ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন: প্রবাসী আয়ের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় কেন জরুরি

বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রবাসী আয় ও প্রবাসী অর্থনীতি বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়। এটা আমলাতন্ত্র বাড়ানোর প্রস্তাব নয় -- এটা প্রাতিষ্ঠানিক সততার দাবি।

May 18, 2026 - 15:20
ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন: প্রবাসী আয়ের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় কেন জরুরি
Photo Credit: Shutterstock

গত বছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ প্রবাসী আয় থেকে ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের আয়কে ছাড়িয়েছে -- আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিবৃতিটি দিয়েছে এবং অর্থমন্ত্রী প্রবাসী কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কয়েকজন অর্থনীতিবিদ মতামত নিবন্ধ লিখেছেন। তারপর, ঢাকার চিরাচরিত নিয়মে সবাই বিষয়টা ভুলে গেছে।

কেউ সহজ প্রশ্নটা করেনি -- যখন প্রবাসী আয় আমাদের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকটাই জোগায়, প্রায় পুরো পোশাক রপ্তানি আয়ের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রার ধাক্কা -- প্রতিটি সংকটে দেশের সবচেয়ে স্থিতিশীল আয়ের উৎস হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে, তখন আমরা এটাকে কেন এখনও একটি গৌণ বিষয়ের মতো করে দেখি?

আমি বহু বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী আয়ের পথ তৈরি করার কাজ করেছি। শারজাহর ডরমিটরিতে বসে আমি সেই নির্মাণশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা প্রতি মাসে দেশে তাদের পরিবারদেরকে ৩০০ ডলার করে পাঠায় যা সেই পরিবারগুলোর কোনো বাড়তি খরচ নয়, বরং পুরো পরিবারের ভরসার স্তম্ভ। সন্তানের স্কুল ফি, চিকিৎসা খরচ -- সবকিছুই এর ওপর দাঁড়ায়।

আরেকটা বাস্তবতা আছে। এই অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে যে ঋণের বোঝা নিয়ে তারা বিদেশে গিয়েছে, সেই কিস্তিও এই টাকাই বহন করে। অথচ ঢাকার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এটাকে এমনভাবে দেখে, যেন বিষয়টি প্রায় অস্তিত্বহীন। সমস্যাটা সরাসরি বলি -- বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অর্থনীতি বর্তমানে পাঁচটি আলাদা মন্ত্রণালয়ের হাতে ছড়িয়ে আছে: প্রবাসী কল্যাণ, অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এদের কারও কাছে পূর্ণ চিত্রটি নেই -- পুরো ব্যবস্থার জন্য কেউ দায়বদ্ধও নয়।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানে কতজন কর্মী দেশ ছাড়লো, তারা প্রশিক্ষণ পেল কি না। কিন্তু বিনিময় হার নীতিতে তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পথে শ্রমিকরা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ব্যাংকের বদলে ডরমিটরির দরজায় থাকা হুন্ডি কারবারিদেরকে কেন বেছে নেয় -- সে সম্পর্কে তাদের বাস্তব ধারণা নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয় প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগ বন্ড তৈরি করে, কিন্তু পূর্ব লন্ডনের একজন নার্স বা দাম্মামের একজন ঝালাইকারীর কাছে সেটার খবর পৌঁছানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রশ্নটার মালিক কেউ না -- উত্তরও কেউ দেয় না।

অন্যদিকে পোশাক খাতকে দেখুন! তাদের আছে শক্তিশালী সংগঠন, নিবেদিত মন্ত্রণালয়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচক, শুল্ক ফেরত ব্যবস্থা, রপ্তানি সহায়তা অবকাঠামো। বছরে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার আয় করে এই খাত, এবং যথার্থভাবেই তারা শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ পায়।

প্রবাসী আয় এখন ৩০ বিলিয়ন ডলার -- এটা তৈরি করেছে কোনো কারখানার মালিকরা নয়, বরং ৮০ লাখ শ্রমিক, যারা নিজেদের শ্রম আর ত্যাগ দিয়ে এক অদৃশ্য রপ্তানি খাত গড়ে তুলেছে, যা প্রতি মাসে আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখে। তাদেরও একই গুরুত্ব প্রাপ্য। শ্রমিকরা তাদের কাজ করেছে। রাষ্ট্র করেনি।

হুন্ডির প্রসঙ্গটা সরাসরি বলা দরকার, কারণ এ বিষয়ে প্রচলিত ধারণা প্রায় পুরোপুরি ভুল। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অবস্থান ছিল -- হুন্ডি একটি আইন প্রয়োগের সমস্যা। কারবারিদের দমন করলেই প্রবাহ আনুষ্ঠানিক পথে আসবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের অংশ ৬২ শতাংশ থেকে ৮৭ শতাংশে উঠেছিল। বলে হয়েছে যে আইন প্রয়োগ তার কাজ করেছে।

আসলে যা ঘটেছে তা হলো -- নির্দিষ্ট হুন্ডির জালগুলোর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু হুন্ডির মূল আকর্ষণগুলো বদলায়নি, যা হচ্ছে দ্রুততা, কোনো প্রকার ফি-এর অনুপস্থিতি, গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা, সস্তা ফোনে অ্যাপের অপ্রয়োজনীয়তা এবং ব্যাংক শাখা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে না গিয়ে ঘরে বসেই নগদ টাকা পাওয়া যাওয়ার আনন্দ। এই সুবিধাগুলো এখনও অটুট আছে। জালগুলো আবার গড়ে উঠলে প্রবাহও আবার সেদিকেই যাবে।

৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয়ের অর্থনীতির পুলিশি ব্যবস্থাপনা অসম্ভব। দরকার এমন একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যা সত্যিকারের প্রতিযোগিতায় হুন্ডিকে হারাতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন পণ্য ভাবনা, নীতিগত কল্পনা, এবং এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তাৎক্ষণিক স্থূল নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এখন চার ঘণ্টার মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে -- এটা বড় সাফল্য।

কিন্তু ব্যবহারকারীর জন্য সহজ, দ্রুত, বিনা ফি, সস্তা ফোনে বাংলায় চালানো যায় -- এমন কোনো ব্যবহারযোগ্য মাধ্যম ছাড়া এই অবকাঠামো একটা রাস্তার মতো, যার প্রবেশমুখই নেই। প্রযুক্তি আছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই।

বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রবাসী আয় ও প্রবাসী অর্থনীতি বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়।

এটা আমলাতন্ত্র বাড়ানোর প্রস্তাব নয় -- এটা প্রাতিষ্ঠানিক সততার দাবি। এমন একটি মন্ত্রণালয়, যা বিনিময় হার, প্রণোদনা ও চ্যানেল নীতির সমন্বয় করবে; যা দ্রুত ছাড়পত্র দিয়ে শূন্য-ফি ডিজিটাল সেবা চালু করতে পারবে এবং নতুন উদ্ভাবনের জন্য পরীক্ষামূলক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলবে; যা প্রবাসী বিনিয়োগ বন্ড তৈরি করবে এবং সেগুলোকে উপসাগর, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী সম্প্রদায়ের কাছে বাস্তবিকভাবে পৌঁছে দেবে -- যেভাবে ভারত বহু বছর ধরে করছে।

আরও বড় বাস্তবতা আছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের মাথাপিছু আয়ের সাথে ফিলিপাইনের শ্রমিকদের আয়ের যেই ব্যবধান রয়েছে (বছরে প্রায় ১,৭০০ ডলার), তা শুধু একটি সংখ্যা নয় -- এটা দক্ষতা উন্নয়ন ও সমষ্টিগত দরকষাকষির ক্ষমতায় গভীর ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই ব্যবধান কমানো শুধু নীতিগত চিরকুট দিয়ে সম্ভব নয় -- এর জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দরকার।

২০২৫ অর্থবছরের সর্বোচ্চ অর্জনটি অবশ্যই বাস্তব -- আমি সেটাকে খাটো করে দেখছি না। কিন্তু এর একটি বড় অংশ এসেছে ঘটনাচক্রে -- অনানুষ্ঠানিক জালগুলো ভেঙে পড়েছিল বলে। সেগুলো ধ্বংস হয়নি, শুধু সাময়িকভাবে বিশৃঙ্খল হয়েছিল। পরবর্তী ১০ বিলিয়ন ডলার কোনো দুর্ঘটনা থেকে আসবে না; আসবে সচেতন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ থেকে -- যেটা করতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অনিচ্ছুক।

আজ সকালেও ৮০ লাখ শ্রমিক উপসাগর, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ঘুম থেকে উঠে দেশে টাকা পাঠিয়েছে। তারা স্বীকৃতি চায়নি। তারা নীরবে চেয়েছে যে রাষ্ট্র তাদের অবদানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিক, এবং তার উপযুক্ত কিছু গড়ে তুলুক। শ্রমিকরা তাদের কাজ করেছে। এখন রাষ্ট্রের পালা। আমাদের প্রবাসী আয় পোশাক খাতের আয়ের সমান। তাহলে একটির জন্য মন্ত্রণালয় থাকবে, আর অন্যটির জন্য শুধু একটি পরিপত্র?

সুদর্শন সুবাশিষ দাস "ডিঙ" নামের একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্মে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের আঞ্চলিক বাণিজ্য বিভাগের মহাব্যবস্থাপক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow