যে নারীরা আগুন জ্বালিয়েছিল
জুলাই ২০২৪ এখনও স্মৃতিতে তাজা। সেই নারীরা -- যারা অপেক্ষা করেনি এবং এগিয়ে এসেছিল। এখন সেই স্মৃতির জন্যও লড়াই চলছে প্রদর্শনীতে, সংগঠনে, লেখায়। এটা একটি অসমাপ্ত বিপ্লব। আর সবচেয়ে অসমাপ্ত অধ্যায়টি নারীদের।
বাংলাদেশ এক বছরে বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে ৭৫ ধাপ এগিয়েছে। আবার বিগত সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন নারী। দুটো কথাই সত্য। এই দেশেই কোথাও এখন একজন নারী আছেন, যিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম কী তা জানেন না। জানেন না যে তার দেশ ২০২৫ সালে উল্লেখিত সূচকে ২৪তম হয়েছে, এক বছরে ৭৫ ধাপ এগিয়েছে -- বিদেশি সংবাদমাধ্যম এটাকে সাফল্যের গল্প বলেছে।
তিনি বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আর তার কাছে বেঁচে থাকা একটা পূর্ণকালীন কাজ -- কোনো ছুটি নেই। তবে ২০২৪ সালের জুলাই হয়তো তার অজানা নয়। সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। সম্ভবত তিনি নিজেই সেই সময়টার একটা অংশ ছিলেন -- রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, ভয়েস নোট আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সমন্বয় করা, সরকারের পতনের পর রাত জেগে পাড়ামহল্লার শৃঙ্খলা ধরে রাখা -- যখন কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত ছিল না।
ছবি মেলার নথিপত্র বলছে যে ১৪ জুলাই তারিখে তালাবদ্ধ ডরমিটোরির দরজা ভেঙে জাতীয় প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়েছিল নারীরাই। এটি কোনো প্রান্তিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। সেই সময়ে সংবাদমাধ্যমও বলেছিল যে জুলাই জুড়ে নারীকে উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল। শিরীন হক বলেছিলেন -- এমন দৃশ্য তিনি আগে কখনো দেখেননি। নারীরা সেখানে গিয়েছিল আমন্ত্রণ পেয়ে নয়, বরং এই দেশ তাদেরও -- এই অনুভূতি থেকে।
এই বাক্যটা এখন অন্যরকম শোনায় -- কারণ, এরপর যা ঘটেছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে অগ্রগতি দেখা যায়, তা সবসময় ব্যক্তি জীবনে দেখা যায় না। অগ্রগতি হয়েছে সত্যি যা স্বীকার করার মতো। কিন্তু সেটা অসম্পূর্ণও। বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতির কিছু অধ্যায় সত্যিই উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেয়েরা ছেলেদের সমান। ১৫–২৪ বয়সী নারীদের সাক্ষরতার হার ৯৫.৮%।
এই সাফল্য আকাশ থেকে পড়েনি -- দশকের পর দশক পরিশ্রমে গড়া। কিন্তু একটি দেশের গল্প শুধু তার সেরা অধ্যায় দিয়েই নয়। শিরোনাম আর বাস্তবতার ফারাক -- জেনেভা আর রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফেরার পথের ফারাক -- এখনও বিস্তর। এখানেই এক ধরনের বৈপরীত্য আছে, যা বাংলাদেশ কখনো সত্যিকারের মুখোমুখি হয়নি।
১৯৯১ থেকে ২০২৪ -- তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন নারী। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া -- দুজনেই দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এটা কোনো ছোট বিষয় নয়। কিন্তু নিচের স্তরের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ১,৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৭৮ জন অর্থাৎ ৩.৯৩%। ৩০০ আসনের সংসদে সরাসরি জয়ী নারী -- ৭ জন। ৫০ জন মন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় নারী ৩ জন। জুলাই সনদ বলেছিল কমপক্ষে ৫% নারী প্রার্থী দিতে। একটিও দল তা মানেনি।
শীর্ষে কয়েকজন নারী থাকা মানেই কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। কারণ এই নেতৃত্বও এসেছে পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে -- দলীয় কাঠামোর ভেতর নারী তৈরি করার সংস্কৃতি থেকে নয়। সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাও বাস্তবে ভিন্নভাবে কাজ করেছে। এখানে নারীরা জনগণের কাছে নয়, দলের কাছে দায়বদ্ধ। সেলিমা রহমান বলেছেন -- যোগ্য নারীরা হারিয়ে যায় অযোগ্যতার কারণে নয়, বরং দল তাদের সামনে এগিয়ে দেয় না। এই বাস্তবতায় ৩০ বছর ধরে নারী শীর্ষে থাকাটা সমতা নয় -- এটা অন্য এক ধরনের সীমাবদ্ধতা।
তারপর এলো জুলাই ২০২৪। তারপর এলো জুলাইয়ের পরবর্তী সময়। ছবি মেলার প্রদর্শনী সরাসরি বলছে যে নারীদেরকে মুছে ফেলা হয়েছে। যারা আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল, তাদেরকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে প্রতীকী ভূমিকায়। তাদেরকে রাস্তায় প্রয়োজন ছিল -- ক্ষমতায় নয়। প্রমাণও মিলেছে তাই। প্রথম দফার উপদেষ্টাদের মধ্যে কোনো নারী ছিল না।
সংস্কার কমিশনগুলোও ছিল পুরুষ-প্রধান। নারী বিষয়ক কমিশনের ৪২৩ সুপারিশ -- উপেক্ষিত।
জাতীয় সনদে নারীর প্রসঙ্গ এক লাইনে সীমাবদ্ধ।
দলীয় সিদ্ধান্ত নারীদের ছাড়া নেওয়া হয়েছে। অনেকে দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। গবেষকদের ভাষায় পুরনো ধারক-বাহকরাই নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। এটা একটি নাটকীয় বিশ্বাসঘাতকতা নয় -- এটা একটি নীরব বিশ্বাসঘাতকতা; খালি চেয়ার, উপেক্ষিত প্রতিবেদন, জুলাই সনদের ভেতর এক লাইনে নামিয়ে আনা একটি বাস্তবতা। ইতিহাসে এই ধারাটি নতুন নয় -- সংকটে নারীকে ডাকা হয় কিন্তু কাঠামো গড়ার সময় দরজা বন্ধ।
রাজনীতি তো শুধু একটি কক্ষ। অন্য কক্ষগুলো আরও অন্ধকার। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৪২.৬৮% (পুরুষের ৮২.৪%)। ৬৫% নারী ব্যাংকবিহীন। ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণে নারী ৭%।
পোশাক খাত নারীদের কাঁধে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তাদের জীবন অনিশ্চিত, মজুরি অনিয়মিত।
অনলাইন ও বাস্তব -- দুটো জায়গাতেই পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। ৬৬% নারী অনলাইনে হুমকি পেয়েছে। অনেকেই জনজীবন ছেড়ে গেছে -- পরাজয়ে নয়, ক্লান্তিতে। কেউ মুখ ঢেকে বের হয় -- দূষণের জন্য নয়, চিনে ফেলার ভয় থেকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থী প্রার্থী বেড়েছে ৩৩.২৫%। নারীবিরোধী বক্তব্য এখন প্রান্তিক নয় -- মূলধারায় ঢুকেছে। নারী ফুটবল খেলবে না, প্রকাশ্যে আসবে না -- এমন দাবিও উঠছে। এটাই জনজীবনের নতুন তাপমাত্রা।
আর ঘরের ভেতরে আরেক বাস্তবতা --
যা কোনো সূচক মাপতে পারে না। ৭৬% নারী জীবনে কোনো না কোনো সময়ে আপনজনের কাছ থেকে সহিংসতার শিকার। গত এক বছরে ৪৯%। এদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো প্রকার সহায়তা চায়নি। কারণ -- “এটা তেমন গুরুতর কিছু না।” এই বাক্যটাই সব বলে দেয়। আইনেও বৈষম্য আছে। সংবিধান সমতা দেয় কিন্তু ব্যক্তিগত আইন তা কেড়ে নেয়। তাই বাংলাদেশ ২৪তম, সংসদে ৭ নারী -- দুটোই সত্য। একসাথে সত্য।
কিন্তু একটি অন্যটাকে বাতিল করে না। এই সূচকগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অংশগ্রহণ মাপে কিন্তু বাড়ি ফেরার ভয় মাপে না। ৭৬% বিষয়টি মাপে না -- খালি চেয়ার মাপে না। প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা অগ্রগতিগুলো বাস্তব, কিন্তু যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন এখন পরিষ্কার: বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক প্রশংসাতেই সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি ঘরের ভেতরের বাস্তবতাও বদলাবে?
জুলাই ২০২৪ এখনও স্মৃতিতে তাজা। সেই নারীরা -- যারা অপেক্ষা করেনি এবং এগিয়ে এসেছিল। এখন সেই স্মৃতির জন্যও লড়াই চলছে প্রদর্শনীতে, সংগঠনে, লেখায়। এটা একটি অসমাপ্ত বিপ্লব। আর সবচেয়ে অসমাপ্ত অধ্যায়টি নারীদের।
শেষ প্রশ্নটা সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর: নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে -- এটা কে ঠিক করল?
আর যারা যেই ঘরে বসে সেটা গড়ে দিল -- সেই নারীরা কি সেই ঘরে ছিল? ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত উত্তরটা সকলের জানা।
সুবর্ণা আক্তার লাবনী ও মাহবুবা ইসলাম ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স-এর গবেষক।
What's Your Reaction?