যে নির্বাচন বাংলাদেশের প্রয়োজন, কিন্তু যা হচ্ছে না

সময়ের দিক থেকেও কথাটা একেবারে ঠিক জায়গায় এসে পড়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ আবার পরিচিত এক ঘোরে ঢুকে পড়েছে। লক্ষ করার বিষয় হলো -- কী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী বলা হচ্ছে না।

Feb 5, 2026 - 12:30
Feb 5, 2026 - 15:41
যে নির্বাচন বাংলাদেশের প্রয়োজন, কিন্তু যা হচ্ছে না
ছবির ক্রেডিট: এনভাটো
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যে প্রচারবাক্যটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা সার্বভৌমত্বের মতো আবেগী নয়, আবার ষড়যন্ত্রের মতো বিস্ফোরকও নয়। দরকার আরও সোজাসাপটা, নির্লিপ্ত, প্রায় নির্দয় একটি কথা -- সব আবেগ ছেঁটে ফেলে বলা যায় এমন কিছু। আমাদের প্রেক্ষাপটে সেটি হতে পারে খুব সংক্ষেপে: সমস্যাটা অর্থনীতির, ব্যস।

সময়ের দিক থেকেও কথাটা একেবারে ঠিক জায়গায় এসে পড়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ আবার পরিচিত এক ঘোরে ঢুকে পড়েছে। ১৯৪৭ হাজির হচ্ছে পূর্বপুরুষের ভূতের মতো, ১৯৭১ তুলে ধরা হচ্ছে নৈতিক পুঁজি হিসেবে, আর ২০২৪-কে বানানো হচ্ছে অস্তিত্বের শেষ পরীক্ষার মুহূর্ত। প্রতিটি সমাবেশ ভরে উঠছে বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, ভেতরের শত্রু আর বাইরের হাতের ভাষায়। লক্ষ করার বিষয় হলো -- কী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী বলা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ কীভাবে তার বিল পরিশোধ করবে, শিল্পখাত কীভাবে বাড়বে, কিংবা কেন নিজের নাগরিকরাই আবার নিজের দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছে -- এই প্রশ্নগুলো নিয়ে কোনো ধারাবাহিক আলোচনা নেই।

বাংলাদেশে আজ প্রতীকের অভাব নেই। কিন্তু সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি আছে, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আছে। সাথে ঋণ পরিশোধের চাপ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। টাকা ধারাবাহিকভাবে মূল্য হারাচ্ছে -- কোনো একক খলনায়কের কারণে নয়, বরং সক্ষমতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্যের কারণে।

আকাশরেখায় একের পর এক মেগা প্রকল্প দাঁড়িয়ে আছে ইচ্ছার ঘোষণার মতো। কিন্তু শুধু সুদের অর্থ পরিশোধেই বছরে প্রায় সাতশ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বোঝা রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এটা কোনো মতাদর্শগত সমস্যা নয়। এটা নিখাদ অঙ্কের সমস্যা। অথচ রাজনৈতিক বৃন্দ হিসাবনিকাশের বদলে ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ইতিহাস টানা যায়, বাঁকানো যায়, সেটাকে অস্ত্র বনিয়ে ফেলা যায়। অর্থনীতি ততটা ক্ষমাশীল নয়।

মূল্যহ্রাসমান মুদ্রা ১৯৭১-এ কে মিছিল করেছে, তা জানে না। দেশপ্রেমের ধ্বনি-বাক্যে পুঁজি আটকে থাকে না। দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সার্বভৌমত্বের বক্তৃতা শুনছে না -- তারা জানতে চাইছে নিয়ম সবার জন্য সমান কি না, চুক্তি মানা হবে কি না, আর নীতিমালা প্রতিটা মন্ত্রীর সঙ্গে পাল্টাবে কি না।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি ভূখণ্ডগত বা আদর্শিক নয় -- এটি আর্থিক।

যে দেশ করভিত্তি বাড়াতে পারে না, রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে পারে না, কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে পারে না, সে দেশ ধীরে ধীরে তার সিদ্ধান্তক্ষমতা ঋণদাতা, পণ্যমূল্যের চক্র আর বন্ধ দরজার ভেতরের জরুরি আলোচনার হাতে তুলে দেয়। সীমান্তে যুদ্ধ না হয়েও সার্বভৌমত্ব ক্ষয়ে যায় -- লেনদেন ঘাটতির সংকটে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের দিকেই তাকানো যাক। একই সূচনাবিন্দু থেকে যাত্রা করা দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ভিয়েতনামের উদাহরণ প্রায়ই দেওয়া হয়, কিন্তু গুরুত্ব দিয়ে পড়া হয় না। তারা ঐক্যের বাগাড়ম্বরে নয় -- পূর্বানুমেয় শিল্পনীতি, রাজধানীর বাইরে প্রবৃদ্ধি ছড়িয়ে দেওয়া, আর বেসরকারি পুঁজির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই এগিয়েছে।

বাংলাদেশ সেখানে দ্বিধাগ্রস্ত। বক্তৃতায় বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানানো হয়, বাস্তবে তারা আটকে যায় বিধিনিষেধের জট, যানজট আর খেয়ালখুশিভিত্তিক সিদ্ধান্তে -- যেখানে উৎপাদনশীলতার চেয়ে ঘনিষ্ঠতাই বেশি পুরস্কৃত হয়। ফলাফল, বিনিয়োগের অঙ্ক কখনোই দুই বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরোয়নি।

এর সঙ্গে আছে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ। ঢাকা ফুলে উঠছে, জেলাগুলো ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। জমির দাম বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন খাত উচ্চমূল্য সংযোজনের ধাপে উঠতে পারছে না। একটি সংকীর্ণ শ্রেণি সম্পদ জমাচ্ছে, প্রায়ই প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষিত থেকে। আর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি লাখ লাখ মানুষকে গ্রাস করে ফেলছে -- নিরাপত্তা ছাড়া, ঊর্ধ্বগতিশীলতা ছাড়া।

এটা শুধু অন্যায় নয়। এটা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর। সমতাভিত্তিক মাঠ কোনো নৈতিক বিলাসিতা নয় -- এটা প্রবৃদ্ধির কৌশল।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আরেকটি অনালোচিত বৈপরীত্য। অনেকগুলোই প্রকৃত অর্থে শ্বেতহস্তী -- রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়বহুল, সংস্কারে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, আর মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। বেসরকারিকরণ শব্দটি উচ্চারণ করলেই সব শিবিরেই আদর্শগত অস্বস্তি তৈরি হয়।

কিন্তু বিশ্বের নানা জায়গায় অভিজ্ঞতা বলছে, মূল বিষয় বেসরকারিকরণ নয় -- শাসনব্যবস্থা। স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, আংশিক তালিকাভুক্তি আর স্বচ্ছ কর্মদক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা বেসরকারি খাতের হাতে বেপরোয়া হস্তান্তরের চেয়েও ভালো ফল দিয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে এগুলো শিখতে পারত। সাধারণত শেখে না।

ঢাকার বাইরে উন্নয়ন এখনো প্রচারণার বস্তু -- নীতিগত কাঠামো নয়। শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই প্রবৃদ্ধি বিকেন্দ্রীকরণ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা, সরবরাহব্যবস্থা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দরকার। না হলে দ্রুতগামী সড়ক কেবল মানুষ আর পুঁজিকে আবার ঢাকাতেই টেনে আনে। ফল দাঁড়ায় একদিকে ভারে নুয়ে পড়া মহানগর, অন্যদিকে ভোট দেয় কিন্তু সমৃদ্ধ হয় না — এমন এক প্রান্তভূমি।

এই নির্বাচনী মৌসুমে আবেগের অভাব নেই। অভাব আছে গুরুতর গাম্ভীর্যের। বিকল্প সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতাই নেই।

এম কে আরেফ অ্যানিমেডকেয়ারের একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow