ওসমান হাদির হত্যাকারীদের আমরা জিততে দিতে পারি না

Feb 5, 2026 - 12:30
Feb 5, 2026 - 15:41
ওসমান হাদির হত্যাকারীদের আমরা জিততে দিতে পারি না
ছবির ক্রেডিট: ওপেন সোর্স
ওসমান হাদির হত্যাকারীরা আজ উল্লাস করছে -- এটা এখন স্পষ্ট। কারণ, এই হত্যাকাণ্ড তাদের তিনটি লক্ষ্য একসাথে পূরণ করেছে।

প্রথমত, জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একজন সৎ, আপসহীন ও নির্ভীক রাজনৈতিক কণ্ঠকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাদিকে কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, তার সততা, দায়বদ্ধতা আর ক্ষমতার সামনে সত্য বলার সাহস প্রশ্নাতীত ছিল। অনেকেই যেখানে নানাভাবে আপস করে রাজনৈতিক অপ্রাসঙ্গিকতায় হারিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে হাদি ছিলেন নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিরল এক তরুণ মুখ। পুরোনো ব্যবস্থার জন্য তিনি ছিলেন সরাসরি হুমকি। আর তাই তাকে হত্যা করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এই হত্যাকাণ্ড দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে যে জুলাই অভ্যুত্থানের শত্রুরা এখনো সক্রিয়, এখনো ভয়ংকর, এবং এখনো আইনের বলয়ের বাইরে থেকে কাজ করতে সক্ষম। বার্তাটি পরিষ্কার -- কেউই নিরাপদ নয়।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে ভয়ংকর লক্ষ্যটি পূরণ হয়েছে দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পত্রিকাগুলোর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে। এই প্রতিক্রিয়াই হত্যাকারীরা চেয়েছিল। ক্ষোভ, শোক আর ক্ষতির বেদনা বুঝতে পারি। কিন্তু সংবাদপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যে বার্তাটি দেয়া হয়েছে, তা কেবল হত্যাকারীদেরই উপকার করেছে।

এতে বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে এক দলবাজ, অনিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম এবং রাজপথে আইনের কর্তৃত্ব দুর্বল। এতে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে সংবাদমাধ্যম আজ আগের দমন-পীড়নের সময়ের চেয়েও বেশি ঝুঁকির মধ্যে। সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো -- এই দুটি পত্রিকাই ছিল শেখ হাসিনার প্রধান শত্রু, যাদের ধ্বংস করতে তিনি পনেরো বছর ধরে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের ওপর হামলায় তার চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না।

এখানে মূল লক্ষ্য ছিল আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভণ্ডুল করা এবং বাংলাদেশকে অস্থিরতা ও উগ্রতার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা। গত আঠারো মাস ধরে এই গল্পটাই বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিল। শুরুতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। এক সপ্তাহ আগেও নির্বাচনের পথে বড় কোনো বাধা দেখা যাচ্ছিল না। আজ সবকিছু অনিশ্চিত -- আর এটাই হত্যাকারীদের সাফল্য।

ওসমান হাদি নির্বাচন চেয়েছিলেন। তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। ঢাকা–৮ আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জানতেন, নতুন বাংলাদেশ গড়া তাৎক্ষণিক কোনো কাজ নয়। এটা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন একটি কাজ। কিন্তু সেটাই একমাত্র সঠিক পথ। তাকে সম্মান জানাতে হলে এই নির্বাচন থেকে আমাদের কিছুতেই সরে আসা চলবে না।

নির্বাচন বিলম্বিত বা বাতিল হলে লাভবান হবে কেবল সেই শক্তিগুলো, যারা গণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় আসতে পারে না। বাংলাদেশের সামনে একমাত্র পথ হলো নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন সম্পন্ন করা। এটাই মানুষের চাওয়া, এটাই দেশের প্রয়োজন।

এখন সময় বিভাজন ভুলে এক হওয়ার। একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করা দেশ, আর দুই হাজার চব্বিশে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার উৎখাত করা দেশ -- এই বাংলাদেশ আবার দাঁড়াবে। ওসমান হাদি এখন আমাদের শহীদদের একজন। তার মৃত্যু যেন আমাদের ভাঙতে না পারে, বরং আমাদের আরও দৃঢ় করে।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মানুষের দমিত কণ্ঠ ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা তার স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের সম্মান জানাতে পারি।

সম্পাদক, কাউন্টারপয়েন্ট

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow