তেল আর সম্ভাব্য পারমাণবিক শক্তির জন্য ইরান বিশ্বজুড়ে যতটা আলোচনায় এসেছে, তার চেয়ে কম নয় তার শাসনব্যবস্থা, যা এক সমৃদ্ধ সভ্যতার উত্তরাধিকার, এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে যার রূপ বদলেছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ইরান নিজেকে তেল বা শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে না; বরং ফুলের বাগান, বিশ্বখ্যাত মাছ, মসলা, রন্ধনশৈলী এবং মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত ধর্মীয় প্রভাব -- এসবই তার আসল পরিচয়।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বঙ্গ, ইরানি প্রভাবিত ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। শুধু ধর্মই নয় -- ইরানি খাবার, গোলাপের বাগান -- সবখানেই ইরানিরা ছাপ রেখে গেছে এখানে। জরথুস্ত্রবাদী ধর্মগ্রন্থ আভেস্তা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ রচনায় প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হয়। আবার সুফি মতবাদ উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তারে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
পুঁথি থেকে গীতাঞ্জলি, গুলিস্তান-গুলশান নামকরণ থেকে শালিমার ও শালিমারবাগ, গজল থেকে ভজন -- সবকিছুর শিকড় গিয়ে মেলে ইরানে -- কবিতা, ফুল আর ধর্মীয় সঙ্গীতের সেই সৌন্দর্যে। গোলাপ চাষ, জাফরানের মতো সূক্ষ্ম মসলা উৎপাদন, ভেষজ ওষুধের ব্যবহার -- এসব ক্ষেত্রেও উপমহাদেশের দক্ষতার পেছনে রয়েছে ইরানের প্রভাব।
ইরানি মসলা আর উপমহাদেশীয় মসলার মিশেলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সুস্বাদু, বিশ্বখ্যাত খাবার। যেমন করে ফিরদৌসী, হাফিজ, সাদি, ওমর খৈয়াম এবং রুমি পড়া হয়, তেমনি সাহিত্যচর্চা আর কবিতা রচনায় বাংলায় সেই গভীরতা পশ্চিমা সাহিত্য খুব কমই এনে দিতে পেরেছে।
“লাল সোনা” নামে পরিচিত জাফরান বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা। এটাকে “স্বাস্থ্যকর ফুল” ও “মসলার রাজা”ও বলা হয়। জাফরান উৎপাদনের জন্য শুধু উর্বর জমি নয়, প্রয়োজন সূক্ষ্ম দক্ষতা, যা ইরানি কৃষকদের বিশেষত্ব। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই ইরানের কেরমানশাহ ও হামাদান অঞ্চলের পাদদেশে জাফরান উৎপাদিত হয়ে আসছে, এবং এই চাষাবাদ ইরানই বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০% জাফরান একাই উৎপাদন করে ইরান; বাকি ১০% ভাগাভাগি করে আফগানিস্তান, মরক্কো, স্পেন, গ্রিস ও ভারত। জাফরান সংগ্রহ করাটা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য, আর এই কাজে ইরানি কৃষকেরা সবচেয়ে দক্ষ। বীজ রোপণ হয় শরতে, শীতকালে তা পরিপক্ব হয়, আর বসন্তে গিয়ে ফসল তোলা হয় -- পুরো প্রক্রিয়াটা প্রায় এক বছর সময় নেয়। মসলা ছাড়াও এটি নানা ওষুধে ব্যবহৃত হয়।
প্রাচীন আরব চিকিৎসক -- আল রাজি, ইবনে সিনা, আল বিরুনি -- জাফরানের ঔষধি ব্যবহার নিয়ে কাজ করেছেন। এক কেজি জাফরানের দাম প্রায় ২০০০ ডলার, কারণ এক কেজি জাফরান পেতে প্রায় ১,৫০,০০০ ফুল লাগে। এই মসলার বৈশ্বিক বাজারমূল্য প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার। ইরান বছরে প্রায় ৩০০ টন উৎপাদন করে এবং আয় করে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার।
গোলাপ উৎপাদনেও ইরান বিশ্বখ্যাত -- বিশেষ করে দামাস্ক গোলাপ, যা সুগন্ধ ও ঔষধি গুণের জন্য পরিচিত। বিশ্বের প্রায় ৯০% গোলাপ সরবরাহ করে ইরান। কাশান অঞ্চল তার প্রধান কেন্দ্র, তবে ফার্স প্রদেশেও তা উৎপাদন হয়। ইরানি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হচ্ছে শিরাজের "সাদি" রচিত "গুলিস্তান", যেখানে এক সুন্দর গোলাপ বাগানের ভ্রমণের বর্ণনা আছে।
কিন্তু ঢাকার গুলিস্তান বা গুলশান, যার অর্থও গোলাপ বাগান -- সেখানে হাঁটলে এখন আর গোলাপের সুবাস পাওয়া যায় না; বরং ভিড়, হর্নের শব্দ আর আবর্জনার গন্ধই সঙ্গী।
তেলের মতো এত প্রচার না পেলেও ইরানের মাছ শিল্প বিশাল। সেই দেশে প্রতি বছর ১.৫ থেকে ২ মিলিয়ন টন মাছ উৎপাদন হয়, যার রপ্তানি আয় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এই খাতের সবচেয়ে বিখ্যাত পণ্য ক্যাভিয়ার যা “কালো সোনা” নামে পরিচিত। এটি স্টার্জন মাছের ডিম, এবং বিশ্বের সবচেয়ে দামি খাদ্যগুলোর একটি।
এই ডিম শুধু পুষ্টিগুণেই নয়, স্বাদ ও সুবাসেও বিখ্যাত। যদিও অন্যান্য সাগরেও স্টার্জন পাওয়া যায়, ইরানের ক্যাস্পিয়ান সাগরে এর উপস্থিতি ৯০% এর বেশি। সেখানে বছরে প্রায় ২০–৩০ টন ক্যাভিয়ার উৎপাদিত হয়, এবং প্রতি কেজির দাম ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ ডলার -- মূলত ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানির জন্য।
রন্ধনশিল্পে ইরান বহুদিন ধরেই এক সমৃদ্ধ কেন্দ্র। শুধু নিজের খাবারের জন্যই নয়, ইরানের রন্ধনপ্রথা প্রভাব ফেলেছে তুরস্ক, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং উপমহাদেশে। আশ-এ-আনার হচ্ছে কিমা মাংস ও ডালিম বীজ দিয়ে তৈরি একটি জনপ্রিয় স্যুপ, যা শীতকালে বেশি খাওয়া হয়।
ওবগোশ্ত ও খোরেশ্ত হচ্ছে ভেড়া, মুরগি বা হাঁসের মাংস দিয়ে তৈরি ঝোল, যেখানে আখরোট, টমেটো ও ডালিমের গুড় ব্যবহার করা হয়। খোরেশ্ত-এ-ফেসেনজান, ঘেইমে, বাদেমজান -- সবই জনপ্রিয়। ঘেইমে বাদেমজান আবার ছোলা, টমেটো, আলু ও বেগুন দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঝোল।
আরও আছে খোরেশ্ত-এ-কারাফস -- নরম মাংস, সুগন্ধি ভেষজ ও সেলারির অনন্য মিশ্রণ। পিলাভ, যা উপমহাদেশে পোলাও নামে পরিচিত, তা চাল, সবজি ও মাংস দিয়ে তৈরি, যা অনুষ্ঠান ও রেস্টুরেন্টে পরিবেশন করা হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাবাব, ঘোরমে, কোফতা, যেগুলো আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, সেগুলোর শিকড় ইরানেই।
কাবাব কুবিদে যা গরু বা খাসির মাংস দিয়ে তৈরি তা ইরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাবাব। কোফতা যা প্রায় সবখানেই পাওয়া যায়, তা দ্বিতীয় জনপ্রিয় খাবার। মির্জা কাসেমি -- বেগুন, টমেটো ও ডিম দিয়ে তৈরি এক ধরনের কাবাব -- এটিও বেশ জনপ্রিয়।
হাফিজ তার দিওয়ানে লিখেছিলেন: “ভারতের মধুরভাষী টিয়াপাখিরা পারস্যের এই চিনি বাংলায় পৌঁছালে মোহিত হবে"। এখানে “পারস্যের চিনি” বলতে তিনি বোঝাচ্ছিলেন পারস্যের কবিতা ও ভাষার মাধুর্য, আর “ভারতের টিয়াপাখি” ছিল কবিতাপ্রেমী ও বাগ্মী মানুষদের প্রতীক। কবিতার নান্দনিকতা, গোলাপের সৌন্দর্য, সুস্বাদু খাবারের প্রতি ভালোবাসা, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা -- উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলার এই বৈশিষ্ট্যগুলোর পেছনে ইরানের প্রভাব স্পষ্ট।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন উপমহাদেশকে তাদের প্রভাব বলয়ে আনে, তখন ফারসি ভাষার জায়গায় ইংরেজি বসিয়ে দেয়া হয়, যা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করে ফেলে। আজ উত্তর ভারতে ফারসির প্রভাব কিছুটা কম দেখা গেলেও বাংলায় ইরানের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব এখনো গভীর।
বাংলায় ব্যবহৃত বহু ধর্মীয় শব্দ যেমন খোদা, নামাজ, রোজা, বেহেশ্ত, দোজখ -- সবই ফারসি উৎস থেকে এসেছে। ঢাকার গুলিস্তান ও গুলশান মুঘল আমল থেকে তাদের নাম ধরে রেখেছে। আর গোলাপ, কাবাব, কোফতা, পোলাও, কোরমা বিয়ে থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ সব জায়গাতেই, বিশেষ করে সচ্ছল পরিবারে, এখনো অপরিহার্য।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফ জাগলুল আহমেদ (অবসরপ্রাপ্ত) জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত লেখালেখি করেন।