সংস্কারের সময় এখনই

সমাজের রক্ষণশীল অংশ প্রায়ই “প্রথাগত পরিবার”–এর কথা উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবে সমাজের অনেক স্তরেই সেই আদর্শ কাঠামো ভেঙে গেছে বা পরিবর্তিত হয়েছে। এই বাস্তবতা ধর্মীয় উপদেশ বা প্রচারের মাত্রা যতই বাড়ুক না কেন, তাতে পরিবর্তিত হবে না।

Apr 19, 2026 - 17:20
সংস্কারের সময় এখনই

আমি দেশের যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দুটি ন্যূনতম, কিন্তু অত্যন্ত জরুরি অনুরোধ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে একাধিকবার চিঠি লিখেছি। দুঃখজনকভাবে, সেই আবেদনগুলো কার্যত কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি।

অধ্যাপক ইউনুসের উদ্যোগে গঠিত এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে পরিচালিত "সংবিধান সংস্কার কমিশন"-এর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল যে সংবিধানে বৈষম্য নিষেধের তালিকাটি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ধর্ম, জাতিসত্তা, বর্ণ, গায়ের রং, আদিবাসী পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত, শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জন্মস্থান -- এবং আরও অনেক বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলাম যে এই তালিকায় “যৌন অভিমুখিতা” এবং “লিঙ্গ পরিচয়”কে অন্তর্ভুক্ত করা হউক -- “লিঙ্গ” এবং “লিঙ্গ পরিচয়” আলাদা বিষয় এবং উভয়েরই স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। এই দুটি মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত হলে যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সকল সদস্যদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্য সংবিধানগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি মৌলিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

প্রয়োজনে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুরক্ষা লাভ করতে সক্ষম হব এবং রাষ্ট্রে আমাদের ন্যায্য অবস্থান নিশ্চিত করতে পারব। কোনো পক্ষপাতদুষ্ট বাড়িওয়ালা যদি আমাদের ভাড়াকৃত বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করে, অথবা কোনো প্রতিষ্ঠান প্রমাণিত বৈষম্যের ভিত্তিতে আমাদেরকে চাকরিচ্যুত করে, সে ক্ষেত্রে আশ্বাস ও ন্যায়বিচারের জন্য আমরা আমাদের প্রিয় সংবিধানের দিকেই প্রত্যাশা ভরে তাকাতে পারব।

দ্বিতীয় অনুরোধটি ছিল দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করতে। এটি বিলেতি ঔপনিবেশিক আমলের একটি আইন, যেখানে “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” যৌন সম্পর্ককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই অপরাধ সংঘটনের জন্য যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে "প্রকৃতি বিরুদ্ধ" অনুপ্রবেশই যথেষ্ট বলে গণ্য করা হয়েছে (উদাহরণ: পায়ুসঙ্গম)।

বাস্তবে এই ধারায় বাংলাদেশে শাস্তির নজির নেই। কিন্তু এই আইনটির অস্তিত্ব নিজেই একটি স্থায়ী ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করে। যদিও যে কোনো নাগরিকই এই আইনের বরখেলাপ করে অপরাধী হতে পারে, আইনটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে পুরো এলজিবিটি জনগোষ্ঠীকেই রাষ্ট্রের চোখে অপরাধীর অবস্থানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

এই আইনের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যদের মাধ্যমে সেটার অপব্যবহারেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছে -- আমাদের অনেককে অর্থের জন্য ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। তার উপর একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ দ্বারা আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ধর্ষিত হলে দ্বিতীয় জন অনেক সময় ন্যায়বিচার চাইতে দ্বিধায় ভোগে, কারণ আইনটি সম্মতি ও অসম্মতির পার্থক্য বিবেচনা করে না।

ফলে ভুক্তভোগী নিজেই দণ্ডিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে -- সম্প্রতি এরকম একজন পুরুষ নিরুপায় হয়ে এবং অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছে। অতএব এই বাস্তবতা কেবল আইনি নয়, গভীর মানবিক সংকটও তৈরি করে।

স্বীকার করতেই হবে যে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর প্রবল আপত্তির মধ্যে এই দুটি সংস্কার বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। দণ্ডবিধি থেকে ৩৭৭ ধারা আগামীতে বাতিলের সম্ভাবনা থেকে গেলেও সংবিধান সংশোধনের জানালাটি সীমিত। তার উপর একবার নতুন বা সংশোধিত সংবিধান অনুমোদিত হয়ে গেলে, তা পুনরায় পরিবর্তনের সুযোগ নিকট ভবিষ্যতে আর নাও আসতে পারে।

এই কারণেই আমি বাংলাদেশের যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই -- আত্মগোপনতা ও নীরবতার অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে, যত ক্ষুদ্র পরিসরেই হোক -- নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করুন, যাতে আমাদের সংশ্লিষ্ট বৈষম্যবিরোধী দুটি অতিরিক্ত মানদণ্ড (যৌন অভিমুখিতা এবং লিঙ্গ পরিচয়) অন্তত সংবিধান-সংক্রান্ত আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সামান্য সম্ভাবনাটুকুও তৈরি হয়। আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকেও অনুরোধ করছি এই প্রচেষ্টায় শামিল হতে।

আমি প্রবল সংশয় সত্ত্বেও আশাবাদী যে বাংলাদেশে এলজিবিটি অধিকারের প্রশ্নটি দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশেষ কোনো "সুবিধা" বা “বিশেষ অধিকার” হিসেবে নয়, বরং বৈষম্যবিরোধী ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখবে -- এবং কোনোভাবেই এটিকে “প্রচার” বা “প্রমোশন”-এর ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলবে না। এখানে আসলে প্রচারের মতো কিছুই নেই।

প্রায়ই বলা হয় যে বৈষম্য তুলে দিলে আরও মানুষ সমকামী হয়ে উঠবে। কিন্তু এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে যৌন অভিমুখিতা একজন ব্যক্তির অন্তর্গত জৈবিক বৈশিষ্ট্য -- এটি সামাজিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে তৈরি বা পরিবর্তিত হয় না। যা হতে পারে, তা হলো যে মানুষ নিজের পরিচয়কে অস্বীকার না করে বাঁচার সাহস পায়।

আরেকটি প্রচলিত আশঙ্কা -- রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলে সমাজে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়বে, পশ্চিমা ধাঁচের অশ্লীল ভোগবিলাসপূর্ণ প্রাইড পদযাত্রার মতো দৃশ্য দেখা যাবে। বাস্তবে, যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং এ ধরনের আয়োজন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। বিভিন্ন দেশের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার উপর নির্ভর করে এসব বিষয় বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে যদি কখনও এমন কিছু হয়ও, তা অবশ্যই স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, যেখানে সকলেই যোগদান করতে পারবে।

বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত হওয়া মানে যারই সামর্থ্য আছে, সে বাধ্য হয়ে পশ্চিমে পাড়ি জমাবে না। আবার এর অর্থ এও নয় যে দেশে বিভিন্ন নাইটক্লাবে অর্ধনগ্ন, মাতাল বা মাদকে আচ্ছন্ন মানুষের উচ্ছৃঙ্খল ডিজে পার্টি অনিবার্য হয়ে উঠবে। এমন পার্টি যদি কোথাও হয়ও, তা কেবল এলজিবিটি মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না -- কারণ এ ধরনের আয়োজন শুধু সমকামী বা রূপান্তরকামীদের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত বা একচেটিয়া কিছু নয়। এর অর্থ কেবল এই -- মানুষ যেন নিজের পরিচয় নিয়ে, নিজের পছন্দ অনুযায়ী, মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে এবং নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করতে পারে।

২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কণ্ঠ আরও জোরালো হয়েছে। সেই কণ্ঠস্বরের ভেতরে দৃঢ়ভাবে একটি বিশ্বাস কাজ করে যে তাদের মতামতই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিকতর বৈধ, অধিক গুরুত্বপূর্ণ, এবং আরও নির্ভুল; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ঐশ্বরিকভাবে অনুপ্রাণিত বলেও ধরে নেওয়া হয়।

এই বিশ্বাস বাংলাদেশের ধর্মীয় ডানপন্থী গোষ্ঠীর প্রায় প্রতিটি বক্তব্য ও আচরণেই প্রতিফলিত হয়। এই ভ্রান্ত ধারণাটিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ভেঙে দিতে হবে।

বাংলাদেশ ২.০–এর প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থানকে এমন উচ্চতর মর্যাদা দেওয়ার মতো কোনো ভিত্তি নেই, তারা যতই সেটিকে প্রতিষ্ঠা করতে চাক না কেন। তাই জুলাই ২০২৪ পরবর্তী সময়ে যে সকল যৌন সংখ্যালঘু, নাস্তিক, উদারপন্থী, মুক্তচিন্তক, বামপন্থী ও প্রগতিশীলরা নীরবতা বা উদাসীনতায় নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে (বা শুধু ফেইসবুকে হাউকাউ করার মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রেখেছে), তাদের এখনই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

এছাড়া এলজিবিটি মানুষদের ঘিরে যে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, তাও সংশোধন প্রয়োজন। এইআইভি/এইডস সহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি নির্ভর করে যৌন আচরণের ওপর, কারও পরিচয়ের ওপর নয়। নিরাপদ যৌনাচার (সেইফ সেক্স) বিষমকামী মানুষ সহ সবার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাকে ১৯৭০-এর দশক থেকে বাংলাদেশে যে সফল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চলছে, তার পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিৎ।

সমাজের রক্ষণশীল অংশ প্রায়ই “প্রথাগত পরিবার”–এর কথা উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবে সমাজের অনেক স্তরেই সেই আদর্শ কাঠামো ভেঙে গেছে বা পরিবর্তিত হয়েছে। এই বাস্তবতা ধর্মীয় উপদেশ বা প্রচারের মাত্রা যতই বাড়ুক না কেন, তাতে পরিবর্তিত হবে না।

বরং বস্তুগত ও শিক্ষাগত সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাবে (হোক সেটা বিপরীতলিঙ্গের মাঝে বা সমলিঙ্গের মাঝে) এবং ভবিষ্যতে তারা অধিক হারে বিবাহপূর্ব বা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা প্রদর্শন করবে। তাই বাস্তবতাকে সেটা যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই দেখা জরুরি, রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে কল্পনা করে তার ভিত্তিতে নয়।

বিবর্তন তত্ত্বের প্রসঙ্গ তুলে অনেক সময় বলা হয় -- সবাই যদি সমকামী হয়ে যায়, মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই যুক্তি বাস্তবতার মুখে একেবারেই হাস্যকর। ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বলছে -- এলজিবিটি মানুষের হার সবসময়ই সীমিত পরিসরে রয়েছে (সমগ্র মানবজাতির ৫-১০%)। তাছাড়া মানব সমাজের টিকে থাকার উপায় কেবল জৈবিক প্রজননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; লালনপালন, দত্তক গ্রহণ -- এসবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এই ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে। অন্য নারীর মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদান (সারোগেসি), নারী সমকামীদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম প্রজনন -- এসব পদ্ধতির মাধ্যমে সমলিঙ্গের দম্পতিরাও সন্তান গ্রহণ করতে পারে। এগুলোকে “প্রকৃতিবিরুদ্ধ” বলা হলে একই যুক্তি বন্ধ্যা বিষমকামী দম্পতিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কিন্তু সমাজ কখনো সেটা মনে করে না।

গবেষণায় এটিও দেখা গেছে যে যৌন অভিমুখিতা সরাসরি উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হয় না, কিছু বিরল কাকতালীয় ঘটনা ছাড়া।

সবশেষে, একটি মৌলিক সত্য স্মরণে রাখা প্রয়োজন -- যৌন সংখ্যালঘুরা প্রকৃতির বাইরে নয়, বরং প্রকৃতিরই অংশ। বৈচিত্র্যই প্রকৃতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, এবং সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই মানব সমাজের শক্তি নিহিত। সংস্কারের সময় এখনই। এই মুহূর্তটি যদি আমরা হাতছাড়া করি, তবে হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য আরেকটি সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

রিয়াজ ওসমানী একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow