আমাদের নিজেদেরই শিশুদের মননের কারাগার
দরিদ্র ও এতিম শিশুদের নামে দেশ-বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি টাকার অনুদান আর জাকাতের কোনো হিসাব থাকে না। এই লুণ্ঠনের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতেই তারা সাধারণ মানুষের কৌতূহলকে দমিয়ে রাখে।
একজন মায়ের অসহায়ত্বের চেয়ে বড় অসহায়ত্ব আর কিছু নেই -- যে মায়ের বুক ভেতরে ভেতরে অবিরাম কাঁদে দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থানও যার নেই বলে, ক্ষুধার তাড়নায় শেষ পর্যন্ত যাকে তুলে দিতে হয় নিজের কলিজার টুকরো, নিজের ছোট্ট সন্তানকে, একজন কওমি মাদ্রাসার উস্তাদের অচেনা হাতে।
পকেটে একটি পয়সাও নেই, দুবেলা রুটির সংস্থানও নেই -- সেই মা তার ক্ষুদ্র শিশুকে পাঠিয়ে দেন এক অন্ধকার, অজানা জগতে।
তিনি শুধু একটু আশ্রয় চেয়েছিলেন। তিনি কি জানতেন যে এই স্নেহের মুখোশের আড়ালে তার নিষ্পাপ সন্তানের ভেতরের সমস্ত আলো চিরতরে নিভে যাবে?
আজ সেই শিশুর জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার বুক রক্তাক্ত হয়ে ভেঙে পড়ে। যে শিশু হয়তো নিজের মাতৃভাষাটুকুও ঠিকমতো পড়তে জানে না, যার হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন খাতা আর পেনসিল, তাকে বসিয়ে দেওয়া হয় এক কঠোর কারাগারে -- যেখানে প্রতিদিন এক অচেনা ভাষার অবোধ্য মন্ত্র মুখস্থ করার নামে চালানো হয় এক অদৃশ্য মানসিক দীক্ষা।
নবীজির মদিনা বনাম আজকের যান্ত্রিক খাঁচা
কঠোর পর্দা, দেয়াল আর বিভাজনের আজকের সমাজের দিকে তাকালে মনে প্রশ্ন জাগে: আমাদের নবী কি কখনও এমন ধর্ম শিখিয়েছিলেন?
সেই আদি যুগের প্রাণবন্ত মদিনায় নারীরা কখনোই ঘরের কোণে বন্দি ছিলেন না। নবীজির মসজিদের সজীব আঙিনায় তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে বসে জ্ঞান আহরণ করতেন, সরাসরি নবীজিকে প্রশ্ন করতেন, জীবনের জটিল বিষয়ে মতবিনিময় করতেন।
হযরত আয়েশার মতো নারীরা সেই যুগের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক, ফকিহ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিনের ইসলাম ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জ্ঞানচর্চার জন্য এক সীমাহীন আকাশ।
অথচ আজ কওমি মাদ্রাসার উঁচু দেয়াল আর বন্ধ দরজার ভেতরে সেই নববী উদারতার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। নবীজির সেই জীবন্ত, প্রশ্নশীল, মুক্ত সমাজ রূপান্তরিত হয়েছে এক ভয়ংকর, অন্ধ, শ্বাসরুদ্ধকর কারাগারে।
অবোধ্য মন্ত্র এবং কৌতূহলের মৃত্যু
যে বয়সে একটি শিশুর মনে হাজারো প্রশ্ন থাকার কথা -- আকাশ কেন নীল, নদী কীভাবে বয়ে চলে, এসব জানার আগুন জ্বলার কথা -- সেই বয়সে তার ছোট্ট মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয় এমন এক ভাষা ও বিধান, যার একটি অক্ষরও সে বোঝে না।
সে বাংলাই ঠিকমতো পড়তে জানে না, অথচ তাকে দিনের পর দিন তোতাপাখির মতো মুখস্থ করতে বাধ্য করা হয় অবোধ্য শব্দগুচ্ছ।
সেখানে কোনো প্রশ্নের অনুমতি নেই; কিছু জানতে চাওয়াটাই সেখানে অপরাধ। এই নিরবচ্ছিন্ন শাসনের চাপে শিশুর ভেতরের মুক্তিকামী প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। তাকে শেখানো হয় নিজে থেকে চিন্তা না করে কেবল আদেশ পালন করতে।
ভয়ের খাঁচায় জন্ম নেওয়া হিংস্রতা ও অন্ধত্ব
প্রশ্নহীন, ভীতিকর এই অন্ধকার আবদ্ধতার ভেতর বেড়ে উঠতে উঠতে শিশুর অবচেতনে বুনে যায় এক দুর্ভেদ্য কঠোরতা।
তাকে শেখানো হয়, তার নিজের বিশ্বাসের বাইরে সবকিছুই শত্রু; এই পৃথিবী নিছক সাদা আর কালোর মধ্যে এক নির্মম লড়াই।
সে নিষ্পাপ; সে বুঝতেই পারে না কীভাবে তাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হচ্ছে অন্ধ প্রতিহিংসার এক হাতিয়ার হিসেবে।
সে যখন একদিন প্রাপ্তবয়স্ক যুবক হয়ে এই মাদ্রাসার সীমানা পেরিয়ে বাইরে পা রাখে, তখন সে দেখে তার কাছে কোনো আধুনিক দক্ষতা নেই, নিজের রুটির সংস্থান করার কোনো উপায় নেই। খালি পকেট, বুকের গভীরে জমে থাকা হতাশা, আর বছরের পর বছর ধরে ঢেলে দেওয়া অসহিষ্ণুতা -- হঠাৎ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে।
সেই মুহূর্তে সেই তরুণ আর নিজেকে সামলাতে পারে না। যাকে ভালোবাসার কোলে বড় হওয়ার কথা ছিল, তাকেই বোঝানো হয় যে ধ্বংসই তার আসল কর্তব্য।
তখন সেই কোমল হাত দুটোই হঠাৎ ফেটে পড়ে উন্মত্ততায় -- মাজার ভাঙচুর, ফকিরের নিথর দেহ রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে আগুনে পোড়ানো।
সে নিজেও বোঝে না সে কী করছে, কারণ তার সমস্ত সত্তা তখন শাসিত হয় অন্যের ঢেলে দেওয়া অন্ধ ঘৃণা আর ভয়ে।
এই অজ্ঞতা ও অন্ধত্ব আসলে কাদের স্বার্থ রক্ষা করে?
এই গোটা ব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে বড় একটা প্রশ্ন জাগে: এই শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশব কেড়ে নিয়ে যে অসহিষ্ণু শক্তি তৈরি হচ্ছে, তা থেকে আসলে লাভবান হয় কারা?
নবীজি কখনও রাজতন্ত্র বা স্বৈরাচারের পক্ষে ছিলেন না; তিনি সর্বদা চেয়েছিলেন মানুষ মুক্তভাবে চিন্তা করুক, মুক্ত থাকুক। অথচ আজকের এই অজ্ঞতা আর অন্ধত্ব সুকৌশলে বেশ কয়েকটি পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে:
স্বৈরাচারী ও ক্ষমতালোভী শাসকবর্গ: যারা প্রশ্ন করতে জানে না, কেবল অন্ধ আনুগত্যেই অভ্যস্ত, তারা কখনও দুর্নীতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।
এই অন্ধ ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শাসকরা পায় বাধ্য, সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এক জনগোষ্ঠী -- এমন এক বশংবদ ভিড়, যারা নিজেদের অধিকার নিয়ে কখনও একটি টুঁ শব্দও করে না।
ভূ-রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ: স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস দেখায়, কিছু পরাশক্তি নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবং অস্ত্রের বাজার সচল রাখতে এই ধরনের উগ্র, অসহিষ্ণু গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে এসেছে।
একটি সমাজে যখন অস্থিরতা আর উগ্রতা বজায় থাকে, তখন বিদেশি শক্তির পক্ষে সেই সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা সহজ হয়ে যায়।
অভ্যন্তরীণ স্বার্থান্বেষী নেতৃত্ব: এই ব্যবস্থার ভেতরে একশ্রেণির ধর্ম-ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী নেতা সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হন।
দরিদ্র ও এতিম শিশুদের নামে দেশ-বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি টাকার অনুদান আর জাকাতের কোনো হিসাব থাকে না। এই লুণ্ঠনের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতেই তারা সাধারণ মানুষের কৌতূহলকে দমিয়ে রাখে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণের হাহাকার
এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসা কোনো তরুণ বা শিক্ষক যদি আজ আয়নার সামনে দাঁড়ান, তিনি শিউরে উঠবেন। তিনি দেখবেন, তার ভেতরের সমস্ত কোমলতা আর সহনশীলতা কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যে হৃদয়ের কথা ছিল সবার সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচার, তা আজ শুধুই দেয়ালের পর দেয়াল। নিজের অজান্তেই তিনি হারিয়েছেন তার মনুষ্যত্বের সহজ, সুন্দর রূপটি।
সংস্কৃতি ও সমাজের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই অন্ধ ব্যবস্থার পতনের জরুরি প্রয়োজন
এই গোটা ব্যবস্থার গভীর পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দেয় যে এটি কোনো শিশুর, কোনো পরিবারের, কিংবা সামগ্রিক সমাজের কোনো কাজেই আসছে না।
শৈশব হারানো শিশু সন্তানকে অন্ধকারের হাতে তুলে দিতে দিতে কাঁদতে থাকা পরিবার, কিংবা স্বাধীনচেতা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠা সমাজ -- এদের কেউই এই আয়োজন থেকে কিছু পায় না।
এটি নিছক মুষ্টিমেয় সুযোগসন্ধানী ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষার এক নির্মম হাতিয়ার মাত্র।
আজ এই ব্যবস্থা আমাদের শত বছরের সংস্কৃতি, পারস্পরিক সহনশীলতা, আর গোটা সমাজকে ভেতর থেকে গিলে খাচ্ছে, ধ্বংস করছে।
যারা কোনো মতভেদই সহ্য করতে পারে না, তাদের এই অন্ধ সম্প্রসারণ থামাতে, আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে এই ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেগে ওঠা এবং তাকে আমূল পাল্টে দেওয়াই আজকের সবচেয়ে বড় দাবি।
আনুশেহ আনাদিল একজন বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সমাজ-উদ্যোক্তা।