তেল, সাম্রাজ্যবাদ এবং ভূরাজনীতিঃ সাত দশকে ইরানের রূপান্তর
শাহ মুখে উন্নয়ন আর আধুনিকায়নের কথা বললেও কাঠামোগতভাবে তিনি রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক করে রেখেছিলেন। তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। SAVAK নামক গোপন পুলিশ বাহিনী গঠন করে হাজার হাজার বিরোধী নেতৃবৃন্দকে নির্যাতন, গুম আর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি সেক্যুলার বা মার্কিনবিরোধী বামপন্থী মতাদর্শীরাও তাঁর আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল।
ইরান সম্পর্কিত বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলো মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। এই মাধ্যমের একটি বড় অংশ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-জায়নিস্ট আগ্রাসনকে ইসলামিক লেন্স থেকে বিবেচনা করেন এবং ইরানের সংগ্রামকে ইসলামের সংগ্রাম হিসেবে মনে করেন। আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ -- ইরানে গণতন্ত্রায়নের কথা বলেন এবং যুদ্ধের বিনিময়ে হলেও মোল্লাতন্ত্রের অবসান ও গণতান্ত্রিক ইরানের বিকাশ চান। এই গ্রুপটি নারী স্বাধীনতা, সেকুলারিজম ও পশ্চিমা উদারনীতিকে আধুনিক ইরান রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে দেখেন এবং ধারণা করেন ৫০০০ বছরেরও প্রাচীন পারস্য সভ্যতার পুনর্বিকাশ সম্ভব যদি ইরানে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রায়ন হয় এবং মোল্লাতন্ত্রের অবসান ঘটানো যায়।
এই দুই পক্ষের বিশ্লেষণ, একটিমাত্র লেন্সে সীমাবদ্ধ -- আর সেটা হলো ধর্ম, মোটা দাগে ইসলাম। একটি গ্রুপ ইসলামের স্বার্থে খোমেনির সমর্থক, আরেকটি গ্রুপ কঠোর মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, খোমেনির বিরুদ্ধপক্ষ। তবে উভয় পক্ষই ইরানকে বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এবং গত ৭০ বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাস নিজেদের বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন।
বুঝতে হবে ইরান একদিনে খোমেনাইজড বা মোল্লাতান্ত্রিক হয়নি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে তেল অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদ আর ভূরাজনীতির দীর্ঘ টানাপোড়েন। বর্তমানে ইরানে যে সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা বিগত সাত দশকের চড়াই-উতরাইয়ের তৃতীয় ধাপ। মূলত আগের দুই ধাপের সুদূরপ্রসারী প্রভাবই বর্তমান এই সংকটের মূল কারণ।
সংকটের প্রথম ধাপ শুরু হয় তেল কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে ক্যান্ড করে। ঘটনার শুরু ১৯৫১ সালে। সেবছর ইরানের জাতীয় সংসদে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেঘ। অভিজাত পরিবারের সন্তান মোসাদ্দেঘ মানসিকতায় ছিলেন খাঁটি জাতীয়তাবাদী এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন আধুনিক রাজনীতিবিদ। সুইজারল্যান্ড থেকে ডক্টরেট করে এসে তিনি National Front নামে একটি রাজনৈতিক দল গড়েছিলেন -- যার আদর্শ ছিল মূলধারার জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সেকুলারিজম।
সেই সময়ে ইরানের তেল নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশ কোম্পানি AIOC -- Anglo-Iranian Oil Company। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের সাথে তাদের চুক্তি ছিল সম্পূর্ণ একতরফা -- ইরান সরকার পেত মোট রাজস্বের মাত্র ১৬%, বাকি ৮৪% যেত ব্রিটিশ কোম্পানির পকেটে। এমনকি কোম্পানিতে কর্মরত ব্রিটিশ কর্মীরাও পেতেন ইরানি কর্মীদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতন।
তেল বাণিজ্যের এই অসামঞ্জস্য নিয়ে ইরানিদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। বিশেষত মোসাদ্দেঘের National Front আর বামপন্থী দল Tudeh Party ছিল এই চুক্তির কঠোর বিরোধী। ক্ষমতায় আসার পর তাই মোসাদ্দেঘ তেল জাতীয়করণ করে ইরানের সম্পদ ইরানের মানুষের হাতে ফেরানোর উদ্যোগ নিলেন। ১৯৫১ সালে পার্লামেন্টে তেল জাতীয়করণ বিল পাস হলো -- যার মাধ্যমে ইরানে অবস্থিত সব তেলক্ষেত্রের একক মালিকানা পেল ইরানের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি।
দেশজুড়ে উৎসব হলো, জনগণ ভাবল ইরানের সুদিন আসবে, অর্থনীতির চাকা ঘুরবে। এখানেই শুরু ইরান সমস্যার প্রথম অধ্যায়। ব্রিটেন নীতিগতভাবেই এই জাতীয়করণ মেনে নিতে পারেনি -- কারণ ইরান সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটবে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এশিয়া -- সব জায়গায় ব্রিটিশ খনিজ বাণিজ্যের স্বার্থ হুমকিতে পড়বে।
জাতীয়করণের কারণে বৃটিশ তেল বাণিজ্যের যে ক্ষতি হবে সেটা পুড়নের জন্য মোসাদ্দেঘ আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু ব্রিটেন আলোচনার পথ বন্ধ করে সরাসরি অবরোধে গেল। ইরানের তেল কোনো দেশ কিনলে তাকে পরিণতি ভোগ করতে হবে -- এই বার্তা দিয়ে কার্যত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করা শুরু হলো।
পাশাপাশি শুরু হলো মোসাদ্দেঘ উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র। তেল প্রশ্নে কমিউনিস্ট Tudeh Party মোসাদ্দেঘের সমর্থক ছিল -- এই কারণে মোসাদ্দেঘকেও দেওয়া হলো কমিউনিস্টের তকমা। এটা ছিল সম্পূর্ণ ইঙ্গ-মার্কিন রাজনৈতিক কৌশল। Cold War-এর উত্তপ্ত সেই পরিবেশে কাউকে কমিউনিস্ট বলা মানেই সে আমেরিকার শত্রু। অন্যভাবে বললে এই ষড়যন্ত্রে ইরান ইস্যুতে আমেরিকাকে টেনে আনল বৃটেন। মোসাদ্দেঘ তাড়াতে আমেরিকা-ব্রিটেন এক হলো, শুরু করলো Operation Ajax। ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে দাঙ্গা বাধিয়ে সেনাবাহিনীর একাংশকে কিনে নেওয়া হলো, মিডিয়ায় মোসাদ্দেঘবিরোধী প্রচার চালানো হলো। ১৯ আগস্ট ১৯৫৩ সালে সেই অভ্যুত্থান সফল হলো।
মোসাদ্দেঘের পতনের পর ক্ষমতা দেওয়া হলো শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে, যিনি মূলত ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে ইরান শাসন শুরু করলেন। সাম্রাজ্যবাদীদের তৈরি এই একটি ঘটনাই ইরানের পরবর্তী ২৫ বছরের ট্র্যাজেডির বীজ বপন করে দিল, শুরু হলো ইরান অধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্ব -- শাহের শাসন ও সাম্রাজ্যবাদের তোষণ পর্ব।
মোসাদ্দেকের পতনের পর মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ইরানের শাহ হিসেবে ক্ষমতায় আরোহণ করলেন। পশ্চিমা জীবনধারায় বেড়ে ওঠা রেজা নিজেকে একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এ সময় ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পরেই শাহ তেল নিয়ে নতুন চুক্তি করলেন। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলো তেলক্ষেত্রের ৮০% দখলদারিত্ব পেল, আর ইরান পেল ৫০% রাজ্বস্বের প্রতিশ্রুতি। ১৯৬৩ সালে শাহ একটি বিশাল সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দেন, যার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা ধাঁচের অর্থনৈতিক সংস্কার, দ্রুত শিল্পায়ন ও নারীদের ভোটাধিকার প্রদান। শাহ একে বলতেন White Revolution বা শ্বেত বিপ্লব। কিন্তু এই সংস্কারগুলো ছিল মূলত মার্কিন প্রেসক্রিপশনে তৈরি একটি আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া, যা শাহের প্রশাসন কৃত্রিমভাবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল।
মার্কিন সমর্থিত এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল যাতে দেশটিতে সাম্যবাদী (কমিউনিস্ট) বিপ্লব না ঘটে এবং পুঁজিবাদের প্রসার হয়। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির আদলে শাহের নেওয়া উদ্যোগের সুবিধাভোগী ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট শহুরে শ্রেণি; গ্রামীণ অর্থনীতি এই উন্নয়নের সাথে তাল মেলাতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছিল। পশ্চিমাকরণ বা ওয়েস্টার্নাইজেশনের এই চাপিয়ে দেওয়া উদ্যোগ কট্টরবাদী এবং প্রান্তিক ইরানি গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
উচ্চবিত্ত সমাজ মিনিস্কার্ট আর নাইটক্লাব কালচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মানুষের কাছে এটি ছিল ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’। জালাল আল-ই আহমদ নামক একজন বুদ্ধিজীবী এই পশ্চিমাকরণকে ঘারবজাদগি (Westoxification) বা পশ্চিমা-বিষক্রিয়া নামক তত্ত্বে রূপ দেন। পশ্চিমাকরণের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, যিনি এই আবেগকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে প্রচার করেন যে, শাহ ইরানের ইসলামী পরিচয় মুছে ফেলে দেশটিকে আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে চাচ্ছেন।
খোমেনি নারী অধিকার, ভূমি সংস্কার এবং মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধিতা শুরু করেন এবং নিপীড়িত জনতাকে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করার ডাক দেন। তাঁর ভাষণ ও খুতবা প্রান্তিক ইরানিদের উদ্বুদ্ধ করার অস্ত্রে পরিণত হয়। বিপদ আঁচ করতে পেরে রেজা শাহ ১৯৬৪ সালে তাঁকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু নির্বাসনে থেকেও তিনি তাঁর ধর্মীয় আবেদনময় বক্তৃতা প্রচার অব্যাহত রাখেন, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের বীজ বপন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো।
শাহ মুখে উন্নয়ন আর আধুনিকায়নের কথা বললেও কাঠামোগতভাবে তিনি রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক করে রেখেছিলেন। তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। SAVAK নামক গোপন পুলিশ বাহিনী গঠন করে হাজার হাজার বিরোধী নেতৃবৃন্দকে নির্যাতন, গুম আর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি সেক্যুলার বা মার্কিনবিরোধী বামপন্থী মতাদর্শীরাও তাঁর আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল। সেসময় ধর্মীয় কারণে মসজিদগুলোতে শাহের পুলিশ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করত। আর এই সুযোগটিই খোমেনির অনুসারীরা পুরোপুরি কাজে লাগান। তাঁরা মসজিদগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনার একমাত্র নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তোলেন।
পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি এবং একটি আস্থাভাজন অলিগার্ক শ্রেণির কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করতে থাকে শাহের অনুগত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। এর সাথে চলতে থাকে ব্যাপকমাত্রার লুণ্ঠন এবং বিদেশে সম্পদ পাচার। তাঁর এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন সামাজিকভাবে ইরানে একটি বিশাল ফাটল তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীকালে রাজতন্ত্র বনাম থিওক্র্যাসির (ধর্মতন্ত্র) লড়াইয়ে রূপ নেয়।
১৯৭৮ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে এবং শাহবিরোধী পক্ষ একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে সফল হয়। ছাত্র, বামপন্থী মার্কসিস্ট, জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো মিলে একটি বহুস্তরীয় জনঅভ্যুত্থান ঘটায়। ইউটিউব বা ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিতেও সুদূর প্যারিসে নির্বাসনে বসে রেডিও বার্তা আর ক্যাসেট টেপের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন রুহুল্লাহ খোমেনি। ডিসেম্বর নাগাদ শাহের পতন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
প্রায় ২০০০ এর অধিক ছাত্র-বিরোধী সমর্থকদের হত্যা করে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশ ছেড়ে পালান এবং ফেব্রুয়ারিতে খোমেনি ইরানে ফিরে আসেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্র-জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যায় খোমেনির হাতে। বামপন্থী আর জাতীয়তাবাদীরা ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোর দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। শাহের বিরুদ্ধে হওয়া এই গণবিপ্লবকে তারা ইসলামি বিপ্লব বলে ঘোষণা করে।
১৯৭৯ সালে খোমেনি ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেন এবং Velayat-e Faqih বা ফকিহের অভিভাবকত্ব তত্ত্বে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। পরিণতিতে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো একে একে প্রান্তিক হয়ে যায় এবং টিকে থাকে কেবল খোমেনির অনুসারী অংশটি। শুরু হয় ইরানের ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় -- খোমেনিতন্ত্র।
শাহের পতনের পরপরই আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং তার অনুসারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অন্য সব পক্ষকে নির্মূল করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করতে থাকেন। সুধু ছাত্রদের একটি পক্ষ যেটা MEK বা মুজাহিদিন-ই-খালক নামে পরিচিত ছিলো তাদের সাথেই খোমেনির দূরত্ব কম ছিলো। এই MEK নামক সংগঠনটি ১৯৬৫ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গোপনভাবে গঠন করেছিলেন।
ইসলাম এবং মারক্সিজমের এক অদ্ভুত আদর্শের মিশ্রণে তৈরি এই ছাত্র সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিলো শাহের পতনের পড় ইসলামিক আদর্শে একটি সাম্যবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭৯ সালের অভভ্যত্থানে এই সংগঠনেরও ব্যাপক ভূমিকা ছিলো। কিন্তু শুরুর দিকে এই সংগঠনের সাথে খোমিনিপন্থীদেরও ভালো সম্পর্ক থাকলেও সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই দুই পক্ষের দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং MEK ক্রমশ খোমিনি বিরোধী হয়ে পড়ে।
খোমেনির দাবিতে ১৯৭৯-এর এপ্রিলে ইরানে গণভোট অনুষ্ঠিত হলো এবং এর মাধ্যমে ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষিত করা হয়। এরপর ডিসেম্বরে নতুন সংবিধান পাস করার মাধ্যমে -- ফকিহ বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নামক একটি পদ সৃষ্টি করা হয় যেই পদকে স্থান দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতি বা সংসদের ওপরে।প্রথম ফকিহ বা সুপ্রিম লিডার হিসেবে অভিষিক্ত হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তবে ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিজের হাতে না নিয়ে সরকার পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং নাগরিক সমাজের পরিচিত নাম National Front নেতা মেহেদি বাজারগানকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন।
বাজারগান ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ কিন্তু গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চেয়েছিলেন একটি পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থার বিকাশ করতে। কিন্তু খোমেনিপন্থীরা রেভল্যুশনারি কাউন্সিল গঠন করে সমান্তরালভাবে নিজেদের হাতে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করতে থাকেন।
১৯৭৯ সালের নভেম্বরে খোমিনিপন্থি ইরানি ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন আমেরিকান কূটনীতিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিলো। খোমেনি এই ঘটনাকে দ্বিতীয় বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এই একটা ঘটনায় আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে এবং আমেরিকা ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে -- যা আজ পর্যন্ত চলমান।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বাজারগান বুঝতে পারেন প্রধানমন্ত্রী হলেও আসল ক্ষমতা খোমেনির হাতে এবং উগ্রপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি তার নেই। এ পরিস্থিতিতে ৯ মাস সরকার পরিচালনা করে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর কিছুদিন পরেই, আমেরিকার ইন্ধনে ১৯৮০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করে বসলে তা খোমেনির জন্য সাপে বর হয়ে আসে। যুদ্ধের জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের অভ্যন্তরে সব ধরণের বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেন। যারা যুদ্ধের সময় খোমেনির সরকারের সমালোচনা করা শুরু করে তাদের দেশদ্রোহী বা সাদ্দামের চর হিসেবে তকমা দিয়ে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া শুরু করেন। ৮ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ খোমেনির শাসনকে দুর্বল না করে বরং আরো সুসংহত করে।
এসময় মোল্লাহতন্ত্রের বিরোধী একটি ব্যাপক সংখ্যক ইরানীয়ান ইরান ছেড়ে পাসচাত্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। ঠিক একই সময়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে খোমেনি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা শুরু করেন এবং কারিকুলাম থেকে পশ্চিমা ও বামপন্থী প্রভাব মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। হাজার হাজার বামপন্থী শিক্ষক ও ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইসলামিক থিওলজিস্ট সেন্টারে পরিণত করার ঘোষণা দেন। ১৯৮১ সালে MEK খোমেনির সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় খোমেনির নির্দেশে গঠণ করা হয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)। হাযারা জার হাজার MEK সদস্যকে গ্রেফতার, টর্চার এবং মৃত্যুদণ্ড দিয়ে খমেনি বিরোধী পক্ষের সর্বশেষ অংশটিকে প্রায় নির্মূল করে ফেলেন।
১৯৮৩ সালের মধ্যে ইরান সম্পূর্ণ থিওক্র্যাটিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এবং এর মাধ্যমে শাহের আমলের রাজতন্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে ইরান একটি নতুন ধরণের একনায়কতন্ত্রে প্রবেশ করে, যেখানে ধর্মই ছিল আইনের মূল উৎস। খোমেনির শাসনকালকে তাই একটা paradox বলা যেতে পারে।
বাইরের আধিপত্য থেকে মুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব হয়েছিল, সেই বিপ্লবই ভেতরে এমন একটা কর্তৃত্ববাদী কাঠামো তৈরি করে দেয় যেটা শাহের চেয়ে কম দমনমূলক ছিল না -- বরং কিছু ক্ষেত্রে আরো বেশি পীড়নমূলক ছিলো। এসময় ইরান পশ্চিমাবিরোধী আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটা রাষ্ট্র পরিণত হয়। পশ্চিমা এবং মার্কিন এই বিরোধিতার কারণেই পরবর্তীতে ইরানের সাথে রাশিয়া এবং চীনের সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং ইরান ধীরে ধীরে পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদের একটি নতুন ব্যাটেল্গ্রাউন্ড।
তাই আজকের ইরানের মোল্লাতন্ত্রের বিরোধিতা করতে হলে, সেই ব্যবস্থার উত্থানের নেপথ্যের দীর্ঘ ইতিহাসটি জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। ইরান কেন একটি আধুনিক ও পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র না হয়ে একটি ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হলো, তার সত্যতা লুকিয়ে আছে সেই ইতিহাসে -- যেখানে তেল অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস আর ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন এই রাষ্ট্রের নিয়তি নির্ধারণ করে দিয়েছে।
মুহাম্মাদ আশিফুল বাসার, শিক্ষক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।
What's Your Reaction?