শিশু যৌন নির্যাতন, ধর্মীয় ক্ষমতা, আর প্রতিষ্ঠানের নীরবতা

অনেক জায়গায় এখনো আইন-আদালতের প্রভাব কার্যকর নয়। সমাজ চলে ধর্মীয় প্রভাব, স্থানীয় পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা, আর জনতার ভয়ের আচ্ছন্নতায়। রাষ্ট্রের হাতে যেখানে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া ক্ষমতা থাকার কথা, বাস্তবে সেই ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে ধর্মীয় গোষ্ঠী, জনতা, আর প্রভাবশালী একটি জালের মধ্যে। ফলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে আদালতে যাওয়ার আগে সমাজের বিরুদ্ধে লড়তে হয়।

Apr 30, 2026 - 11:53
Apr 30, 2026 - 11:53
শিশু যৌন নির্যাতন, ধর্মীয় ক্ষমতা, আর প্রতিষ্ঠানের নীরবতা
Photo Credit: Shutterstock

“মানবিক কারণে মামলাটি সমঝোতার প্রক্রিয়ায় আছে” -- এই বাক্যটি শুধু হাস্যকর নয়, এটি নির্মম এবং গভীরভাবে হতাশাজনক। একটি বাক্যই একসাথে তুলে ধরে বাংলাদেশের বাস্তবতা: শিশু যৌন নির্যাতনের ভয়াবহতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্ব, এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়ের সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশে “মানবিকতা” শব্দটি অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করা হয়।

এখানে “মানবিক কারণ” বলতে আসলে মানবিকতার কিছুই নেই। বারবার দেখা যায় যে সকলের সহানুভূতি অপরাধীর দিকেই যায়, আর নীরবতা চাপিয়ে দেওয়া হয় ভুক্তভোগীর উপর -- যেখানে মানবিকতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ওই নয় বছরের শিশুটার জন্য -- যেই শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে ভয় পায়, মাকে কিছু বলতে পারে না এবং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

সমস্যাটা একক কোনো ঘটনার নয় -- এটা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর সমস্যা -- এমন এক কাঠামো, যেখানে শিশুধর্ষণের মতো অপরাধও "সমঝোতার" বিষয় হয়ে যায় -- যদি অভিযুক্ত একজন হুজুর হয়, যদি সে “বছরের পর বছর পড়িয়েছে,” যদি পরিবার দরিদ্র হয়, যদি স্থানীয় প্রভাবশালীরা বলে যে চুপচাপ মিটিয়ে ফেলাই ভালো। যেই অপরাধটি রাষ্ট্রীয়ভাবে (অর্থাৎ আইনিভাবে) গণ্য, সমাজ সেটাকে একজনের ব্যক্তিগত দুর্বলতায় নামিয়ে আনে। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা তার দাপটটি প্রকাশ করে।

শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আপস কোনো নৈতিকতা নয় -- এটা ক্ষমতাকে সুরক্ষা করার একটি অপচেষ্টা। এখানে প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, আর শ্রেণিগত শক্তি একসাথে কাজ করে শিশুর ন্যায়বিচারের দাবিকে দমন করতে। এটাকে যদি আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ধরি, তাহলে আসল সমস্যাটিকে আড়াল করে ফেলা হয়।

এটা একটা ধারা: মাদ্রাসার শিক্ষক, আবাসিক বা অনাবাসিক ছাত্র, দরিদ্র পরিবার, স্থানীয় সালিশ, আদালতে যেতে ভয়, শেষে “ক্ষমা” -- এই চক্র বারবার ফিরে আসে। বিশেষ করে যখন ঘটনা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঘটে, তখন অভিযোগটা আর একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকে না -- এটা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখা হয়। ফলে ভুক্তভোগীর পরিবার দ্রুত একঘরে হয়ে যায়। তারা ন্যায় বিচার চাইতে গিয়ে নিজেরাই অভিযুক্ত হয়ে পড়ে।

নোয়াখালীর ঘটনাটা দেখলেই বোঝা যায় যে অভিযোগ তোলার পর শুধু বিচার অস্বীকার করা হয়নি, বরং ভুক্তভোগীর বাড়ি ভাঙচুর, হামলা, আর “তৌহিদী জনতা”-র নামে সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। প্রশ্নটা খুব সরল: এই দেশে কি প্রতিষ্ঠানের সম্মান একটা শিশুর নিরাপত্তা আর মর্যাদার চেয়ে বড়?

একটা পরিবার পুলিশে গেছে -- এটাই তাদের “অপরাধ” হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মানে হলো, অনেক জায়গায় এখনো আইন-আদালতের প্রভাব কার্যকর নয়। সমাজ চলে ধর্মীয় প্রভাব, স্থানীয় পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা, আর জনতার ভয়ের আচ্ছন্নতায়। রাষ্ট্রের হাতে যেখানে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া ক্ষমতা থাকার কথা, বাস্তবে সেই ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে ধর্মীয় গোষ্ঠী, জনতা, আর প্রভাবশালী একটি জালের মধ্যে। ফলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে আদালতে যাওয়ার আগে সমাজের বিরুদ্ধে লড়তে হয়।

এই কথাগুলো আমি দূর থেকে বলছি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নীতিমালা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যবেক্ষণ করেছি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। আমি যা দেখেছি, সেটা উদ্বেগজনক। যৌন শিক্ষা, সম্মতি, শরীরের অধিকার, নির্যাতন প্রতিরোধ -- এসব বিষয়ে তাদের জ্ঞান প্রায় নেই বললেই চলে। সবকিছু ধর্মীয় নৈতিকতার ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সাথে সেই ব্যাখ্যার কোনো সংযোগ তৈরি হয় না।

ফলে নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার, যৌন উদ্দেশ্যে প্রভাবিতকরণ (গ্রুমিং), লজ্জা, নীরবতা -- এসব মোকাবিলার কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাই তৈরি হয় না -- যৌন সহিংসতাকে যদি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। তাকে অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে যদি না দেখা হয়, তাহলে সমস্যা আড়ালেই থেকে যাবে। নৈতিক শিক্ষা দিয়ে নির্যাতন ঠেকানো যায় না, যদি না মানুষ জানে সম্মতি কী, হয়রানি কী, নিরাপদভাবে অভিযোগ করা কী, মানসিক আঘাত (ট্রমা) কীভাবে কাজ করে ইত্যাদি।

বাস্তবে অনেক শিক্ষক নির্যাতনকে নীতিমালার সমস্যা হিসেবে না দেখে চরিত্রের সমস্যা হিসেবে দেখে। ফলে মূল প্রশ্নগুলো -- কীভাবে সেটাকে প্রতিরোধ করা যাবে, কীভাবে অভিযোগ নেওয়া হবে, কীভাবে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া হবে -- এসব অনুপস্থিত থাকে। আইন এখানে পরিষ্কার: শিশুধর্ষণ আপসযোগ্য অপরাধ নয়। কারণ আইন জানে যে পরিবার সবসময়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা দরিদ্র হতে পারে, ভীত হতে পারে, সামাজিক চাপে পড়তে পারে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের সামনে নতি স্বীকার করতে পারে।

রাষ্ট্র যদি বলে “পরিবার মাফ করে দিয়েছে,” তাহলে শিশুর অধিকারকে পরিবারের পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়। অথচ আধুনিক আইনের বড় অর্জনই হচ্ছে শিশু ও দুর্বল মানুষের অধিকারকে পরিবার বা সমাজের বাইরে এনে রাষ্ট্রের সুরক্ষায় রাখা।

মীমাংসার ভাষা তাই শুধু আইনি দুর্বলতাই নয়, এটা আধুনিক যুগের বিপরীতে ফিরে যাওয়া।

আরেকটা বড় সমস্যা -- ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে নীরবতা। “মেয়েদের ক্ষেত্রে এগুলো হয় শুনেছি, কিন্তু এটা আমার ছেলের সাথে হয়েছে” -- এই ধরনের প্রতিক্রিয়া আমাদের অজ্ঞতারই বহিপ্রকাশ।

৬ থেকে ১২ বছর বয়সে শিশুর বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও শরীর সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। সেই সময় যদি সে বারবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু ঘটনাটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে না -- তার নিজের শরীর, সম্পর্ক, আর পৃথিবীর উপর থেকে বিশ্বাসটা ভেঙে যায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এই নির্যাতন আরও ভয়াবহ -- কারণ এখানে অপরাধী শুধু শিক্ষক নয়, নৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিনিধিও। ফলে ক্ষতি দ্বিগুণ।

সব মাদ্রাসা একরকম -- এটা বলাটা ভুল হবে। কিন্তু এটাও সত্য যে, পর্যবেক্ষণের অভাব, দুর্বল পাঠ্যক্রম, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, আর প্রশ্নহীন ধর্মীয় মর্যাদা -- এসব মিলে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যেখানে এসকল নির্যাতন সহজে চাপা পড়ে যায়। এটা শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় -- এটা একটি কাঠামোগত সমস্যা।

রাষ্ট্র এখানে ব্যর্থ। রাষ্ট্র এখানে দারিদ্র্য দূর করতে পারেনি, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে রাজনৈতিক আপসের চক্র ভাঙতে পারেনি। ফলে একদিকে সরকার চরমপন্থা দমনের কথা বলে, অন্যদিকে সংস্কারহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈধতা দেয় -- যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তা, বিজ্ঞান, মানবাধিকার, শিশু মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক নয়।

এই দ্বৈত নীতি বিপজ্জনক। ভুক্তভোগীর মায়ের কথাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: “আমি কাজ করি, আদালতে দৌড়াতে পারি না… টাকা খরচ করলেও ওরা ছাড়া পেয়ে যাবে।” এটাই দরিদ্র মানুষের কাছে বিচারব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। তারা আইনের ভাষা না জানলেও ক্ষমতার ভাষা বোঝে। তাই বলে -- “উপরে আল্লাহ আছেন।”

এটা শুধু ধর্মীয় সান্ত্বনা নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতারও ভাষা। আমাদের সামাজিক ভণ্ডামিটাও স্পষ্ট। আমরা ধর্ম, পর্দা, নৈতিকতা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু সম্মতি, শরীরের অধিকার, মানসিক আঘাত নিয়ে চুপ থাকি। আমরা প্রতিষ্ঠানের সম্মান বাঁচাই, কিন্তু শিশুকে না।

যে সমাজে একজন হুজুর হওয়ার কারণে ধর্ষক সহানুভূতি পায়, আর মামলা করার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবার হামলার শিকার হয়, সেই সমাজের নৈতিক ভিত আগেই পচে গেছে। স্পষ্ট করে বলা দরকার: মাদ্রাসার “সম্মান” বাঁচাতে শিশু যৌন নির্যাতন চাপা দেওয়া ইসলামকে রক্ষা করা নয় -- বরং ইসলামকে অপমান করা।

যা করা দরকার: প্রথমত, শিশু যৌন নির্যাতনের মামলায় আপসের চাপ তৈরি করাটাকে কঠোরভাবে আইনের পরিপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ ব্যবস্থা, ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ছেলে-মেয়ে উভয়ের নির্যাতন নিয়ে সামাজিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাকে “ধর্মবিরোধী” বলে দমন করা বন্ধ করতে হবে।

যে সমাজে হুজুরের সম্মান শিশুর কান্নার চেয়ে বড়, সেখানে ন্যায়বিচার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর যেখানে দরিদ্র পরিবার বিচার চাইতে ভয় পায়, সেখানে সমতা এখনো আসেনি। আর যে সংস্কৃতিতে শিশুধর্ষণের মামলায় “মানবিক কারণে সমঝোতা” স্বাভাবিক শোনায়, সেই সংস্কৃতির মানবিকতার সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে।

ড. লুবনা ফেরদৌসি যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

অনুবাদিত, পরিমার্জিত ও সংক্ষিপ্ত

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow