আটক, কিন্তু দোষী সাব্যস্ত নয়
যদি আমাদের কারাগারসমূহ এমন মানুষদের আটক রাখে, যাদের অপরাধ রাষ্ট্র দ্রুত প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে ক্ষমতায় কোন দল আছে তাতে সামান্যই আসে যায়।
শেখ হাসিনার পতনের পর আজ দুই বছর পূর্ণ হলো। সরকার বদলেছে, স্লোগান বদলেছে, এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি দেশজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
তবুও একটি প্রতিষ্ঠান যেন এই রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রায় সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে থেকে গেছে -- আমাদের কারাগারগুলো। সেগুলো এখনও ভরে আছে এমন নারী-পুরুষে, যাদের মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে, যাদের অভিযোগগুলো বড়জোর দুর্বল, অথবা যাদের দীর্ঘায়িত আটককে আইনি প্রয়োজনীয়তার বদলে প্রশাসনিক সুবিধায় পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়।
একটি সরকার তার পূর্বসূরির কাছ থেকে অনেক সমস্যার উত্তরাধিকার পেতে পারে। কিন্তু তার অজুহাতসমূহের উত্তরাধিকার অনির্দিষ্টকাল ধরে বহন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমালোচনাগুলোর একটি ছিল ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। গ্রেপ্তার পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধার হাতিয়ারে, ভিন্নমতকে প্রায়ই অপরাধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো, এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই অনেক সময় দীর্ঘদিন মানুষকে আটক করে রাখা হতো, তার পরে নয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে ঠিক এই সংস্কৃতিরই অবসান প্রত্যাশা করেছিল। তার বদলে যা দেখা দিয়েছে তা এক অস্বস্তিকর ধারাবাহিকতা।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন জনগণকে বারবার আশ্বস্ত করেছিল যে আইনের শাসন আবারও শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হয়ে উঠবে। বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলা থেকে দৃঢ় প্রস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
তবুও বহু আটক ব্যক্তি এখনো কারাগারে রয়ে গেছে -- তাদের মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি অতি সামান্য; আর বিচারপ্রক্রিয়ার মন্থর গতি সেই ন্যায়বিচার থেকে তাদের বঞ্চিত করেই চলেছে, যা এত সরবে প্রতিশ্রুত হয়েছিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায় আছে, কিন্তু কারাগারের ফটকসমূহ এখনো একই গল্প বলে যাচ্ছে।
বিলম্বিত ন্যায়বিচার যে বঞ্চিত ন্যায়বিচারেরই নামান্তর, তা দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত। কম স্বীকৃত সত্যটা হচ্ছে যে অনির্দিষ্টকাল স্থগিত ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয় দণ্ডবিহীন শাস্তিতে।
জুন মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদকে জানান যে দেশের ৭৫টি কারাগারে ৪৫,১৩৬ জন অনুমোদিত ধারণক্ষমতার বিপরীতে ৭৭,০৪০ জনকে বন্দি রাখা হয়েছে, এবং তিনি স্বীকার করেন যে কিছু কারাগারে প্রতিকূল পরিবেশ বিদ্যমান।
বিচারপূর্ব আটককে কখনোই দণ্ডাদেশের বিকল্প হিসেবে স্থাপন করা হয়নি। এটি করা হয়েছে জনসুরক্ষা নিশ্চিত করতে, তদন্তে হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে, অথবা আদালতে অভিযুক্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে।
দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ -- আধুনিক বিচারশাস্ত্রের একটি প্রাচীনতম নীতি — তার সমস্ত ব্যবহারিক অর্থ হারায়, যদি কেবল কারাকক্ষে বছরের পর বছর কাটানোর পরই কেউ খালাস পায়।
অবশ্যই কোনো সচেতন পর্যবেক্ষক এই যুক্তি দিবে না যে প্রতিটি আটক ব্যক্তিই নির্দোষ, অথবা বিপজ্জনক অপরাধীদেরকে নিছক মমতা থেকে মুক্তি দেওয়া হউক।
জনসুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ফৌজদারি জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের যোগ্য, ঠিক যেমন অভিযুক্তরা যোগ্য যথাযথ প্রক্রিয়ার। কিন্তু এই নীতিসমূহ পরস্পরবিরোধী নয়। বরং আইনের শাসন দাবি করে যে এরা একসঙ্গে সহাবস্থান করুক।
একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থাকে অবশ্যই সক্ষম হতে হবে তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে, যারা প্রকৃতপক্ষে সমাজের জন্য হুমকি এবং যারা কেবল একটি অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত বা রাজনীতিকরণ করা আইনি কাঠামোর অনাকাঙ্খিত ক্ষতির শিকারে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের আদালতসমূহ ইতিমধ্যেই বিচারাধীন মামলার বিশাল জট নিয়ে সংগ্রাম করছে -- এটা এমন এক বাস্তবতা, যা একের পর এক সরকার স্বীকার করলেও অর্থবহভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবুও প্রশাসনিক অদক্ষতা নাগরিকদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রাখার স্থায়ী অজুহাতে পরিণত হতে পারে না।
রাষ্ট্র প্রথমে কারাবন্দি করে পরে তদন্ত করতে পারে না -- আমলাতান্ত্রিক জড়তার গ্রহণযোগ্য পরিণতি হিসেবে দীর্ঘায়িত কারাবাসকেও বিবেচনা করতে পারে না।
বাংলাদেশে সবাই নির্বাচন, সংবিধান, এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বিতর্ক করেছে। এসব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর কোনোটিরই বিশেষ মূল্য নেই, যদি সাধারণ নাগরিক এমন একটি বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে না পারে, যা সময়োপযোগী, নিরপেক্ষ, এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি বিশ্বস্ত।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না কেবল সরকার বদলের মধ্য দিয়ে। তা প্রতিষ্ঠিত হয় যখন প্রতিষ্ঠানসমূহ বদলায়।
যদি আমাদের কারাগারসমূহ এমন মানুষদের আটক রাখে, যাদের অপরাধ রাষ্ট্র দ্রুত প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে ক্ষমতায় কোন দল আছে তাতে সামান্যই আসে যায়। একটি গণতন্ত্র নতুন অধ্যায় শুরু করার দাবি করতে পারে না, যতক্ষণ তার বিচারব্যবস্থা পুরনো নিয়মেই চলতে থাকে।
দুটি আগস্ট আগে বাংলাদেশ শুধু সরকার বদল নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু দাবি করেছিল -- নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে এক ভিন্ন সম্পর্ক, যেখানে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনকি তাদের ক্ষেত্রেও, যাদেরকে ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক মনে করে।
সেটাই ছিল প্রতিশ্রুতি। আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তা বিচার করলে বলা যায় যে তা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।