বাংলাদেশ ২.০-এ সমকামভীতি: এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা

ইতিহাস বলছে, উপমহাদেশে এক সময়ে যৌনতার বৈচিত্র্যের প্রতি সমাজের সহনশীলতা ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন এবং ভিক্টোরীয় নৈতিকতা, সঙ্গে ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যা মিলেই আজকের এই অসহিষ্ণু সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘু মুসলমান, হিন্দু বা অন্যদের পরিণতি কী?

Apr 19, 2026 - 15:00
Apr 19, 2026 - 17:01
বাংলাদেশ ২.০-এ সমকামভীতি: এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা

২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে শেখ হাসিনার পতন এবং তার অনুগত গোষ্ঠীর দেশত্যাগ, মূলত শুরু হয়েছিল একটি সহজ, ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে: বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতিদের জন্য চাকরির কোটা ব্যবস্থাকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভই ছিল এর সূচনা। সেই কোটা শুধু অন্যায্যই ছিল না, সেটা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল স্পষ্ট পক্ষপাত। কিন্তু আন্দোলন সেখানে থেমে থাকেনি। খুব দ্রুতই সেটি রূপ নেয় একটি সর্বাত্মক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে -- অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, ভাষাগত, লিঙ্গভিত্তিক -- সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

কিন্তু সকলের সচেতনতার বাইরে রয়ে গেল একটি জনগোষ্ঠী, যারা বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও দেশের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫–১০% হতে পারে। এরা আর কেউ নয় -- এরা যৌন সংখ্যালঘু মানুষ (এলজিবিটি), যারা সব সময়েই বাংলাদেশের সমাজের অংশ ছিল, কিন্তু মাত্র এক দশক আগ পর্যন্ত (এখনও অনেকেই) মিথ্যা আর গোপনীয়তার আড়ালে বেঁচে থাকতে বাধ্য ছিল।

এই সম্প্রদায়ের কিছু তরুণ জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদানও রেখেছে। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস যে একটি নতুন রাজনৈতিক দল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যেটা এই আন্দোলনের ফসল, সেই দলের সদস্যরা এখন বাংলাদেশ ২.০-এ সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার -- শুধু যৌন সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে ছাড়া। তারা নানা অজুহাতে এই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যকে সরাসরি বৈধতা দিচ্ছে।

আমি নিজে, একজন সিসজেন্ডার সমকামী পুরুষ হিসেবে, “বাংলাদেশ ২.০” নামের একটি এক্স (টুইটার) গ্রুপে সক্রিয়। সেখানে মতের বৈচিত্র্য আছে -- ধর্মীয়, রাজনৈতিক, দার্শনিক -- সবকিছুরই। অংশগ্রহণকারীরা দেশের ভেতরে ও বাইরে ছড়িয়ে আছে — বয়স, শিক্ষা, সব ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য রয়েছে।

সেখানে জামায়াতপন্থী, হেফাজতপন্থী, রক্ষণশীল মুসলমান, উদারপন্থী মুসলমান, নাস্তিক, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী -- সবার সাথেই বিতর্ক হয়েছে। সবাই এক জায়গায় একমত: তারা বাংলাদেশ ২.০ চায়। কিন্তু যখনই এলজিবিটির প্রসঙ্গ এসেছে, তখন প্রায়শই আমাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে -- কারণ ঘৃণা, বিদ্বেষ আর ভুল তথ্যের বন্যা বয়ে গেছে। অনেক সময় তা ছিল গালাগাল আর হুমকির পর্যায়ে। আবার কিছু আলোচনা ছিল তথাকথিত “গঠনমূলক” -- কিন্তু যার ভেতরে ছিল গভীর অজ্ঞতা, যা একই সাথে ছিল বেদনাদায়ক।

এই আলোচনাগুলো আমাকে বুঝিয়েছে যে এই ঘৃণার সূত্র শুধু ধর্মীয় গল্প (যেমন কোরআনের লুতের কাহিনি, এবং হাদিসের উঁচু পাহাড় থেকে ফেলে দেয়ার কাহিনি) নয়, বরং আমাদের সম্পর্কে ভয়ংকর অজ্ঞতা। তাদের ধারণা যে সমকামিতা কোনো স্বাভাবিক মানসিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং একটি “পশ্চিমা ষড়যন্ত্র” -- যার উদ্দেশ্য পরিবারব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং সমাজকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করা।

তাদের মতে, পশ্চিমে “গে লিবারেশন”-এর আগে বাংলাদেশে কোনো সমকামী মানুষ ছিল না। এখন কিছু মানুষ ফ্যাশন করে “পাপী” হচ্ছে। রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার) মানুষদের কারণে নাকি শত শত নতুন লিঙ্গ তৈরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত দাবি -- এটি জন্মগত কিছু নয়; বরং পশ্চিমা সংস্কৃতি, সামাজিক মাধ্যম, এমনকি পর্নো ছবির প্রভাবে মানুষ “এভাবে হয়ে যাচ্ছে” যারা নাকি এখন অন্যদেরও “উৎসাহিত” করছে।

আরেকটি হাস্যকর (কিন্তু ভয়ংকর) ধারণা হলো -- আমেরিকার সরকার এলজিবিটি সংগঠনগুলোকে টাকা দেয়, তাই সেখানে সমকামী মানুষের সংখ্যা বেশি। ট্রাম্পের কারণে সেই অর্থ কমে গেলে নাকি সমকামী মানুষের সংখ্যাও কমে যাবে! এমনকি বিশ্বাস করা হয় যে প্রচার–প্রলোভনের মাধ্যমে কাউকে সমকামী বানানো সম্ভব; বা শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণেই মানুষ সমকামী হয় -- যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টিও একইভাবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয় -- যেন এটি একটা “চল”, যেখানে ছেলেরা হঠাৎ “কুল” হতে গিয়ে নিজেদের শরীর পরিবর্তন করে ফেলছে। এসব বক্তব্যের সাথে প্রায়ই যুক্ত হয় “মানসিক রোগ” তত্ত্ব -- যেন সমকামিতা বা রূপান্তরকামিতা কোনো অসুস্থতা বা খারাপ অভ্যাস।

আরেকটি জনপ্রিয় ধ্বনি: “জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এলজিবিটি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য হয়নি, কারণ তা দেশের ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না"।

ধর্মের সাথে খাপ না খাওয়ার যুক্তি কেউ দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো -- বাংলাদেশের সংস্কৃতির চৌকিদার কবে থেকে রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো হয়ে গেল?

ইতিহাস বলছে, উপমহাদেশে এক সময়ে যৌনতার বৈচিত্র্যের প্রতি সমাজের সহনশীলতা ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইন এবং ভিক্টোরীয় নৈতিকতা, সঙ্গে ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যা মিলেই আজকের এই অসহিষ্ণু সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে যৌন সংখ্যালঘু মুসলমান, হিন্দু বা অন্যদের পরিণতি কী? কেউ নাস্তিক হয়ে যায় -- আমার মতো। কেউ আজীবন দ্বন্দ্বে থাকে -- বিশ্বাস আর নিজের অস্তিত্বের মধ্যে। কেউ আত্মহত্যা করে। অনেকেই সামাজিক চাপে বিপরীত লিঙ্গের কাওকে বিয়ে করে মিথ্যা আর দুঃখের জীবন বেছে নেয়।

সমাধানটা কঠিন নয় যদি সকলে মানতে পারে যে মানুষের পরকাল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোনো সমাজ বা গোষ্ঠীর নেই। সেটা স্রষ্টার উপরই ছেড়ে দিতে হবে। একই সাথে, বাংলাদেশকে শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করার যে কোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। রাজনৈতিক জায়গা কখনোই জামায়াত বা হেফাজতের মতো গোষ্ঠীর কাছে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

রিয়াজ ওসমানী একজন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow