চট্টগ্রাম বন্দর চুক্তি আমাদেরকে কী শেখায়
মানুষ আর পুরনো অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের স্লোগান গিলছে না। তারা ক্লান্ত অদক্ষতা, দুর্নীতি আর অন্তহীন বিলম্বে। সাধারণ মানুষের সরল চিন্তা এখন খুব স্পষ্ট — ক্রেন কার, সেটা তাদের বিষয় না; জাহাজ থেকে কত তাড়াতাড়ি পণ্য ওঠানো–নামানো হয়, সেটাই আসল কথা।
চেনা রাজনৈতিক মহল -- বাম, ডান, বিএনপি, জামায়াত -- যখন প্রত্যাশিত আপত্তি তুলেছে, তখন তার ভেতরেই নীরবে জনমনে একটা পরিবর্তন ঘটছে। মানুষ এই প্রথমবারের মতো পুরনো একটি ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছে যে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সবকিছুই রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব নিয়ে নানা কারগরি-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ চললেও, আসল পরিবর্তন হয়তো এখানেই -- অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের অবসান। মানুষ এখন ফল চায় -- স্লোগান নয়, গতি; মালিকানা নয়, দক্ষতা। এই মনোভাবের বদল আমাদের রাজনীতির পুরনো কাঠামোকে নাড়া দিচ্ছে, কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা আর অর্থনৈতিক প্রয়োজন এখন মতাদর্শকে অতিক্রম করে যাচ্ছে।
"নিজেদের উদ্ভাবন"–এর ভ্রম
দীর্ঘদিন ধরে আমরা সংস্কার বলতে বুঝেছি স্বদেশি চিন্তা -- সব কিছু নিজেই করবো, তাহলেই নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষা হবে। বাস্তবে এর আড়ালে বিস্তার লাভ করেছে কার্যগত দুর্বলতা, অদক্ষতা আর নানা চক্র।
প্রশ্নটা সহজ: পৃথিবীতে যেসব পদ্ধতি পরীক্ষিত, সেগুলো চোখের সামনে থাকা অবস্থায় আমরা কেন বারবার চাকা নতুন করে বানাতে চাব? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সিদ্ধান্ত -- অভিজ্ঞ বৈশ্বিক পরিচালকের হাতে কনটেইনার টার্মিনাল চালাতে দেওয়া -- একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: নিয়ন্ত্রণ মানেই ক্ষমতা নয়। আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতা মানে বাস্তবায়ন ও সরবরাহ। প্রাথমিক হিসাবই বলছে বন্দরে কাজের গতি বেড়েছে, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু প্রশংসা পাওয়ার নয়, শেখার এবং প্রয়োগ করার।
ভবিষ্যতের নকশা
বন্দর চুক্তি, যেখানে স্থানীয় সম্পদের সাথে বৈশ্বিক দক্ষতা যুক্ত হচ্ছে, এটা একা একটি উদাহরণ হয়ে থাকলে চলবে না। যেভাবে মানুষ ব্যাপকভাবে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে, তাতে এটা অন্য খাতগুলোকে টেনে তোলার জন্যেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রেলপথের কথাই ধরি। লোকবাহী, ধীর, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত -- এক কথায় অকার্যকর। মানুষ রাষ্ট্রীয় ট্রেন চায় না; চায় নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ, দ্রুতগামী ট্রেন। ট্রেন কে চালায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে না জার্মানির ডয়চে বান -- সেটা কারও মাথাব্যথা না। এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ইউরোপীয় ধাঁচের ঘনঘন ট্রেন চলা লাভজনক না হলে পৃথিবীর আর কোথাও হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের উচিত আধুনিক রেল পরিচালনকারীদের সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ করা -- রাষ্ট্র জমি আর মানবসম্পদ দেবে, আর অংশীজন দেবে প্রযুক্তি আর কঠোর কার্যগত শৃঙ্খলা।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। যুবসমাজ বেকার, আবার দক্ষ কারিগরদের অভাব। নতুন নতুন অকার্যকর কারিগরি মডেলের পরীক্ষা না করে জার্মানদের আউসবিলডুং (কর্মসংস্থানমূলক পেশাদার কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) মডেলকে গ্রহণ করা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া -- অনেকে সফলভাবে এটা মানিয়ে নিয়েছে। তাহলে আমরা কেন হঠাৎ নতুন পাঠ্যক্রিম বানাতে যাব?
ডাক বিভাগের দিকে তাকাই। দেশে প্রায় প্রতিটি উদীয়মান স্থানে তাদের কার্যালয় আছে -- এক বিশাল সংযোগজাল। তবুও তাদের কাজ মূলত কাগজের চিঠিপত্রেই আটকে আছে। ডিএইচএল বা ফেডেক্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব হলে ডাকঘরগুলো আধুনিক ই-কমার্স কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে।
এতে সবচেয়ে উপকৃত হবে দেশের সেই সব তরুণ উদ্যোক্তা যারা অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে কিন্তু নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ক্ষমতার অভাবে গ্রামাঞ্চলে পৌঁছাতে পারে না। একটি বিশ্বমানের ডাক সরবরাহ সজ্জা তাদের ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক ও বিস্তৃত করবে।
গ্রহণ করো, মানিয়ে নাও, ছড়িয়ে দাও
শাসনব্যবস্থার নতুন সূত্র হওয়া উচিত গ্রহণ করা, মানিয়ে নেওয়া ও বিস্তৃত করা। বাইরের সহযোগিতাকে শত্রুতা হিসেবে নয়, দ্রুত উন্নতির পথ হিসেবে দেখতে হবে। মানুষ এখন রাজনীতিবিদদের চেয়ে অনেক আগেই এগিয়ে। মালিকানা নয়, তারা চায় সেবা, নিরাপত্তা, চাকরি, গতি -- যা তাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
এসব কারণেই চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বিতর্ক একটি মোড় বদলের মুহূর্ত। এটা রাজনৈতিক শ্রেণিকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে -- পুরনো ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। বাংলাদেশকে নতুন সংস্কার আবিষ্কার করতে হবে না। দরকার পরীক্ষিত মডেল গ্রহণ করা যা নিজের মতো করে সাজানো হবে। সবচেয়ে জরুরি: তা বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
What's Your Reaction?