বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানদের পরিচয়-সংকট

চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জটি ‘বাঙালি’ না ‘মুসলমান’ -- এই দ্বৈত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই দুই পরিচয়ের সহাবস্থানকে একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ও আত্মবিশ্বাসী সমাজের বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে উপলব্ধি করা। এই ভ্রান্ত দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেই বাঙালি মুসলমানরা তাদের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারে।

Jun 8, 2026 - 14:48
Jun 8, 2026 - 14:49
বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানদের পরিচয়-সংকট
Photo Credit: Shutterstock

বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানদের পরিচয়ের প্রশ্নটি কেবল একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিতর্ক নয় -- এটি মূলত একটি গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং জাতিসত্তার ভিন্ন ভিন্ন ধারণার সংঘাতে এই সংকটটি গড়ে উঠেছে।

এর শিকড় বহু পুরোনো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, ভারত বিভাগের অভিজ্ঞতা, পাকিস্তান পর্ব, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তীকালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনরুত্থান এবং দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তন -- সবকিছু মিলে এই পরিচয়-সংকটকে আকার দিয়েছে।

এই সংকটকে বুঝতে হলে এটিকে ধর্ম বনাম সংস্কৃতির সরল দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে চলবে না -- বরং একাধিক পরস্পর-সংযুক্ত মাত্রার আলোকে দেখতে হবে। প্রাথমিক পরিচয়ের প্রশ্ন -- বাঙালি, না মুসলমান? প্রত্যেক মানুষের মতোই বাঙালি মুসলমানদেরও একাধিক পরিচয় রয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, রাষ্ট্র এবং ধর্ম -- সবকিছু মিলেই একজন মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে। এই পরিচয়গুলো একে অপরকে বাতিল করে না -- কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে: কোনটি প্রধান?

বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে অনির্ধারিত -- তাদের প্রধান পরিচয় কি বাঙালি, নাকি মুসলমান? এই টানাপোড়েন পাকিস্তান আমলে শুরু হয়নি -- এর শিকড় ব্রিটিশ আমলেই। তখন ধর্মভিত্তিক আদমশুমারি, আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা, শিক্ষা ও ভূমির বৈষম্য, এবং উচ্চ শ্রেণিতে ওঠার প্রতিযোগিতা -- সবকিছু মিলিয়ে ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা এক জটিল অবস্থানে ছিল -- অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, আর ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তরা প্রশাসন, শিক্ষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ফলে বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে এক দ্বৈত বাস্তবতায় -- হিন্দুদের সাথে ভাষা ও সংস্কৃতিতে ঘনিষ্ঠতা, কিন্তু তাদের কাছ থেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দূরত্ব। এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় প্রাথমিক পরিচয়-সংকট।

মুসলিম শিক্ষাচর্চা, সাহিত্যচর্চা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের উত্থান মূলত মর্যাদা ও স্বীকৃতির অনুসন্ধানেরই প্রতিফলন।

১৯৪৭-এর আগেই প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল -- বাঙালি মুসলমানরা কি ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে নিজেদের স্থাপন করবে, নাকি একটি আলাদা মুসলিম রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে? পাকিস্তান পর্বে এর উত্তর ভিন্নভাবে আসে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাঙালি পরিচয় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং মুক্তিযুদ্ধ -- সবকিছু মিলিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তখন মর্যাদা, অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ বয়ানের দুর্বলতার ফলে ধর্মীয় পরিচয় ধীরে ধীরে আবার কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। ফলে আজও এই টানাপোড়েন রয়ে গেছে -- জাতিগত পরিচয় বনাম ধর্মীয় পরিচয়।

সংস্কৃতি, ধর্ম এবং সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ

এই সংকটের একটি বড় উৎস হলো বাঙালি সংস্কৃতি ও ইসলামী পরিচয়ের সম্পর্ক। বাঙালি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি হাজার বছরের বিকাশের ফল -- হিন্দু, বৌদ্ধ, সুফি, বৈষ্ণব ও মুসলিম ঐতিহ্যের সম্মিলিত অবদান এতে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি মুসলমানরা উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলামী ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। এর ফলে তারা ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেও ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে পেরেছিল।

কিন্তু যখন ধর্মকে একমাত্র বা প্রধান পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় -- তখন এই সমন্বয় ভেঙে পড়ে। যে সংস্কৃতি একসময় সকল বাঙালির যৌথ ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হতো -- সেটিকেই এখন অনেকে ধর্মীয় সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে একটি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি হয় -- ধর্ম বনাম সংস্কৃতি। এই প্রবণতা সংকট সমাধান করে না -- বরং তা আরও গভীর করে।

ইতিহাস, স্মৃতি এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

পরিচয়-সংকট আরও জটিল হয়েছে ঐতিহাসিক স্মৃতির বিভ্রান্তির কারণে -- বিশেষত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক অধিকার, ভাষাগত মর্যাদা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই চেতনা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফলে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিভক্ত করে ফেলেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে -- তাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি কী? এই বিভক্ত স্মৃতি একটি বিভক্ত পরিচয়ের জন্ম দেয়।

৯/১১-পরবর্তী বিশ্ব এবং ইসলামী চেতনার পরিবর্তন

বৈশ্বিক রাজনীতিও এই সংকটে ভূমিকা রেখেছে। ৯/১১-এর পর ইসলামকে ঘিরে সন্দেহ, নিরাপত্তা রাজনীতি এবং ‘সন্ত্রাসবাদ’ আলোচনার কেন্দ্রে আসে। ফলে মুসলমানদের মধ্যে দ্বৈত চাপ তৈরি হয় -- বাইরে থেকে সন্দেহ, ভেতরে প্রতিরক্ষামূলক ধর্মীয় পরিচয়ের জোরালো প্রকাশ। বাংলাদেশও এই প্রভাবের বাইরে ছিল না। স্যাটেলাইট মাধ্যম, অনলাইন ধর্মীয় বক্তৃতা এবং প্রবাসী সংযোগ -- সমাজে নতুন ধর্মীয় ধারা প্রবেশ করিয়েছে।

ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া

ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণ বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। এই উদ্বেগকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো ধর্মীয় ঐক্যকে আত্মরক্ষার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে কাজে লাগিয়েছে। ফলে এক ধরনের চক্র তৈরি হয়েছে -- একপাশের সাম্প্রদায়িকতা অন্যপাশকে আরও উস্কে দেয়। পরিচয় তখন বহুমাত্রিক না থেকে সংকীর্ণ ও প্রতিরক্ষামূলক হয়ে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং সামাজিক পরিবর্তন

মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের সমাজে বড় প্রভাব ফেলেছে। রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে বদলেছে -- কিন্তু সঙ্গে এসেছে নতুন ধর্মীয় চর্চা, পোশাক, সামাজিক ধারণা। ফেরত আসা শ্রমিকরা অনেক সময় আরও দৃশ্যমানভাবে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে -- যা গ্রাম্য সমাজে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে।

নতুন মধ্যবিত্তের উত্থান

এই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে -- যারা ঐতিহ্যগত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মতো নয় -- যাদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল সাহিত্য, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং ভাষা আন্দোলনের রাজনীতির মাধ্যমে।

এই শ্রেণিটি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক চাকরি বা শহুরে পেশাজীবী কর্মজগতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি; বরং প্রবাসী আয়, বিদেশে শ্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নির্মাণ, পরিবহন এবং অভিবাসী আয়ের সঙ্গে যুক্ত সেবাখাতের কর্মকাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে এই নতুন মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আরও দৃশ্যমান ধর্মীয়তার প্রকাশকে একত্র করেছে -- তারা একদিকে সন্তানদের ইংরেজি-মাধ্যমে শিক্ষিত করছে, জমিতে বিনিয়োগ করছে, ডিজিটাল মাধ্যম ভোগ করছে; অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও সমানভাবে সমর্থন দিচ্ছে। এই দ্বৈত প্রবণতাই বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র। ধর্মীয় পরিচয় শুধু দরিদ্রদের মধ্যেই নয়, বরং সামাজিকভাবে উত্থানশীল গোষ্ঠীতেও বিস্তৃত হয়েছে।

ধর্মীয় শিক্ষা: একটি অভ্যন্তরীণ প্রণোদনা

দেশীয় কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর তার মধ্যে শিক্ষা একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। গত কয়েক দশকে মাদ্রাসা, মসজিদভিত্তিক পাঠ, ব্যক্তিগত ধর্মীয় শিক্ষা এবং অনানুষ্ঠানিক ইসলামী শিক্ষার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক শহুরে অঞ্চলের বহু পরিবার ধর্মীয় শিক্ষাকে নৈতিক শৃঙ্খলা, সামাজিক মর্যাদা এবং কখনও কখনও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সময় খাদ্য, আবাসন ও প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প ব্যবস্থাও প্রদান করে।

তবে এই বিস্তার পরিচয় নির্মাণেও প্রভাব ফেলছে। যখন শিক্ষাব্যবস্থা এমন কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে যেখানে বাঙালি সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বহুত্ববাদী ঐতিহ্য, সমালোচনামূলক ইতিহাসচর্চা বা মুক্তিযুদ্ধের নাগরিক তাৎপর্যের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না, তখন তরুণদের আত্মপরিচয়ের পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে স্পষ্ট হয় -- শিক্ষার বিষয়বস্তু, দৃষ্টিভঙ্গি ও বৌদ্ধিক উন্মুক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সমাজ ধর্মীয় শিক্ষাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারে, যা নৈতিক কল্পনাকে প্রসারিত করে; আবার একই শিক্ষাকে এমনভাবেও নির্মাণ করতে পারে, যা সীমানা আরও কঠোর করে তোলে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই দুই প্রবণতাই সহাবস্থান করছে।

একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন

আঞ্চলিক, বৈশ্বিক, অভিবাসননির্ভর এবং দেশীয় --  এই বহুমাত্রিক প্রভাবগুলো একত্রে পরিচয়ের প্রশ্নটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের উত্থানকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কিংবা ভারতের ঘটনাবলি, কিংবা বৈশ্বিক ইসলাম-বিদ্বেষ, কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন -- এই একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বরং এটি বহু চাপের সম্মিলিত ফল: ভয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক গতিশীলতা, সাংস্কৃতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মর্যাদার অনুসন্ধান।

এই পরিচয়-সংকটের সমাধান অধিক সাম্প্রদায়িকতায় নয়, কিংবা ধর্মকে সংকীর্ণ সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার মধ্যেও নয়। একটি টেকসই পথ নিহিত রয়েছে এমন এক উদার, আধুনিক ও বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা ধর্ম ও সংস্কৃতি -- উভয়কেই বিস্তৃত পরিসরে পুনর্বিবেচনা করতে সক্ষম।

বাঙালি হওয়া এবং মুসলমান হওয়া -- এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব নেই। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ করতে পারে, এবং একই সঙ্গে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধে গভীরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে পারে। এই পরিচয়গুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সহাবস্থান, পারস্পরিক বিনিময় ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।

বিশ্বের অল্প কয়েকটি জাতির মতোই বাঙালিরা ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির জন্য দীর্ঘ ও ধারাবাহিক সংগ্রাম করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ --এই ইতিহাস মর্যাদা, ভাষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে অসামান্য আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে। এই অভিজ্ঞতাই একটি আত্মবিশ্বাসী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় গঠনের অন্যতম দৃঢ় ভিত্তি।

এই প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানদের বর্তমান সংকট অতিক্রম করতে প্রয়োজন বৌদ্ধিক ও নৈতিক পুনর্নবীকরণ। এর জন্য দরকার ইতিহাসের সঙ্গে সৎ সংলাপ, বাঙালি সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ভিত্তির স্বীকৃতি, এবং এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রতি অঙ্গীকার যা মানবিক মর্যাদা ও সহাবস্থানকে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে পরিচয়কে একক ও একচেটিয়া কোনো মাত্রায় সীমিত করার প্রবণতা থেকেও সরে আসতে হবে।

ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক চেতনা কখনোই ধর্মবিরোধিতা নয় -- এই বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি। একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সকল নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করে -- বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী বা ভিন্ন বিশ্বাসের অনুসারী -- সবার জন্যই। এটি ধর্মকে অর্থবহ রাখে, কিন্তু তাকে বর্জন বা বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হতে দেয় না।

এই প্রক্রিয়া শিক্ষা, জনসংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির পুনর্বিন্যাসের সঙ্গেও যুক্ত। ধর্মীয়, সাধারণ ও নাগরিক শিক্ষা পরস্পর বিচ্ছিন্ন জগত হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মের সামনে ইতিহাস, সাহিত্য, নৈতিক চিন্তা ও সমালোচনামূলক বোধের পাশাপাশি পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী ধর্মীয় জ্ঞানও থাকা উচিত।

তাদের জানতে হবে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ঐতিহ্য এবং সহাবস্থানের নৈতিক মূল্য। এই ভিত্তি ছাড়া পরিচয় সহজেই প্রতিরক্ষামূলক ও সংকীর্ণ হয়ে ওঠে।

অতএব, চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জটি ‘বাঙালি’ না ‘মুসলমান’ -- এই দ্বৈত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই দুই পরিচয়ের সহাবস্থানকে একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ও আত্মবিশ্বাসী সমাজের বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে উপলব্ধি করা। এই ভ্রান্ত দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেই বাঙালি মুসলমানরা তাদের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারে।

পেছনে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪০, ৫০ ও ৬০-এর দশকে বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় প্রথমত গড়ে উঠেছিল এমন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে, যা প্রথাগত রক্ষণশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করে ভাষা, সাহিত্য ও ধর্মনিরপেক্ষ জনপরিসরের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো এই সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে আরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সামাজিক ভিত্তি দেয়।

ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পাকিস্তানি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম -- এই ধারাবাহিকতা সংস্কৃতিকে কেবল বৌদ্ধিক অনুশীলন থেকে বের করে একটি শক্তিশালী গণরাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

কিন্তু ১৯৭১-এর পর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দুর্বলতা আংশিকভাবে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও বিকৃতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। শুধুমাত্র আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি টিকে থাকতে পারে না; তাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সক্রিয় সমর্থন।

এই প্রক্রিয়া অনুপস্থিত হলে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ তার সংগঠিত শক্তি ও সামাজিক প্রভাব হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

ড. সেলিম রায়হান বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-এর নির্বাহী পরিচালক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow