এআরটি নিখুঁত নয়, কিন্তু স্থায়ী জিএসপির স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশকে বন্ধ করতেই হবে

বর্তমান বিশ্বে বাজার–প্রবেশ ক্রমশ যুক্ত হচ্ছে শ্রমমান, পরিবেশনীতি, ভূরাজনৈতিক অবস্থান, ডিজিটাল শাসন ও পারস্পরিকতার সঙ্গে। এটি অন্যায্য মনে হতে পারে, কিন্তু বাণিজ্যের দিকনির্দেশ এখন এদিকেই যাচ্ছে।

Jun 8, 2026 - 14:57
Jun 8, 2026 - 14:58
এআরটি নিখুঁত নয়, কিন্তু স্থায়ী জিএসপির স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশকে বন্ধ করতেই হবে

অন্য যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির মতোই ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (এআরটি) নিখুঁত কিছু নয়। এতে শুল্ক, মানদণ্ড, শুল্ক প্রশাসন, শ্রম, ডিজিটাল বাণিজ্য ও বাজার–প্রবেশ সংক্রান্ত নানা বাধ্যবাধকতা আছে এবং এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ ও বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে অসম দরকষাকষির বাস্তবতাও প্রতিফলিত করে। তাই এই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক স্বাভাবিক।

তবে এআরটিকে নিছক আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে এমন কিছু হিসেবে দেখা উচিত, যা বাংলাদেশ আগে খুব কমই পেয়েছে -- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক বাণিজ্য কাঠামো। বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাঠামোগতভাবে ছিল দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর একটি -- বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে -- কিন্তু এই সম্পর্ক কোনো পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির ওপর দাঁড়ায়নি। বরং সাধারণ শুল্ক, একতরফা অগ্রাধিকার কর্মসূচি, বিনিয়োগ চুক্তি, করব্যবস্থা ও সংলাপ–ফোরামের ওপর নির্ভর করেছে।

এআরটি সেই বাস্তবতা বদলেছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ শুধু সুবিধা চাইছে না -- বরং শর্ত নিয়ে আলোচনা করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম ‘পারস্পরিক’ বাণিজ্য চুক্তি। এতে চুক্তিটি সমান বা পুরোপুরি ন্যায্য হয়ে যায় না -- কিন্তু এটুকু নিশ্চিত হয় যে বাংলাদেশ আর বাণিজ্য কূটনীতির অপেক্ষাকক্ষে নয়, বরং নিয়ম নির্ধারণের ঘরে প্রবেশ করেছে।

জিএসপি কেন কখনোই যথেষ্ট ছিল না

১৯৭১–এর পর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েকটি অর্থনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত হলেও প্রকৃত বাণিজ্য চুক্তি ছিল না বললেই চলে। ১৯৮৬ সালের দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি বিনিয়োগ সুরক্ষা দিয়েছে। ২০১৩ সালের 'টিফকা' কেবল আলোচনার কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু কোনোটি সরাসরি শুল্ক কমায়নি বা বাজার–প্রবেশ নিশ্চিত করেনি।

বাংলাদেশি নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজ যে ব্যবস্থাটির সঙ্গে আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়ে, সেটি ছিল জিএসপি -- "সাধারণ অগ্রাধিকার সুবিধা"। কিন্তু এটিও কোনো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ছিল না; এটি ছিল একতরফা মার্কিন কর্মসূচি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো -- এটি বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, তৈরি পোশাককে অন্তর্ভুক্তই করেনি।

জিএসপি মূলত তামাক, ক্রীড়া সরঞ্জাম, সিরামিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যে প্রযোজ্য ছিল -- পোশাকে নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির মূল অংশ যেহেতু পোশাকনির্ভর, সেহেতু জিএসপির বাস্তব অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল খুবই সীমিত।

সংখ্যাগুলোই তা প্রমাণ করে। ২০১২ সালে জিএসপির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে মোট আমদানি ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার -- যার মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ছিল মাত্র ৩৪ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো এ সুবিধা থেকে বিলিয়ন ডলারের পরিমাণে উপকৃত হয়েছে।

তবুও ২০১৩ সালে শ্রম অধিকার ইস্যুতে জিএসপি স্থগিত হওয়ার পর বাংলাদেশ বছরের পর বছর এটি পুনরুদ্ধারের পেছনে ছুটেছে। একের পর এক সরকার এটিকে বাণিজ্য কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছে। এর পেছনে ছিল একটি সমস্যাজনক মানসিকতা।

জিএসপির প্রতি এই আসক্তি মূলত ‘অগ্রাধিকার’ ও ‘স্বীকৃতি’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এসেছে। কিন্তু অগ্রাধিকার বা স্বীকৃতি -- কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না। একটি দায়িত্বশীল বাণিজ্য নির্ভর রাষ্ট্র কখনোই ধনী দেশগুলোর একতরফা সুবিধার ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভর করতে পারে না। টেকসই শক্তি আসে দরকষাকষি, মানোন্নয়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং প্রকৃত পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে। এখানেই এআরটির গুরুত্ব।

সার্বভৌমত্বের অবসান নয়, বরং সমঝোতা

অনেক সমালোচক মনে করেন এআরটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব খর্ব করে। এই ধারণা ভ্রান্ত। বাস্তবে এআরটি উভয় দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ চাইলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে, রাশিয়া থেকে পণ্য কিনতে পারবে, নিজস্ব শিল্প সুরক্ষা দিতে পারবে, এমনকি নিজস্ব মানদণ্ডও বজায় রাখতে পারবে। চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার প্রত্যাখ্যানও করতে পারবে।

তবে একটি শর্ত আছে -- এসব সিদ্ধান্ত নিলে যুক্তরাষ্ট্রও তখন তার নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এই জায়গাটিই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়।

এআরটি কোনো শৃঙ্খল নয় -- এটি একটি বিনিময়। বাংলাদেশ কম শুল্ক বা শূন্য শুল্কে বাজার–প্রবেশের সম্ভাবনা পায় -- বিনিময়ে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বাজার–প্রবেশ সংক্রান্ত কিছু অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়।

ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশ মনে করে এই অঙ্গীকার লাভজনক নয়, তবে চুক্তি থেকে সরে গিয়ে বেশি শুল্ক দিয়েই বাণিজ্য করতে পারবে। বিকল্পটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় নয়, বরং ব্যয়বহুল বাজার–প্রবেশ। সহজভাবে -- বাংলাদেশ যা খুশি করতে পারে, তবে ছাড়কৃত শুল্কে নয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তৈরি পোশাক খাতে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয় এবং আমদানির তুলনায় রপ্তানি অনেক বেশি। আগে এই ভারসাম্যহীনতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহনীয় ছিল, কিন্তু এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে ‘পারস্পরিকতা’ অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফলে প্রশ্নটি স্পষ্ট -- যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশ কি এআরটির শর্তগুলো মানতে প্রস্তুত? যতদিন বাংলাদেশ সীমিত কিছু রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন এআরটি মতো চুক্তির গুরুত্ব থাকবে। কিন্তু প্রকৃত সার্বভৌমত্ব আসবে তখনই, যখন অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় হবে যে কোনো একক চুক্তিই আর নির্ধারক হয়ে উঠবে না।

স্থায়ী অগ্রাধিকার যুগের অবসান

আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে আসবে। এর অর্থ একতরফা স্থায়ী বাণিজ্য সুবিধার যুগ শেষের পথে। এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে মূলত দুই ধরনের পথ খোলা। একটি হলো পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যেখানে ব্যাপক শুল্ক হ্রাস ও গভীর বাধ্যবাধকতা থাকে।

অন্যটি হলো এআরটির মতো লক্ষ্যভিত্তিক পারস্পরিক চুক্তি, যা শুল্ক, মানদণ্ড, শ্রমনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল, ডিজিটাল বাণিজ্য ও কৌশলগত সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘সেকশন ৩০১’ পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে যে বিশেষ চুক্তি না থাকলে জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে অতিরিক্ত ১০–১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। ফলে জিএসপি ধাঁচের ‘চিরস্থায়ী অগ্রাধিকার ব্যবস্থা’ -- যেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের বাজার খুলে রাখবে আর বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নীতিগত স্বাধীনতা ভোগ করবে -- সেই বাস্তবতা আর নেই।

বর্তমান বিশ্বে বাজার–প্রবেশ ক্রমশ যুক্ত হচ্ছে শ্রমমান, পরিবেশনীতি, ভূরাজনৈতিক অবস্থান, ডিজিটাল শাসন ও পারস্পরিকতার সঙ্গে। এটি অন্যায্য মনে হতে পারে, কিন্তু বাণিজ্যের দিকনির্দেশ এখন এদিকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশের করণীয় হলো এই নতুন কাঠামোর মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে শেখা। উদাহরণস্বরূপ, এআরটির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বেশি ব্যবহার করে কীভাবে পোশাক রপ্তানিতে কম বা শূন্য শুল্ক পাওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

সবশেষে, এআরটির মতো চুক্তি স্থির নয় -- সময়ের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে এগুলো সংশোধনযোগ্য। কিন্তু জিএসপি ধাঁচের স্থায়ী সুবিধার আশায় বসে থাকা আর বাস্তবসম্মত নয়। সেই সময় শেষ।

শাফকত রাব্বী একজন ভূ-রাজনৈতিক কলাম লেখক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

Shafquat Rabbee Shafquat Rabbee Anik is a political commentator