যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়: বিজ্ঞান ও বাস্তবতা

বাস্তবতা হলো যে কাউন্সেলিং, থেরাপি, বৈদ্যুতিক শক, ধর্মীয় উপদেশ, কালোজাদু, জোরপূর্বক বিপরীত লিঙ্গের সাথে কাউকে বিয়ে দেওয়া, এমনকি তার সাথে যৌন সম্পর্ক -- এসব কিছুই একজন সমকামী মানুষকে বিষমকামী বানাতে পারে না (উল্টাটাও তাই)। অতএব, যৌন অভিমুখিতা একজন মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য এবং এর ভিত্তিতে কোনো প্রকার বৈষম্য করা যাবে না।

Apr 19, 2026 - 17:11
Apr 19, 2026 - 17:13
যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়: বিজ্ঞান ও বাস্তবতা

যৌন অভিমুখিতা (সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন) একটি বাস্তব বিষয়। শুধু সমকামীদের নয়, বিষমকামীদেরও এটি রয়েছে। একটি মানুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ এবং/অথবা প্রেম অনুভব করার জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়াটার নামই হচ্ছে যৌন অভিমুখিতা।

বেশিরভাগ মানুষের মতো আপনি যদি বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন বা তার প্রেমে পড়েন, তাহলে আপনি বিষমকামী বা স্ট্রেইট বা হেটেরোসেক্সুয়াল। আর যদি একই লিঙ্গের কারও প্রতি আকৃষ্ট হন বা তার প্রেমে পড়েন, তাহলে আপনি সমকামী বা হোমোসেক্সুয়াল (পুরুষ হলে গে, নারী হলে লেজবিয়ান)। আর যদি উভয় লিঙ্গের প্রতিই আকর্ষণ অনুভব করেন বা প্রেমে পড়তে পারেন, তাহলে আপনি উভকামী বা বাইসেক্সুয়াল। বিষয়টা এতটাই সরল -- অথচ আমাদের সমাজ ইচ্ছাকৃতভাবে এটাকে জটিল করে রেখেছে।

বিজ্ঞান এখানে একেবারেই পরিষ্কার। "ব্রড ইন্সটিটিউট"-এর “Perspectives on the complex genetics of same-sex sexual behavior” বা "সমলৈঙ্গিক যৌন আচরণের জটিল বংশাণুগত (জেনেটিক) ভিত্তি: বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি" শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায় যে কোনো একক “গে জিন” বলতে কিছু নেই। বরং একজন মানুষের নানা বংশাণুর (জিনের) একটি জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে তার যৌন অভিমুখিতা নির্ণীত হয়। অর্থাৎ এটি একটি জৈবিক বাস্তবতা।

এই প্রক্রিয়া জন্মের আগে শুরু হয়, না পরে -- তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। তবে অনেক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি সম্ভবত জন্মের আগেই নির্ধারিত। উইকিপিডিয়ায় "Prenatal hormones and sexual orientation" বা "প্রাক্-জন্ম হরমোন ও যৌন অভিমুখিতা” শীর্ষক নিবন্ধ এখানে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই: যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তনযোগ্য নয়। অসংখ্য চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা এটি প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের “Resolution on Appropriate Affirmative Responses to Sexual Orientation Distress and Change Efforts” বা “যৌন অভিমুখিতা-সম্পর্কিত মানসিক অস্বস্তি ও তা পরিবর্তনের প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে উপযুক্ত সমর্থনমূলক প্রতিক্রিয়া" নামক নিবন্ধটি এই গবেষণাগুলোর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে। যারা এখনো ভয় পায় যে সমকামী মানুষরা তরুণদের বিপথে নিয়ে যাবে -- তাদের এই তথ্যগুলো না জানা মানে ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতা বজায় রাখা।

বাস্তবতা হলো যে কাউন্সেলিং, থেরাপি, বৈদ্যুতিক শক, ধর্মীয় উপদেশ, কালোজাদু, জোরপূর্বক বিপরীত লিঙ্গের সাথে কাউকে বিয়ে দেওয়া, এমনকি তার সাথে যৌন সম্পর্ক -- এসব কিছুই একজন সমকামী মানুষকে বিষমকামী বানাতে পারে না (উল্টাটাও তাই)। অতএব, যৌন অভিমুখিতা একজন মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য এবং এর ভিত্তিতে কোনো প্রকার বৈষম্য করা যাবে না।

বিপরীতলিঙ্গকেন্দ্রিক (হেটেরোনর্মেটিভ) সামাজিক ব্যবস্থায় অনেক সমকামীরা দেরিতে তাদের যৌন অভিমুখিতা উপলব্ধি করলেও বৈজ্ঞানিকভাবে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এটাও প্রতিষ্ঠিত যে, একজন সমকামী এবং একজন বিষমকামী মানুষের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই -- শুধু তারা কাদের প্রতি আকৃষ্ট, সেটাই পার্থক্য। একই লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ নিজ থেকে একজন মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বা কার্যকারিতার উপর এমন কোনো প্রভাব ফেলে না, যা কোনো রোগ ফেলতে পারে। এই কারণেই সমকামিতা নামক যৌন অভিমুখিতাটিকে এখন আর মানসিক বা শারীরিক রোগ হিসেবে গণ্য করা হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০ সালে তাদের রোগবালাইয়ের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস (আইসিডি) থেকে সমকামিতাকে বাতিল করে দেয়। কারণ -- এটি কোনো রোগ নয়।

এবার আসা যাক জেন্ডার ডিসফোরিয়ার প্রসঙ্গে। এটাও একটি বাস্তব বিষয় এবং কিছু অল্পসংখ্যক মানুষ তাদের প্রতিটি জাগ্রত মুহূর্তে (অনেক সময় ঘুমের মধ্যেও) এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। "রূপান্তরকামী" বা "ট্রান্সজেন্ডার", অর্থাৎ যারা এই অবস্থার মধ্যে বাস করে -- তাদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় যে তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটি গভীর অসামঞ্জস্যে আচ্ছন্ন।

তাদের শরীর যেভাবে তাদেরকে সংজ্ঞায়িত করে, যাকে “জৈবিক লিঙ্গ” বা "বাইয়োলজিকাল জেন্ডার" বলা হয়, তার সাথে তারা নিজেদের গভীরতম ভেতর থেকে (অনেক সময়ে শৈশব থেকেই) নিজেদেরকে যেভাবে উপলব্ধি করে -- এই দুইয়ের মধ্যে থাকে একটি তীব্র দ্বন্দ্ব। এই ক্ষেত্রে একটা আরেকটার সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই অনুভূতি কোনো কল্পনা নয়, কোনো ক্ষণস্থায়ী ভাবনা নয় -- এটি একটি স্থায়ী, পূর্ণাঙ্গ এবং গভীর আত্মপরিচয়ের অনুভূতি। এটাই তাদের "লিঙ্গ পরিচয়" বা "জেন্ডার আইডেন্টিটি"। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের “What is Gender Dysphoria” বা "জেন্ডার ডিসফোরিয়া কী" নামক নিবন্ধটি এই অবস্থার সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। এই ডিসফোরিয়ার সাথে যুক্ত মানসিক যন্ত্রণা বাইরে থেকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়; “কষ্ট” বলাও যথেষ্ট নয়। অনেকের জন্য এটি জীবন অচল করে দেওয়ার মতো।

এই যন্ত্রণা কমানোর জন্য অনেক সময়ে বিভিন্ন রূপান্তরকামীরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন পথ বেছে নেয় -- কেউ বেছে নেয় শুধু হরমোন থেরাপি, কেউ বেছে নেয় সাথে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রপ্রচার -- উদ্দেশ্য তাদের জৈবিক লিঙ্গকে তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসা। কিছু মুসলমান রক্ষণশীল গোষ্ঠী এটিকে এক প্রকার “আইডিওলজি” বা আদর্শবাদ বলে উড়িয়ে দেয়। এটাকে আইডিওলজি বলে উড়িয়ে দেওয়া শুধু অজ্ঞতাই নয় -- নিষ্ঠুরতাও বটে! লিঙ্গ পরিচয়ও জন্মগত -- এটিও বৈষম্যের ভিত্তি হতে পারে না।

এখন আসা যাক "অদ্বৈত" বা "নন-বাইনারি" মানুষদের প্রসঙ্গে। জেন্ডার ডিসফোরিয়ার কারণে এরা নিজেদেরকে নারী বা পুরুষ হিসেবে দেখতে পায় না। এদের জৈবিক লিঙ্গ যাই থাকুক না কেন, তারা এই দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে নিজেদের খুঁজে পায় না। তারা নিজেদেরকে একটি ভিন্ন, অনির্দিষ্ট লিঙ্গ হিসেবে উপলব্ধি করে। তারা অদ্বৈত বা নন-বাইনারি। এটিই তাদের লিঙ্গ পরিচয় -- এবং এটিও সম্মানের দাবিদার।

তারপর আছে "আন্তলিঙ্গ" বা "ইন্টারসেক্স" মানুষ -- যাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্য (বিশেষ করে প্রজনন অঙ্গ) পুরোপুরি পুরুষের বা নারীর মধ্যে পড়ে না, আবার কখনো উভয়েরই মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশে এরা সম্ভবত সবচেয়ে প্রান্তিক, কারণ তাদের অনেকেই নিজেদেরকে প্রকাশ করে না। কিন্তু তারা আছে -- তারা মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী, এবং তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য যেকোনো শারীরিক শুদ্ধিকরণেরও অধিকারী।

এবার আপনাদের কাছে বাংলাদেশের একটি উদ্ভট বিষয় তুলে ধরতে চাই -- তথাকথিত তৃতীয় লিঙ্গের ধারণাটি। "তৃতীয় লিঙ্গ" বলতে যদি কিছু থেকেই থাকে, তাহলে প্রথম লিঙ্গ এবং দ্বিতীয় লিঙ্গ কোনটি? বাস্তবতা হলো যে “তৃতীয় লিঙ্গ” বলতে কিছু নেই। মানুষ হতে পারে নারী, পুরুষ, রূপান্তরকামী, রূপান্তরিতলিঙ্গ বা ট্রান্সসেক্সুয়াল (অর্থাৎ যেসকল রূপান্তরকামীরা হরমোন ও অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে শরীর পরিবর্তন সম্পন্ন করেছে), অদ্বৈত এবং আন্তলিঙ্গ।

কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গ নামে একটি একক শ্রেণি তৈরি করে শেখ হাসিনা যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যদেরকে এক ছাতার নিচে এনে সরলভাবে সংজ্ঞায়িত করে বাস্তবতাকে বিকৃত করেছিলেন। এই উদ্যোগটি ছিল জটিলতা এড়ানোর একটি রাজনৈতিক হটকারিতা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যে এই তৃতীয় লিঙ্গ ধারণাটিকে হিজড়া সম্প্রদায়ের সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। হিজড়া কারো জন্মগত পরিচয় নয় -- হিজড়া গোষ্ঠী বর্তমানে একটি কৃত্রিম সামাজিক গঠন (আর্টিফিসিয়াল সোশাল কনস্ট্রাক্ট)। মুঘল আমলে এরা সম্মানিত এবং সুরক্ষিত ছিল, কিন্তু বিলেতি শাসনের সময় থেকে এরা সমাজচ্যুত এবং অপরাধী হয়ে পড়ে।

আজকের হিজড়া সম্প্রদায়ে আছে সমকামী, রূপান্তরকামী, এমনকি দরিদ্র বিষমকামী ছেলেরাও -- যারা পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। এই আলয় তাদেরকে আশ্রয় দেয় -- খাবার, নিরাপত্তা এবং একটি পরিচয় দেয়।

বিনিময়ে তাদেরকে তাদের আশ্রয়দাতা গুরু মা'র জন্য অর্থ উপার্জন করতে হয় -- প্রায়ই ভিক্ষা, চাঁদাবাজি বা যৌনকর্মের মাধ্যমে (যার কারণে অনেক সময়ে তাদের পুরুষাঙ্গ অপসারণ করা হয়)। এই ধারাটি চলতেই থাকে, কারণ সমাজ তাদেরকে আর কোনো বিকল্প দেয় না। সত্যটি অস্বস্তিকর কিন্তু পরিষ্কার: এই সম্প্রদায়টি তৈরি হয়েছে আমাদের কারণেই। আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে একজন মানুষ নিজের পরিবারেই থাকতে পারে না -- তাই তাকে বিকল্প সমাজে আশ্রয় নিতে হয়।

বাংলাদেশ ২.০ যদি সত্যিই নতুন কিছু হতে চায়, তাহলে একটা লক্ষ্য অবশ্যই সামনে রাখতে হবে: কোনো যৌন সংখ্যালঘু (এলজিবিটি) মানুষ যেন পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত, বৈষম্যের শিকার এবং/অথবা বিচ্ছিন্ন না হয়। যেদিন সেটি নিশ্চিত করা হবে, সেদিন হিজড়া সম্প্রদায়ের আলাদা করে টিকে থাকার প্রয়োজনই থাকবে না। আর সেদিনই আমরা সত্যিকার অর্থে মানুষ হবো।

রিয়াজ ওসমানী একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow