যখন হাসির খোঁচা লাগে গণতন্ত্রে
পরীক্ষাটা খুব সহজ: আমাদের নেতারা কি রসিকতা সহ্য করতে পারেন? সমালোচনার সামনে পড়ে কি তারা হাতকড়া খোঁজেন? ভিন্নমত আর মিথ্যাঘটিত অপবাদ — এই দু’টির ফারাক কি তারা বোঝেন? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে আমরা কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সরিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিনি। আমরা কেবল মুখগুলো বদলেছি, আর এতে মোটেও হাসির কিছু নেই।
প্রশ্ন: হাসি-ঠাট্টার সবচেয়ে “ভয়ংকর অপরাধ” কী?
উত্তর: বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে মানুষকে হাসানো।
দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যঙ্গমাধ্যম ‘ইয়ারকি’-কে সম্প্রতি এক জামায়াত নেতার করা মামলায় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। অভিযোগ: মানহানি ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। সহজ করে বললে: এমন রসিকতা করা যেটা খুবই অস্বস্তিকরভাবে সত্যের কাছাকাছি গিয়ে লাগে। শুনে কি পরিচিত লাগছে? লাগারই কথা। সরকার বদলায়, নাটকের কাহিনি বদলায় না।
যে দাগ বারবার আমরা অতিক্রম করি
ছোটবেলায় ডিলবার্ট আর ক্যালভিন অ্যান্ড হবস গিলতাম গরম ভাতের মতো। হাসানোর পাশাপাশি ওগুলো ছিল আয়না -- স্কট অ্যাডামসের অফিস-খাঁচায় আর ওয়াটারসনের ছয় বছরের দার্শনিকের চোখে নিজের ভণ্ডামিগুলোই দেখতাম আমি। ব্যঙ্গচিত্রের এটাই কাজ -- আগে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে, তারপর ক্ষমতাকে।
বাংলাদেশেও এমন শিল্পী জন্মেছেন। রণবী ও শিশির ভট্টাচার্য শুধু ছবি আঁকেননি -- ক্ষমতার গায়ে আঁচড় কেটেছেন। রণবী ১৯৭৭ সালে টোকাই তৈরি করেন -- অদৃশ্য শিশুদের নয়, তাদের অদৃশ্য করে রাখা সমাজকে বিদ্ধ করতে। তিনি নিজেই বলেছিলেন: “ওদের নিয়ে হাসাহাসি করতে চাইনি। সমাজ তো আগেই সেই কাজটা করছিল।”
শিশির ভট্টাচার্য ফিরে এলেন তখনই, যখন এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আগুন জ্বলছে। তিনি গ্রামের ভেতরকার বাংলাদেশকে ছবিতে টেনে এনেছেন, যেই বাংলাদেশকে রাজধানীর অভিজাতরা ভুলে থাকতে চাইত। এরা শুধু কার্টুন-শিল্পী নন, এরা দেশের বিবেক, যা কালি দিয়ে আঁকা।
যে ধারা আমরা দেখতে চাই না
ডাকসুর সহ-সভাপতি আবু সাদিক কায়েম ১৮ জন ব্যক্তি আর ১৫টির বেশি ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, ইয়ারকিকেও বাদ দেননি। অভিযোগ: “বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ তৈরি” আর “অশ্লীল ও মানহানিকর” বস্তু। নাগরিক কোয়ালিশন এই মামলার সম্বন্ধে বলেছে: “পরিপক্বতার অভাব, অসহিষ্ণুতা ও অযৌক্তিকতা।” আসলে এটা নিছক শিশুতোষ আচরণ নয়। এটা বিরোধ দমন, মর্যাদা রক্ষার নামে রাজনৈতিক প্রতিশোধ।
যে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ মানুষের নিরাপত্তার কথা বলে এসেছিল, সেটাই এখন আগের সরকারের দমনযন্ত্রের অনুলিপি। নাগরিক সমাজ অনেক আগেই সতর্ক করেছিল যে এর অস্পষ্ট ভাষা আর বিস্তৃত ক্ষমতা আগের অত্যাচারই ফিরিয়ে আনবে। কেউ শোনেনি। হয়তো শোনেনি না, হয়তো শুনে গুরুত্ব দেয়নি। এক স্বৈরশাসনকে সরিয়ে আমরা শুধু নির্দেশিকা তুলে দিয়েছি নতুন ক্ষমতালোভীদের হাতে।
আমরা আসলে কী হারাচ্ছি
এটা ইয়ারকিকে রক্ষা করার লড়াই নয়। এটা সেই বাকি জায়গাটুকু রক্ষার লড়াই, যেখানে ভয় না পেয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়।
রণবী চাকুরে ছিলেন -- নিজ নামে রাজনৈতিক পোস্টার আঁকতে পারতেন না। তাই ছদ্মনাম। সেটা ষাটের দশক। আজ ছয় দশক পরে ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী এখনও পিছনে তাকিয়ে হাঁটেন। শিশির ভট্টাচার্য বলেছিলেন, এদেশে শিল্পী “চাকুরের মতোই -- বিলাসিতা নেই, রুটিরুজি নিয়েই ভাবতে হয়।” এবার সেই রুটি-রুজির সঙ্গে যোগ হয়েছে যেকোনো সময় তলব বা গ্রেপ্তারের ভয়।
অদৃষ্টের কী পরিহাস! যারা ন্যায় ও স্বাধীনতার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন করেছিল, তারাই এখন সেই ব্যঙ্গকারী মাধ্যমগুলোকে মামলার জালে ফেলছে, যারা আন্দোলনের সময়ে তাদের কণ্ঠকে বড় করেছিল।
বিশ্বের যে ঘরানা বাংলাদেশে এসে ঠেকেছে
শুধু বাংলাদেশ নয় -- সব স্বৈরশাসন ব্যঙ্গকারীদের ভয়ে কাঁপে। চার্লি হেবদোর কার্টুন-শিল্পীরা নিহত হয়েছিলেন তথ্য প্রকাশের জন্য নয়, হাসানোর জন্য। তুরস্ক সবচেয়ে বেশি কার্টুন-শিল্পী জেলে ভরেছে। রাশিয়ায় ব্যঙ্গকারীরা হয় পালায়, নয় “দুর্ঘটনায়” পড়ে।
গণতন্ত্রও রেহাই পায় না। আমেরিকায় জিমি কিমেলের অনুষ্ঠান বন্ধের হুমকি দেওয়া হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কারণ তারা বোঝে: গণতন্ত্রে প্রশংসার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সহজ -- ব্যঙ্গকে সুরক্ষা দেয়া কঠিন। বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা আর মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। অথচ আজ কার্টুনের জন্য সাংবাদিক গ্রেপ্তার হলেও সরকার নীরব। স্বচ্ছ অবস্থান কোথায়? সংলাপের বদলে দমননীতিকে প্রত্যাখ্যান করার অঙ্গীকার কোথায়?
সহনশীলতা আসলে কী
মনের মতো কথার সুরক্ষা দেয়ার নাম স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার মানে যে কথা তোমাকে রাগাবে, তোমার বিশ্বাসে খোঁচা দেবে, তোমার ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে, সেই কথার অধিকার রক্ষা করা। শুধু প্রশংসা রক্ষা করলে সেটা মুক্তমত নয় -- সেটা প্রচারণা। ব্যঙ্গ তো ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলতেই জন্মেছে। এর কাজই অতিরঞ্জন, খোঁচা, এবং রাজনৈতিক উদ্ভটতা সামনে আনা।
যারা মামলা করছেন, তারা অস্বস্তিকে অপরাধ বানাতে চান। সমালোচনার বদলে হুমকিকে নিয়ম করতে চান। এটা গণতন্ত্র নয় -- এটা ভঙ্গুর অহংকারের শাসন।
শেষ প্রশ্নটা সবার সামনে
বাংলাদেশ এখন একটি মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা কি সেই দেশ হতে চাই যেখানে ব্যঙ্গচিত্র, কার্টুন, রম্য ও মিম ক্ষমতাকে জবাবদিহিতে রাখবে? নাকি এমন এক দেশ, যেখানে ভীতি সৃজনশীলতাকে মেরে ফেলবে -- হাসির জায়গায় হাজির হবে আইনজীবী?
ইয়ারকি ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে হবে। কোনো অনুগ্রহ হিসেবে নয় -- একটি স্বাধীন সমাজের ন্যূনতম শর্ত হিসেবে। প্রতিটি এমন মামলার অর্থ দাঁড়ায় আমরা বলছি ক্ষমতার অনুভূতি নাগরিকের অধিকারের চেয়ে মূল্যবান। আমরা বলছি আমরা আন্দোলন থেকে কিছুই শিখিনি।
টোকাই জন্ম নিতে রণবীর আট বছর লেগেছিল। শিশির ভট্টাচার্যও অপেক্ষা করেছিলেন সঠিক সময়ের জন্য। শিল্প সময় চায়, ধৈর্য চায়; আর সবচেয়ে বেশি চায় ভয়মুক্ত জায়গা।
এখন প্রশ্নটা আবারও সামনে দাঁড়ায়:
আমাদের নেতারা কি রসিকতা সহ্য করতে পারবেন? সমালোচনায় হাতকড়া ধরবেন না?
ভিন্নমত আর অপপ্রচার আলাদা করতে পারবেন? যদি না পারেন, তাহলে আমরা কোনো শাসন বদলাইনি। কেবল চেহারা পাল্টেছি। ব্যবস্থার শ্বাসরোধী দমনচক্র রেখে দিয়েছি অক্ষত।
এবং এতে হাসির কোনো কারণ নেই।
ফারুক হাসান, উন্নয়ন কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
What's Your Reaction?