমনকি তার গোপনীয়তার পরিমাণ কতটুকু -- এসবের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।

নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করে তখনই, যখন তা সাধারণ ব্যাপার হয়ে ওঠে।

আর সেই কাঠামোর ভেতরে কাউকে ধরে রাখার একমাত্র হাতিয়ার ভীতি নয়। অনেক সময় ভালোবাসাও।

এ কারণেই ট্রমা-বন্ধন নিয়ে আলোচনা কাজে আসতে পারে, যদিও এই শব্দটি হালকাভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। নির্যাতনমূলক সম্পর্কগুলো প্রায়ই সমানভাবে নিষ্ঠুর হয় না।

সহিংসতার পর আসতে পারে অনুশোচনা। হুমকির পর আসতে পারে কোমলতা। থাকতে পারে ক্ষমাপ্রার্থনা, প্রতিশ্রুতি, উপহার, চোখের জল, অসাধারণ স্নেহ, আর "আর কখনো এমন হবে না" -- এমন ঘোষণা।

এরপর চক্রটি আবার শুরু হয়। এই অনিশ্চয়তা মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আচরণবিজ্ঞান একটি সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকে বিরতিহীন পুরস্কার-নির্ভরতা হিসেবে বর্ণনা করে -- পুরস্কার যখন অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অনিশ্চিত হয়, তখন মানুষ পরবর্তী ইতিবাচক ফলাফলের অপেক্ষায় আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সেই নারী বোকা বলে সেই সম্পর্কে থেকে যান না। তিনি হয়তো মনস্তাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল এমন একটি ছকের মধ্যে আটকে আছেন, যেখানে কোমলতার ব্যতিক্রমী মুহূর্তগুলোকে তিনি প্রমাণ হিসেবে দেখেন যে সম্পর্কটি এখনও বাঁচানো সম্ভব।

"সে আসলে খারাপ মানুষ নয়।" "তার ওপর প্রচণ্ড চাপ যাচ্ছে।" "সে সন্তানদের ভালোবাসে।" "সে সবসময় এমন ছিল না।" "হয়তো এবার সত্যিই সে বদলে যাবে।"

এই কথাগুলো নিছক বোকামি বা অস্বীকৃতি নয়। কখনো কখনো এগুলো বেঁচে থাকার আখ্যান -- একটি অসহনীয় বাস্তবতাকে আবেগগতভাবে সহনীয় করে তোলার প্রচেষ্টা।

কিন্তু দক্ষিণ এশীয় সমাজে, আর নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশে, আরেকটি প্রতিষ্ঠান এই চক্রকে আরও দৃঢ় করে তোলে -- "সংসার বাঁচানোর" নৈতিক আদর্শ।

আমরা প্রায়ই পরিবারের অভ্যন্তরীণ মানুষগুলোর সুস্থতার চেয়ে সংসার টিকিয়ে রাখাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

নারীদের বলা হয় -- "প্রতিটি সংসারেই সমস্যা থাকে।" "পুরুষ মানুষ রাগ করেই।" "সন্তানদের কথা ভাবো।" "কোথায় যাবে তুমি?" "লোকে কী বলবে?" "আরেকটু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো।"

এখানে যা ঘটে, তা লক্ষ করার মতো। নির্যাতনের দায়ভার নীরবেই নির্যাতনকারীর কাছ থেকে সরে গিয়ে বেঁচে থাকা মানুষটির উপর গিয়ে পড়ে। স্বামীর কাছ থেকে রাগ নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করার বদলে, স্ত্রীকেই শেখানো হয় সেই রাগ সামলানোর কৌশল।

স্বামীকে তার স্ত্রীকে অপমান না করতে বলার বদলে, স্ত্রীকেই বলা হয় পাল্টা জবাব না দিতে। স্বামী কেন সহিংস হয়ে ওঠে তা জিজ্ঞেস করার বদলে, মানুষ জিজ্ঞেস করে স্ত্রী এমন কী বলেছিল যা স্বামীকে রাগিয়ে দিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত, স্বামীর নির্যাতন প্রতিরোধ করার দায়িত্বও স্ত্রীরই আবেগগত শ্রমের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে সূক্ষ্ম কৃতিত্বগুলোর একটি এটিই -- একজন নারী কেবল সহিংসতা সহ্য করেই ক্ষান্ত হন না, বরং প্রায়ই তাকে এমনভাবে অনুভব করানো হয় যে, যেই পুরুষটি তার ওপর নির্যাতন চালায় তাকে সামলাতে ব্যর্থ হওয়ার নৈতিক দায়ও তারই।

পরিবারগুলোও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আমাদের সংস্কৃতিতে বিবাহকে এখনও প্রায়ই দুই ব্যক্তির মধ্যকার নিছক একটি সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয় না -- বরং পরিবার, সুনাম, শ্রেণী-মর্যাদা, আত্মীয়তার বন্ধন, ও সম্মানবোধকে জুড়ে দেওয়া একটি সামাজিক প্রকল্প হিসেবেই দেখা হয়।

কোনো নারী যখন একটি নির্যাতনমূলক দাম্পত্য জীবন থেকে ফিরে আসেন, কিছু পরিবার কেবল একটি দুর্দশাগ্রস্ত কন্যাকেই দেখে না। তারা দেখে সামাজিক লজ্জা, আর্থিক বোঝা, সম্ভাব্য অভিভাবকত্ব-বিরোধ, আত্মীয়দের প্রশ্ন, আর তালাকের কলঙ্ক।

এভাবেই নারীর ক্ষতচিহ্নগুলো থেকে যায় "ব্যক্তিগত", অথচ তার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটিই হয়ে ওঠে প্রকাশ্য।

কী অসাধারণ এক দ্বন্দ্ব! সহিংসতাকে গণ্য করা হয় পারিবারিক বিষয় হিসেবে। কিন্তু তালাক হয়ে ওঠে সামাজিক সম্মানের প্রশ্ন। এই দ্বন্দ্বই পারিবারিক সহিংসতার প্রতি আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রস্থল।

সামাজিক শ্রেণীও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর্থিকভাবে নির্ভরশীল কোনো নারীর জন্য বাধাগুলো নির্মমভাবেই বাস্তব -- তিনি থাকবেন কোথায়? ভাড়া দেবে কে? সন্তানদের ভরণপোষণ করবে কে? আইনি সহায়তার খরচ জোগাবেন কীভাবে? পরিবার যদি তাকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করে, তখন কী হবে?

কিন্তু সমাজ বিশেষভাবে নির্মম হয়ে ওঠে যখন নারীটি শিক্ষিত বা পেশাগতভাবে সফল হন। "তিনি তো একজন ডাক্তার ছিলেন।" "তার তো চাকরি ছিল।" "তিনি তো আয় করতে পারতেন।" "তাহলে চলে যাননি কেন?"

এই যুক্তিটি ধরে নেয় যে শিক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা তৈরি করে।

তা করে না। একটি চিকিৎসা সনদ কাউকে জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। একটি পিএইচডি কখনো ট্রমা-বন্ধনকে গলিয়ে দেয় না। একটি বেতন কখনো ভয়, কলঙ্ক, অভিভাবকত্বের উদ্বেগ, পারিবারিক চাপ, গোপন অনুসরণ, আবেগগত কারসাজি, বা ক্রমবর্ধমান সহিংসতার সম্ভাবনাকে মুছে দেয় না।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একজন নারীর বিকল্পগুলোকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করতে পারে। কিন্তু এটি নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো জাদুকরী টিকা নয়।

আরেকটি কঠিন সত্য বোঝা প্রয়োজন -- সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যাওয়ার কর্মটাই নিজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিচ্ছেদের মুহূর্তটি সব সময়ে নিরাপদ মুহূর্ত নয়। জবরদস্তিমূলক সম্পর্কে দখলদারিত্বই প্রায়ই নির্যাতনের কেন্দ্রে অবস্থান করে।

অন্তর্নিহিত বার্তাটি হলো -- "তুমি আমার সম্পত্তি।" কোনো নারী যখন চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি কেবল একটি সম্পর্কই শেষ করেন না। তিনি নির্যাতনকারীর কর্তৃত্বকেও প্রত্যাখ্যান করেন। কিছু নির্যাতনকারীর কাছে, নিয়ন্ত্রণ হারানোর সেই উপলব্ধি সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ কারণেই নারীদের কেবল "সাহসী হও, চলে যাও" বলা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অপরিণত এবং কখনো কখনো বিপজ্জনকভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন।

চলে যাওয়ার জন্য দরকার অবকাঠামো -- নিরাপদ আবাসন, অর্থ, আইনি সহায়তা, গোপনীয় পরামর্শ, সন্তানদের সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রের সহযোগিতা, দায়িত্বশীল পুলিশি ব্যবস্থা, বিশ্বাসযোগ্য পরিবার বা বন্ধু, একটি বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা-পরিকল্পনা।

এসব শর্ত না থাকলে, ব্যক্তিগত সাহস নিয়ে বক্তৃতা আরেক ধরনের নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়।

নির্যাতনমূলক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটিকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করা দরকার -- “সন্তানদের জন্য হলেও সম্পর্কে থেকে যাও।”

কিন্তু থাকবেন কীসের মধ্যে? চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভরা একটি সংসারে? এমন এক বাড়িতে, যেখানে এক অভিভাবক অন্যজনকে অপমান করে? এমন এক পরিবারে, যেখানে সন্তানেরা কথা বলার আগেই সবার মেজাজ মেপে নিতে শেখে? এমন এক সম্পর্কে, যেখানে সহিংসতার পর আসে ক্ষমাপ্রার্থনা, আর তারপর আবার সেই সহিংসতাই?

সন্তানেরা কেবল লক্ষ করে না যে তাদের বাবা-মা বিবাহিতই থেকে গেলেন কি না। তারা যা দেখে, তা থেকে শেখে ঘনিষ্ঠতার ব্যাকরণ। তারা শেখে ভালোবাসা কীভাবে কথা বলে।

তারা শেখে কার রাগ করার অধিকার আছে। কাকে ক্ষমা চাইতে হয়। টাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। কে "না" বলতে পারে। কার কাছে সহ্য করাটাই প্রত্যাশিত।

একটি ছেলে হয়তো শেখে যে কর্তৃত্ব মানেই আধিপত্য। একটি মেয়ে হয়তো শেখে যে ভালোবাসার জন্য কষ্ট সইতে হয়। তাই "সন্তানদের জন্য থেকে যাওয়া" সবসময় সন্তানদেরকে রক্ষা করে না। কখনো কখনো, সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় আমরা সহিংসতার পাঠ্যক্রমটিকেই টিকিয়ে রাখি।

এরপর আছেন প্রতিবেশী, আত্মীয়, সহকর্মী, বন্ধুরা। প্রায়ই তারা অবগত। চিৎকার শুনতে পান। বিচ্ছিন্নতা লক্ষ করেন। আঘাতের চিহ্ন দেখেন। কিন্তু চিরাচরিত প্রতিক্রিয়াটিই থেকে যায় -- "এটা স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার।"

এই একটি বাক্যই পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক ছাড়পত্রগুলোর একটি। বন্ধ দরজার আড়ালে ঘটে বলেই সহিংসতা নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হয়ে যায় না। একটি ঘর নীতি, আইন, বা সামগ্রিক দায়িত্ববোধের নাগালের বাইরে থাকা কোনো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নয়।

দশকের পর দশক ধরে নারীবাদী পাণ্ডিত্য ঠিক এই "প্রকাশ্য" আর "ব্যক্তিগত" বিভাজনটিকেই চ্যালেঞ্জ করে এসেছে। ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক।

ঘরের ভেতর টাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে -- সেটিও রাজনৈতিক। কে যৌনসঙ্গম প্রত্যাখ্যান করতে পারে -- সেটিও রাজনৈতিক। কে বাড়ি থেকে বেরোতে পারে -- সেটিও রাজনৈতিক। কে কাজ করতে পারে -- সেটিও রাজনৈতিক।

সহিংসতা ঘটলে কাকে বিশ্বাস করা হয় -- সেটিও রাজনৈতিক। পারিবারিক সম্প্রীতির নামে কাকে অপমান হজম করতে হবে বলে প্রত্যাশা করা হয় -- সেটিও রাজনৈতিক।

পারিবারিক সহিংসতাকে কেবল "ব্যক্তিগত" মনে হয়, কারণ সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পুরুষের ক্ষমতার নির্দিষ্ট রূপগুলোকে নজরদারির বাইরে রাখাই ভালো।

আরেকটি সাংস্কৃতিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়া দরকার -- নারীর সহনশীলতার প্রতি আমাদের অসাধারণ শ্রদ্ধা। আমরা সেই নারীকে উদযাপন করি যিনি "সংসারটাকে একসাথে রেখেছিলেন।" "তিনি এত কিছু সহ্য করেছিলেন।" "সন্তানদের জন্য সব কিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন।" "কখনো অভিযোগ করেননি।"

আমরা কষ্টকেই নারীত্বে রূপান্তরিত করি। কিন্তু সহনশীলতা নিজেই একটি গুণ হবে কেন?

যে সংস্কৃতি নির্যাতন সহ্য করার জন্য নারীদের প্রশংসা করে, তা অনিবার্যভাবেই নির্যাতনকারী পুরুষদের জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দেয়। কোনো নারী যদি ১৫টি বছর সহিংসতা সয়ে বেঁচে থাকেন, আমরা হয়তো তাকে অসাধারণ মা বলে ডাকব। আমি বরং জিজ্ঞেস করব -- তাকে কেন আদৌ ১৫টি বছর সহিংসতা সয়ে বাঁচতে হলো?

কে তাকে শিখিয়েছিল যে সহ্য করাই একজন ভালো নারীর পরিচয়? কোন পরিবার তাকে ফিরে যেতে বলেছিল? কোন প্রতিষ্ঠান তাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল? কোন সমাজ তালাককে নির্যাতনের চেয়েও বেশি লজ্জাজনক মনে করেছিল? কোন সাংস্কৃতিক আখ্যান তাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে আত্মত্যাগই মাতৃত্ব?

আমরা যদি এই প্রশ্নগুলো না করি, তাহলে কোনো বিয়োগান্ত ঘটনার পর নারীদের জন্য শোক পালন করতে থাকব -- অথচ পরের প্রজন্মের নারীদেরও "মানিয়ে নিতে" শেখাতে থাকব।

এ কারণেই "একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে" -- এই বাক্যটি এতটা বিপজ্জনক হতে পারে। কখনো কখনো এটি কোনো প্রত্যাশা নয় -- বরং এটি একটি সামাজিক অবেদনিক। এটি ক্ষতটিকে দূর করে না। এটি কেবল তার প্রতিক্রিয়াকেই দমিয়ে রাখে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি কঠিন দাম্পত্য সম্পর্কেরই সমাপ্তি হওয়া উচিত। সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সম্ভব। মানুষ বদলাতে পারে। থেরাপি সাহায্য করতে পারে। দম্পতিরা আবার বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারেন।

কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের কিছু শর্ত থাকে। জবাবদিহিতা। টেকসই আচরণগত পরিবর্তন। সীমারেখার প্রতি শ্রদ্ধা। পেশাদার হস্তক্ষেপ। ভীতিপ্রদর্শনের অবসান।

প্রমাণ যে কেবল ক্ষমাপ্রার্থনাই নয়, ছকটাই বদলেছে। বারবার সহিংসতার পর ফুল, চোখের জল, স্নেহ, আর প্রতিশ্রুতি আসা -- তা কোনো রূপান্তর নয়।

এটি একটি চক্র। আর এই চক্রকে রোমান্টিক করে তোলা প্রাণঘাতী হতে পারে। হয়তো আমাদের প্রশ্নের ভাষাটাই বদলানো দরকার।

"কেন তিনি থেকে গেলেন?" -- নয়।

বরং, "কোন জিনিষগুলো তার চলে যাওয়াকে এত কঠিন করে তুলেছিল?"

"কেন তিনি সহ্য করলেন?" -- নয়।

বরং, "কে তাকে শিখিয়েছিল যে সহ্য করাই তার কর্তব্য?"

"কেন তিনি আগে সাহায্য চাননি?" -- নয়।

বরং, "আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলেছিলাম, যেখানে সাহায্য চাওয়াটা নিরাপদ, সাশ্রয়ী, ও সামাজিকভাবে সম্ভব ছিল?"

কারণ কোনো নারী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর, সবচেয়ে সহজ কাজটি হলো তার সিদ্ধান্তগুলোর ময়নাতদন্ত করা।

কিন্তু এর চেয়ে আরও কঠিন কাজটি হলো তার চারপাশের সমাজেরই ময়নাতদন্ত করা। আর আমরা যদি তা করি, হয়তো আবিষ্কার করব যে একজন নির্যাতনকারী প্রায় কখনোই একা দাঁড়িয়ে থাকে না।

তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে নীরবতা। কলঙ্ক। আর্থিক নির্ভরশীলতা। পারিবারিক সম্মান। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ। দুর্বল প্রতিষ্ঠানসমূহ। রোমান্টিকীকৃত আত্মত্যাগ। তালাকের ভয়।

আর সেই পুরনো, পরিচিত নির্দেশ -- "আরেকটু সহ্য করো। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।"

সব কিছু সময়ের সাথে সাথে আপনাআপনি ঠিক হয়ে যায় না। কিছু সম্পর্কের প্রয়োজন মেরামতের। কিছু সম্পর্কের প্রয়োজন দূরত্বের। কিছু সম্পর্কের প্রয়োজন কেবলই পালিয়ে যাওয়ার।

আর কখনো কখনো একটি সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেই শিক্ষাটি নেওয়া প্রয়োজন, তা হলো: একটি দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কখনোই সেই সম্পর্কের ভেতরে থাকা মানুষটিকে রক্ষা করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

ড. লুবনা ফেরদৌসী বিলেতে কর্মরত একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক।